আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৩-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

মূল সমস্যা যে কেউ দেখে না!

মহসীন হাবিব
| সম্পাদকীয়

আমরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নই। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প অধিক তীব্র হয়ে উঠলে কী হবে তা কল্পনা করা যায় না। আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ শতকে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ২০৩০ সাল থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত সময়ে বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্বাভাবিক প্রাণহানির ঘটনা ২ লাখ ৫০ হাজার (আড়াই লাখ) বৃদ্ধি পাবে

 

লেখার অনেক বিষয় ছিল। অনেক ঘটনাই ঘটে চলেছে আমাদের চারপাশে, দেশ ও দেশের বাইরে। এর মধ্যে অন্যতম বিষয় ছিল, সম্প্রতি তিনজন অসাধারণ মানুষ পরপর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তারা হলেন ভারতের কবি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিনেটর এবং দুবার রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন ম্যাককেইন এবং পাকিস্তানে জন্মগ্রহণকারী ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট কুলদিপ নায়ার। তিনজনেরই ছিল বর্ণাঢ্য, ঘটনাবহুল জীবন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তারা নিজ নিজ অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তিনজনই জনমানুষের জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। বাজপেয়ি ছিলেন আপাদমস্তক কবি। নিরামিষভোজি এ মানুষটি ছিলেন চিরকুমার। বন্ধু বিএন কাউল এবং রাজকুমারী কাউলের মেয়ে নমিতাকে দত্তক নিয়ে নিজের মেয়ে হিসেবে মানুষ করেছেন। জন ম্যাককেইনও বাংলাদেশ থেকে এক অনাথ মেয়েকে তুলে নিয়ে নিজের সন্তানের মর্যাদা দিয়ে বড় করে তুলেছেন। আরও লেখার ছিল রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘের প্রকাশিত রিপোর্ট বিষয়ে। জাতিসংঘ যে রিপোর্টটি প্রকাশ করেছে, এর চেয়ে নেতিবাচক রিপোর্ট আর কিছু হতে পারে না। মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষকে এবং সেনাবাহিনী প্রধানকে দায়ী করে কড়া ভাষায় যে রিপোর্ট জাতিসংঘ দিয়েছে, তারপরও যদি মিয়ানমারকে তার অবস্থান থেকে সরানো না যায় তাহলে রোহিঙ্গাদের আজীবন কাঁধে বয়ে বেড়াতে হবে আমাদের। আমার বলার ছিল, জাতিসংঘ অনেকটাই নখদন্তহীন একটি প্রতিষ্ঠান, যাকে বিশ্বের পরাশক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা শুনে চলতে হয়, জাতিসংঘের তহবিলের জন্য রাষ্ট্রগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। শুধু এ প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওপর কতটা চাপ প্রয়োগ করতে পারবে? দেশটি বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা করা এবং মন্ত্রী পর্যায়ে কমপক্ষে তিন দফা আলোচনা হওয়ার পরও এখনও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে; ফিরে যাওয়া তো দূরের কথা। আরও লেখার ছিল, সম্প্রতি বান্দরবানের লামায় দুই ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর কিশোরীকে রাতের অন্ধকারে ডেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে দুই বিজিবি জওয়ানের বিরুদ্ধে। একটি দেশের প্রশাসনিক উচ্ছৃঙ্খলতা কোন পর্যায়ে গেলে এবং বান্দরবান এলাকায় পরিবেশ কী রকম থাকলে এ ধরনের ঘটনা এ যুগে ঘটতে পারে তা খুবই অনুমেয়। গোটা ইতিহাসের দিকে তাকালে রক্তের গন্ধ পাই, চোখের জলের নোনা স্বাদ অনুভব করি। কিন্তু পেছনে যা গেছে তা তো গেছেই। এখন আমরা সভ্য হতে চাই। সেই সভ্যতার অন্তরায় কী সেটা সূক্ষ্মভাবে খুঁজে বের করে তা সমাধান না করলে অন্ধকার কাটবে না। 
