আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৩-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আগামী দিনের আন্দোলন আরও বেগবান করার প্রত্যাশা

জনসভার পর উজ্জীবিত বিএনপি নেতাকর্মীরা

রকীবুল হক
| প্রথম পাতা

দীর্ঘ আড়াই বছর পর পুলিশের অনুমতি নিয়ে ২০ জুলাই খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তার সুচিকিৎসার দাবিতে রাজধানীর নয়াপল্টনে সমাবেশ করে বিএনপি। দেড় মাসের ব্যবধানে শনিবার একই স্থানে দলের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আরও একটি বড় জনসভা করল বিএনপি। পুলিশ প্রশাসনের নানা শর্তে আয়োজিত এ জনসভায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ব্যাপক উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্টদের মাঝে বেশ উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। নানা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে এবং চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে এদিন স্মরণকালের বড় একটি জনসভা হয়েছে বলেও দলটি দাবি করছে। জনসভার এ উদ্দীপনার ধারাবাহিকতায় আগামীতে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য চলমান আন্দোলন আরও বেগবান হওয়ার প্রত্যাশা করছেন সারা দেশের নেতাকর্মী।

এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়–য়া বলেন, নানা শঙ্কা, ভয়ভীতি ও ধরপাকড়ের মধ্যে এবং তেমন কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই নয়াপল্টনে যে বিশাল জনসভা হয়েছে, তা দলের প্রতি নেতাকর্মী ও জনগণের আস্থার একটি বার্তা। চেয়ারপারসন কারাবন্দি ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে থাকলেও দলের নেতাকর্মীরা কতটা ঐক্যবদ্ধ, সেটারও প্রমাণ হয়েছে এ জনসভায়। কেন্দ্রীয় নেতাদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে সারা দেশের নেতাকর্মী আরও প্রাণ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, এদিন শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই জনসভা হয়েছে। চট্টগ্রামেও ব্যাপক শোডাউন হয়েছে। ঢাকায় শুধু জনসভা নয়, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একই দিন সকালে জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময়ও নেতাকর্মীর ঢল নামে। আগামী দিনে দলের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এ ধরনের জনসভা বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিএনপি কত জনপ্রিয় একটি দল, তা আমরা সবাই জানি। তবে নিন্দুকরা বলে থাকে, বর্তমানে বিএনপির অবস্থা খুবই নাজুক। শনিবার খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেও স্মরণকালের বড় একটি জনসভার মাধ্যমে সেই নিন্দুকদের চোখে আঙুল দিয়ে জনগণ দেখিয়ে দিয়েছেÑ একটু সুযোগ পেলেই বিএনপির জনসভায় কত লোকসমাগম হতে পারে। তিনি বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সাজানো একটি মামলায় কারারুদ্ধ করায় সারা দেশের বিএনপি নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণ চরম বিক্ষুব্ধ। সেই ক্ষোভেরও একটি বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে শনিবারের জনসভায় ব্যাপক উপস্থিতিতে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে এবং নিরপেক্ষ একটি সরকারের মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যে আন্দোলন চলছে, তা আরও বেগবান হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস করি।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জনসভায় ব্যাপক উপস্থিতি নেতাদের বক্তব্যের মধ্যেও বেশ প্রভাব ফেলে। সবার বক্তব্যে বড় জনসভার প্রসঙ্গটি উঠে আসে। ওই সময় নেতারা বলেন, নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও জনসভায় ব্যাপক উপস্থিতির মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণ অনাস্থা প্রকাশ করেছে। তারা বিএনপির পক্ষ থেকে জনগণের চাওয়া অনুযায়ী অবিলম্বে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেন। একই সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই সংসদ ভেঙে দিয়ে সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচনের সময় লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড তৈরি, নির্বাচন পরিচালনার কাজে সামরিক বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানান বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
এদিকে শনিবার বিএনপির জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি।
দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, এটা সত্যের অপলাপ। শনিবার নয়াপল্টনের জনসভায় বিপুল মানুষের সমাগমেই প্রমাণ হয়েছেÑ জনগণ এ সরকারকে আর চায় না। তারা আওয়ামী লীগের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে।
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবারের ওই জনসভায় বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্তি না দিলে, তফসিল ঘোষণার আগে শেখ হাসিনার সরকার পদত্যাগ না করলে বিএনপি আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে না। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি সরকারের হাতে নেই মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তার মুক্তি সম্ভব নয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় রোববারের সংবাদ সম্মেলনে রিজভী বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, দেশনেত্রীকে মুক্তি দিতে হবে। যেভাবে আপনারা সংবিধান সংশোধন করেছেন, ওইভাবে সংশোধন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন নিয়ে কোনো গড়িমসি চলবে না। রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন জনগণ হতে দেবে না। তিনি জনগণের শত্রুপক্ষ। তার অধীনে নির্বাচনের অর্থই হচ্ছে মানুষের ভোটাধিকার হরণ। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ওই দাবি আদায় করবে বলে সরকারকে হুঁশিয়ার করেন রিজভী। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে সরকার। তিনি এক মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও আবার তা নানা কায়দায় আটকে দিচ্ছে তারা। সরকারের নির্দেশে দেশনেত্রী কারাগারে আটক আছেন। তিনি সুবিচারে নয়, প্রতিহিংসামূলক সরকারি বিচারে কারাবন্দি।
বিএনপির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, বনানী, রাজশাহীর চারঘাট, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, নারায়ণগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, পিরোজপুরসহ সারা দেশে দলের ৮৯ নেতাকর্মী পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন দাবি করে অবিলম্বে তাদের মুক্তির দাবি জানান রিজভী।
উল্লেখ্য, শনিবার দুপুর ২টায় আনুষ্ঠানিকভাকে জনসভা শুরু হলেও সকাল থেকে নয়াপল্টনে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। প্রচ- রোদ উপেক্ষা করে দুপুরের আগে সমাবেশস্থলে লোকসমাগম বাড়তে থাকে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা রঙের ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মিছিল সহকারে যোগ দিতে থাকেন নয়াপল্টনের জনসভায়। এ সময় খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে সেøাগানে সেøাগানে মুখর হয়ে ওঠে ওই এলাকা। একপর্যায়ে জনসভার বিস্তৃতি ফকিরাপুল মোড় থেকে কাকরাইল নাইটিঙ্গেল মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় ওই সড়কে যান চলাচল। বিএনপি নেতাকর্মীদের ভিড়ে আশপাশের বিভিন্ন সড়কেও যানচলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হয়। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে ট্রাকের ওপর সমাবেশের মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। জনসভা শুরুর আগে বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের শিল্পীরা দলীয় সংগীতসহ খালেদা জিয়াকে নিয়ে লেখা গান পরিবেশন করে নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করেন।