আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৪-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

পুঞ্জীভূত নগর এলাকা ঢাকা

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
| সম্পাদকীয়

মাত্র কয়দিন আগে পেরিয়ে গেল মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। পশু কোরবানি দেওয়া এই বিশেষ দিনটির অন্যতম অনুষঙ্গ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো রাজধানী ঢাকা শহরে পশু জবাই করার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। তাই ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরের প্রধান সড়ক, অলিগলি এবং খোদ রাস্তার ওপরই গরু, ছাগল কোরবানি দেওয়া হয়েছে। ফলে রক্তে ভেসে গেছে রাস্তাঘাট। অনেকেই দায়িত্বহীনতার কারণে পশুর রক্ত ও বর্জ্য সঠিকভাবে পরিষ্কার করেননি। কোরবানির দুই-তিন দিন পরও রাস্তার পাশের ড্রেনে জমে থাকা রক্ত পচে উৎকট গন্ধ ছড়িয়েছে। এমন দৃশ্য পৃথিবীর আর কোথায়ও চোখে পড়েনি। ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিটের বার্ষিক ‘গ্লোবাল লিভেবলিটি ইনডেক্সে’ এবার বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বিশ্বের ১৪০টি শহরের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, অপরাধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামোসহ ৩০টি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে প্রতিটি শহরের বাসযোগ্যতা বিচারে ঢাকার স্কোর ৩৮। অথচ বাসযোগ্য শহরের শীর্ষে থাকা অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার স্কোর ৯৯ দশমিক ১। বাংলাদেশের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা শহরে রাজনৈতিক, সামাজিক স্থিতিশীলতা, অপরাধ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের অন্যতম অন্তরায় অধিক জনসংখ্যার চাপ। সর্বশেষ তথ্যমতে জানা যায়, বৃহত্তর ঢাকা ও আশপাশের এলাকার জনসংখ্যা ১৮ মিলিয়ন (২০১৬)। এর মধ্যে ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যা ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৩ হাজার ২৩৪ জন মানুষ বাস করে। গেল ২০ বছরে মানুষ বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। বিবিএস ও ইউএনএফবিএ বলছে, ঢাকা মেগাসিটি দেশের সবচেয়ে বড় পুঞ্জীভূত নগর এলাকা। বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের পরিসংখ্যানে আরও জানা যায়, প্রতিদিন ঢাকায় নতুন ১ হাজার ৭০০ মানুষ যোগ হচ্ছে। আর পুরো বাংলাদেশে বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ হলেও ঢাকা মেগাসিটিতে এ হার ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। এমনকি এ হার মহানগরীর কোথাও প্রায় ২০ শতাংশের বেশি। 
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ আজ রাজধানীমুখী। ভালো লেখাপড়ার সুযোগ এবং উন্নত স্বাস্ব্যসেবা পেতে উচ্চ ও উচ্চমধ্যবিত্তরা রাজধানীতে বসবাস নিরাপদ বোধ করেন। দেশের প্রায় সব অফিসের সদর দপ্তর রাজধানীতে থাকায় অন্যান্য শহর, গ্রামগঞ্জের মানুষকে দাপ্তরিক কাজেও ছুটে আসতে হয় এখানে। নিম্নবিত্ত মানুষ জীবিকার তাগিদে ছুটে আসছেন ঢাকায়। নিত্যনতুন বাড়তি মানুষের চাহিদা সামাল দিতে ঢাকায় অবিরাম গড়ে উঠছে বৈধ-অবৈধ স্থাপনা, বাজারঘাট। রাস্তার পাশে, রেললাইনের ধারে গড়ে উঠছে অগণিত বস্তি। সেখানে বিশাল জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন পরিবেশকে করে তুলছে বিষময়। বিপুল জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ ঢাকা শহরে অপ্রতুল রাস্তা চলে যাচ্ছে হকারদের দখলে। জীবন-জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে বসছে পণ্যের পসরা। দিন দিন যানজট নিচ্ছে এক ভয়াবহ রূপ। পরিবেশ দূষণে রাজধানী ঢাকার প্রকৃতি আজ ভারাক্রান্ত, নগরবাসীর জীবন দুর্বিষহ। যানবাহনের জ্বালানির দহনে বাড়ছে আবহাওয়ার উত্তাপ। দুঃসহ গরমের মাঝে বিদ্যুৎ সংকটে তাদের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির ভোগান্তি জনজীবনে গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে উঠেছে। শহরজুড়ে শুধু ইটপাথরের তৈরি ভবনের আড়ালে রুদ্ধ আলো-বাতাস। তৈরি হচ্ছে ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস। যানবাহন চলছে অবিরাম, যানজটে আটকেপড়া অসহায় মানুষের নিয়ত ছবি। যন্ত্রদানবের বিকট শব্দে দুর্বিষহ নগরজীবন। 
