আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৪-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে মেগা প্রজেক্ট

মাছুম বিল্লাহ
| সম্পাদকীয়

এসডিজি অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখেই চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, আইসিটি শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়গুলো পিইডিপি-৪
এ স্থান পাবে

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষা খাতের অনেক উন্নয়ন হয়েছে এ কথা যেমন সত্যি, তেমনি শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে যে অনেকটা অবনতি হয়েছে সেটাও সত্যি। মান বাড়ানোর বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শুরু হচ্ছে পিইডিপি-৪, যাকে পরিকল্পনামন্ত্রী স্বপ্নের প্রকল্প বলে উল্লেখ করেছেন। একনেক বৈঠক-পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, শিক্ষার মান বাড়ানোর কাজ প্রাথমিক থেকেই শুরু করতে হবে। এজন্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার উদ্যোগ এবং পরিকল্পনামন্ত্রীর কথাটি যথার্থ যে, ‘শিক্ষার মান বাড়ানোর কাজ প্রাথমিক স্তর থেকেই শুরু করতে হবে।’ এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ২৫ হাজার ৫৯১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। বাকি ১২ হাজার ৮০৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আসবে বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, ইইউ, ডিএফআইডি, অস্ট্রেলিয়ান এইড, কানাডিয়ান সিডা, সুইডিশ সিডা, ইউনিসেফ ও ইউএসএইচ প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে। তবে আমরা যেন এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থেই প্রাথমিক শিক্ষায় একটি পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সজাগ ও তৎপর থাকতে হবে। পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলোর অর্থাৎ পিইডিপি ১, ২ ও ৩-তে পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু কাক্সিক্ষত পরিবর্তন যে হয়নি, তা বড় করেই বলা যায়। একটু অবস্থাপন্ন হলেই অভিভাবকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাদের সন্তানদের পাঠাতে চান না। তারা অনেক অর্থ খরচ করে হলেও ব্যক্তিগতভাবে পরিচালিত কিন্ডারগার্টেনে সন্তানদের পাঠিয়ে থাকেন। ঢাকা সিটি সংলগ্ন সাভার উপজেলাতেই ১ হাজার ৮৩টি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে এবং সবগুলোই প্রায় জমজমাট। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে যে পরিমাণ শিক্ষার্থী প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, তা উপজেলার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, বাকিরা সবই প্রাইভেটলি পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আসে। এই চিত্র দেশের কমবেশি প্রায় সব উপজেলাতেই। তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পিইডিপি’ প্রকল্প চালিয়ে আমরা কী অর্জন করছি? ৩৮ হাজার ৩৯৭ কোটি ১৬ লাখ টাকার মেগা প্রকল্প এ পিইডিপি-৪। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পাঠদানের আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি চালু, শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। সব প্রকল্পই উচ্চাশা দিয়ে শুরু হয়; কিন্তু শেষ পর্যায়ে দেখা যায় অনেক কিছুই অর্জিত হয় না। 
২০১৮ সালের জুলাই থেকে শুরু হলো প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নের চতুর্থ ধাপ, যা আমরা পিইডিপি-৪ নামে অভিহিত করে থাকি। এর বাস্তবায়নকাল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। বাস্তবায়ন করবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, যাকে সংক্ষেপে আমরা ডিপিই বলে থাকি। আমরা জানি, ইউনিসেফ সহায়তাপুষ্ট আইডিয়াল প্রকল্প, ডিএফআইডি সহায়তাপুষ্ট এস্টিম প্রকল্প, নোরাড সহায়তাপুষ্ট প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন প্রকল্পের সমন্বয়ে ১৯৯৭ সালে শুরু হয় প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বা পিইডিপি। ২০০৩ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত পিইডিপি-১ প্রকল্পে শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষা সমাপন, শিক্ষার মান ও মনিটরিংসহ দশটি লক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে ২০০৪ সালে গ্রহণ করা হয় পিইডিপি-২। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য বৃদ্ধি, জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন, বিদ্যালয়ের পরিবেশ আকর্ষণীয় করা, বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয়, স্যানিটেশন সুবিধা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় এ ধাপে। এরপর প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প-৩ (পিইডিপি-৩) অনুমোদন দেয় সরকার। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয় ২২ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। পিইডিপি-৩-এর অধীনে দেশব্যাপী ৩ হাজার ৬৮৫টি শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, ২ হাজার ৭০৯টি বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৪০-এ নিয়ে আসা, ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৫টি টয়লেট স্থাপন, ৪৯ হাজার ৩০০টি নলকূপ ও ১১ হাজার ৬০০টি শ্রেণিকক্ষ মেরামতসহ জেলা-উপজেলায় রিসোর্স সেন্টার করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর অর্থ দাঁড়ায় পিইডিপি-৩ প্রকল্পে আবকাঠামোগত উন্নয়নই বেশি গুরুত্ব পায়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রাথমিক শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার গৃহটি হতে হবে সুন্দর, মজবুত ও আকর্ষণীয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে পিইডিপি-৩ শেষ হলো, এই প্রকল্পের প্রস্তাবিত কার্যাবলি সার্থকভাবে কতটা শেষ হয়েছে, চলমান আছে, তা জাতির কাছে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষার যে বেহাল দশা, শিক্ষার যে মান তাতে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক যে, আসল কাজ কতটা হয়েছে। 