কিন্তু সব আলোচনার বাইরে একটি বিশেষ বিষয় মাথা থেকে কোনোক্রমেই বের করতে পারছি না। প্রতি পদে পদে মানব সম্প্রদায়ের বিপর্যয়ের ভয়াবহ ঢাকের শব্দ কানে এসে প্রবেশ করে; আতঙ্কিত হই। ওপরে যে সব সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যেত বলেছি, তার প্রতিটা সমস্যাই মিটিয়ে ফেলা সম্ভব, যদি রাষ্ট্র এবং নেতারা চান। কিন্তু যে বিপর্যয়ের কথা বলছি, তা মানুষের হাত থেকে দ্রুত সিটকে বের হয়ে যাচ্ছে এবং তা এত দ্রুত যে সাধারণ মানুষের কল্পনা করতেও কষ্ট হবে। এ বিপর্যয়ের নাম বৈশ্বিক উষ্ণতা বা জলবায়ু পরিবর্তন। এ বছর জলবায়ু পরিবর্তনের এমন বৈরী রূপ দেখা গেছে, যা আবহাওয়াবিদ এবং বিজ্ঞানীদের ধারণায় ছিল না। ভয়াবহ ব্যাপার হলো, ক্রমাগত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির যে হিসাব বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন তার চেয়েও অনেক বেশি, অকল্পনীয় গতিতে বাড়ছে। এ বছর প্রকৃতি যে অস্বাভাবিক আচরণ করছে বিশ্বব্যাপী, তা আগে কখনও দেখা যায়নি। ফিনল্যান্ড একটি শীতপ্রধান দেশ। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে, অর্থাৎ শীতকালে দেশটিতে তাপমাত্রা থাকে হিমাঙ্কের নিচে মাইনাস ২২ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর গরমকালে জুলাই মাসে থাকে সাধারণত ১৩ থেকে ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু এ ফিনল্যান্ডে এবার জুলাই মাসে রেকর্ড ৩২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পড়েছে। অনভ্যস্ত ফিনিশ নাগরিকরা এতে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। বৈশ্বিক উষ্ণতাবিষয়ক গবেষকদের কপালে ভাঁজ পড়তে দেখা গেছে। অন্যদিকে ইউরোপের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ দেশ স্পেনে এবার রেকর্ড ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে হয়েছে। বলতে গেলে মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল পানিতে। ইতালিতেও তাই।  জার্মানির কোনো কোনো বয়স্ক নাগরিক জানিয়েছেন, তাদের জীবনে কখনও এ ধরনের গরম পড়তে দেখেননি। ইউরোপের দেশগুলোতে সাধারণত ইলেকট্রিক ফ্যান, এয়ারকুলার, এসির ব্যবহার দেখা যায় না। এবার ইউরোপিয়ানরা এসব ইলেকট্রনিক সামগ্রির জন্য দৌড়ে বেড়িয়েছেন। জানা গেছে, মিউনিখ শহরের সব দোকানের ফ্যান বিক্রি হয়ে গিয়েছিল জুলাই মাসে। এবার শতাধিক ইউরোপিয়ান গরমে প্রাণ দিয়েছেন। এ যেন এক অকল্পনীয় গল্পের মতো। বেশিরভাগ বাড়িতে ফ্যানের জন্য কোনো পয়েন্ট করা নেই। এবার বহু দেশেই ফ্যান কেনার হিড়িক পড়েছিল।
অন্যদিকে সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়ায় যে ভয়াবহ দাবানল দেখা গেছে তা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। ভারতের কেরালা রাজ্য এখনও বন্যার ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে এ বছর এখন পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত কম দুর্যোগ দেখা গেছে। হাইতি, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ভিয়েতনামসহ প্রথম সারিতে থাকা ১০টি দেশে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক আঘাত আসেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। পাকিস্তান সপ্তম। কিন্তু সেই হারে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা যায়নি। তবে এতে স্বস্তির বোধ করার কোনো কারণ নেই। অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, আমাদের এ অঞ্চলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাকৃতির দুর্যোগ দেখা দিতে পারে। যদি দেখা দেয় তাহলে সেটা  বিগত দিনের চেয়ে অনেক তীব্র, রুদ্রমূর্তি নিয়ে দেখা দেবে; এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আর তখন সেটা আমরা সামাল দিতে পারব বলে মনে হয় না। আমরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নই। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প অধিক তীব্র হয়ে উঠলে কী হবে তা কল্পনা করা যায় না। আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ শতকে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ২০৩০ সাল থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত সময়ে বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্বাভাবিক প্রাণহানির ঘটনা ২ লাখ ৫০ হাজার (আড়াই লাখ) বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এরই মধ্যে কেউ কেউ বলতে শুরু করেছেন, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণাম এতটা বাড়বে যা কল্পনা করা এখনই বোকার মতো কাজ হবে।
কিন্তু এ বিপর্যয় ঠেকানোর উপায় কী? পৃথিবীতে বাড়ছে কল-কারখানা, প্রতিদিন বাজারে আসছে নতুন লাখ লাখ গাড়ি। সেই ধোঁয়া যাবে কোথায়? গোটা পৃথিবী অভ্যস্ত হয়ে গেছে প্লাস্টিক ব্যবহারে, যা লাখ লাখ একর জমিকে, সমুদ্রকে, তথা ইকো সিস্টেমকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো কোনো কোড অব কনডাক্ট মানে না এ ধারণা থেকে যে, শিল্পোন্নত দেশগুলো মুখ্যত দায়ী আজকের জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য। শিল্পোন্নত দেশগুলো যখন কল-কারখানা করেছে তারা শুধু মুনাফার দিকটাই দেখেছে। আজ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো যখন তাদের উৎপাদন উন্নত দেশে পাঠাচ্ছে, তখন কেন এত পরিবেশ নিয়ে কান্নাকাটি; তারা কেন কলকারখানা চালাতে পরিবেশবান্ধব হয়ে মুনাফা কম করবে? এমন ভাবনা সম্ভবত শিল্পে বর্তমানে সবচেয়ে অগ্রসর হতে থাকা চীনেরও। কিন্তু দিন শেষে বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে যে খেসারত দিতে হবে সে কথা কেউ বুঝতে চাইছে না।
জাতি হিসেবে আমরা ভূত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে অভ্যস্ত নই; নগদে বিশ্বাসী। এ দেশের মানুষ কখনও সুদূরপ্রসারী কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। ১০ বছর পর কী হবে তা নিয়ে না ভাবেন দেশের পরিচালকরা, না ভাবে দেশবাসী। তারা ব্যস্ত রাজনীতি, কোটা আন্দোলন নিয়ে, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে। নিশ্চয়ই এসব বিষয় ফেলনা নয়। কিন্তু ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সবল-দুর্বল সবার জন্য যে পরিণতি ধেয়ে আসতে পারে তা নিয়ে কেন আমাদের মাথাব্যথা থাকবে না? সমতল ভূমির দেশ বাংলাদেশ। বন্যা এবং বাংলাদেশ শব্দ দুটি সমার্থক হয়ে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক মহলে। সৌভাগ্যক্রমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ’৮৭-৮৮ সালের মতো বড় আকারের বন্যা হয়নি। কিন্তু হতে কতক্ষণ? অথচ উজাড় হয়ে যাচ্ছে বন, ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী-খালগুলো যা বন্যা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায়। প্রাইভেট সেক্টর এবং ব্যক্তিমালিকানায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শহরগুলোতে, এমনকি গ্রামাঞ্চলেও প্রভাবশালীদের দ্বারা নদী-খাল দখল হয়ে যাচ্ছে। যেন এগুলো সংরক্ষণের কেউ নেই! খাল এবং নদীর পাড় দখলের একটি অভিনব পন্থা আমাদের চোখে পড়ে। প্রথমে খালের পাড়ে একটি অস্থায়ী টিনশেড তৈরি হয় কোনো কাগজপত্রের মালিকানা ছাড়াই। কিছুদিন পর যখন বোঝা যায় যে, ঠিকানাটা মোটামুটি মজবুত হয়েছে, তখন পাঁচ বা ১০ ইঞ্চি দেয়াল ওঠে। একসময় কিছু ভুয়া ‘কাগজপত্র’ হয় এবং বিশাল মার্কেট তৈরি হয়। এটি কোনো ব্যতিক্রম চিত্র নয়। লাখ লাখ উদাহরণ আছে। সরকারের লোকেরা হয় রাজনৈতিক প্রভাবে অথবা নিজেরা আর্থিক লাভ গ্রহণের কারণে আর ওমুখো হয় না। যদিবা কদাচিৎ কেউ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায় তাহলেও পারে না নানা জটিলতায়। মোদ্দা কথা, বিপন্নতার হাত থেকে মুক্ত হতে এখনই প্রতিটি মানুষের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে চোখের জলে ডুবতে হবে আমাদের। 

মহসীন হাবিব
লেখক ও সাংবাদিক