৪০০ বছরের অধিক সময়ের এ পুরানো শহর বাংলাদেশের রাজধানী হয়েছে চার দশকের অধিক। এ কয় বছরে কেমন বদলে গেছে শহরটা! স্বচ্ছন্দে ডুবসাঁতার খেলার মতো টলটলে নীল জলেভরা প্রিয় বুড়িগঙ্গার জলে আজ কালো রঙের শুধু বিষ। দেখতে দেখতে হারিয়ে গেল ঢাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রায় ত্রিশটি খালের টলমল স্রোতধারা। ওয়াসার পানীয় জল জীবাণুপূর্ণ। যান্ত্রিকতার দুঃসহ ডামাডোলে বিবর্ণ সেদিনের সবুজ-শ্যামল ঢাকা মহানগরী। প্রতিদিনের যানজট, জলাবদ্ধতা, ভয়াবহ বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণে জনজীবন দুর্বিষহ। ইটপাথরের তৈরি উত্তপ্ত সুউচ্চ ভবনের চাপে বাতাস চলাচলের ন্যূনতম স্থান নেই। ডাস্টবিনের উপচেপড়া ময়লার গন্ধ এড়াতে নাকে রুমাল চেপে পথ চলে রাজধানীবাসী। সেদিনের সেই স্নিগ্ধ রেসকোর্স, রমনা বাগান কেমন ফ্যাকাসে, শ্রীহীন। পত্রপল্লবে, ফুলেফলে জ্বালানি দহনের পাতায় পাতায় কালচে দাগ। পুরো রাজধানী চাপা পড়ে গেছে ইটপাথরে গাঁথা বিশাল বিশাল ভবন নামের আবদ্ধ খাঁচায়। যেখানে শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য নেই সামান্যতম জায়গা। শহরের পুরানো গাছ, উদ্ভিদ অযতœ-অবহেলায় ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। 
স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছরে রাজধানী শহরের পরিধি বেড়েছে অনেক। এখানে আজ সাড়ে আট মিলিয়ন মানুষের পদচারণা। অল্প জায়গায় এত মানুষের বসবাসে বাড়ছে নানা সমস্যা। সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধ কমাতে প্রশাসনের ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নিতে হবে। কমাতে হবে মানুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য। রাস্তায় প্রাইভেটকারের মিছিল কমিয়ে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে হবে। দেশে মানুষ বাড়বে, সময়ের প্রয়োজনে বাড়বে নগর অবকাঠামো, যানবাহন। কিন্তু তার জন্য থাকবে সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনা। দেশে আজ নিজ অর্থায়নে পদ¥া সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল। যে অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আজ বসবাসের অযোগ্য শহর তাকে ঢেলে সাজানো ছাড়া বিকল্প নেই। সবচেয়ে জরুরি বিকেন্দ্রীকরণ। ঢাকার বাইরে শিল্পকারখানা গড়ে তুলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সেখানে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাকে রাজধানীর বাইরের শহর, এমনকি গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে দিতে হবে। ঢাকার বাইরের শহরগুলোয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ গড়ে তুলে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। উন্নতমানের হাসপাতাল, ক্লিনিক স্থাপনসহ গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যসেবা সুনিশ্চিত করতে পারলে মানুষ ঢাকার বাইরে বসবাসে উৎসাহী হবে। 
অধিকন্তু গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত করে তুলতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাড়াতে হবে পরিষেবার মান। ঢাকায় যানবাহনের চাপ কমাতে চারপাশে বাইপাস সড়ক নির্মাণ করতে হবে। রাজধানী ঢাকা থেকে অন্যান্য শহরে গমনাগমনের পথ সুগম করে তোলাও জরুরি। রাজধানীর কেন্দ্রে অবস্থিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সদরদপ্তরকে সরিয়ে একটি দ্বিতীয় রাজধানী শহর গড়ে তোলার কথা ভাবা যেতে পারে। এমনকি কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সদরদপ্তরকে ঢাকা থেকে সরিয়ে অন্য শহরে নেওয়াও অসম্ভব নয়। তাতে ঢাকায় মানুষের বসবাসের প্রয়োজনীয়তা কমবে। মানুষ ঢাকার বাইরে থাকতে উৎসাহিত হবে। কমবে ঢাকার জনসংখ্যার চাপ। ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি শহর ও গ্রামে সুন্দর, স্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানুষ বাস করতে সক্ষম হবে। একটি উন্নত দেশের জন্য শহর ও গ্রামের সুষম উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। আর এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এবং জনগণের সহযোগিতার বিকল্প নেই। 

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
প্রাবন্ধিক ও গল্পকার