পিইডিপি-৪ এর আওতায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৭৪ শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন করা হবে। গুরুত্ব পাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টিও। প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ১৭৪ জন শিক্ষককে ডিপিইনএড, ৫৫ হাজার শিক্ষককে বুনিয়াদি, ১ হাজার ৭০০ শিক্ষককে বছর মেয়াদি সাব-ক্লাস্টার, ২০ হাজার শিক্ষককে বছর মেয়াদি আইসিটি, ৬৫ হাজার শিক্ষককে লিডারশিপ ও ১ লাখ ৩০ হাজার প্রাথমিক শিক্ষককে ব্রিটিশ কাউন্সিলের (সিঙ্গল সোর্স) মাধ্যমে ইংরেজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। শিক্ষকদের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের জন্যও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ২ হাজার ৫৯০ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষককে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। বিদেশে প্রশিক্ষণ পাবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত ৩৫ হাজার কর্মকর্তা ও শিক্ষক। পাশাপাশি ২০০ শিক্ষক-কর্মকর্তার জন্য বিদেশে বছর মেয়াদি মাস্টার্স কোর্সের ব্যবস্থা করা হবে। এর বাইরে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের বর্তমান পাঠ্যসূচির সংশোধন ও টিচিং লার্নিং শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হবে। শিক্ষার আওতায় আনা হবে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগবহির্ভূত ১০ লাখ শিশুকে। শ্রেণিকক্ষ সংকট প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে এখনও বড় বাধা। এটি দূর করতে প্রকল্পটির আওতায় ৪০ হাজার অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হবে। আধুনিক শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ৭১ হাজার ৮০৫টি ল্যাপটপ, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও স্পিকার বিতরণ, সহজ ঋণ সুবিধার মাধ্যমে ৮০ হাজার শিক্ষকের জন্য নিজস্ব আইটি সরঞ্জাম কেনা হবে। এছাড়া ১০ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষকের কক্ষ নির্মাণ, ৩৯ হাজার পুরুষ ও ৩৯ হাজার নারীর ওয়াশ ব্লক নির্মাণ এবং ১৫ হাজার বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হবে। উদ্যোগগুলো ভালো; তবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বিদেশে যাওয়া, কোর্স করা, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ বিষয়গুলো অন্যান্য প্রকল্পের মতোই মনে হচ্ছে। ওই কর্মকর্তারা দেখা যাবে বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে যাবেন, ফলে তাদের প্রাথমিক শিক্ষার ওপর প্রশিক্ষণ জাতির তেমন কোনো কাজে লাগবে না। এই ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। সে বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। 
পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায়, ৮ হাজারেরও অধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তীব্র শিক্ষক সংকট রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, (এসপিআর) বর্তমানে দেশের ৭৯টি বিদ্যালয়েই মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান হচ্ছে। দুজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে ৭২১টি বিদ্যালয়ে। আর তিনজন দিয়ে পাঠদান চলছে ৭ হাজার ৭৬৪টি বিদ্যালয়ে। তবে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। শিক্ষক নিয়োগ হলেও অভাব থাকছে প্রশিক্ষণের। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিদ্যালয় শুমারির তথ্য বলছে, ৩০ শতাংশের বেশি অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক দিয়ে চলছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম। শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মোট শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৮৮ জনকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৭১ হাজার ৫৯৭ শিক্ষক কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন। 
এসডিজি অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখেই চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, আইসিটি শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়গুলো পিইডিপি-৪ এ স্থান পাবে। এ বিষয়গুলো শিক্ষার মানের সঙ্গে সম্পর্কিত; কিন্তু এর পেছনেও কথা আছেÑ যেমন এই লেভেলে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের চাইল্ড সাইকোলজি জানতে হয়, কীভাবে অমনোযোগী শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগী করাতে হয়, তা জানতে হয়, শিক্ষকদের থাকতে হবে চমৎকার প্যারেন্টিং স্কিল এবং শিশুশিক্ষার বিভিন্ন জটিল ও আধুনিক দিকগুলো, যা প্রশিক্ষণ ছাড়া জানা সম্ভব নয়। আর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান এবং বিষয় পড়ানোর টেকনিক তো জানতেই হয়। যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তারা তা শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করছেন কি না, তা-ও দেখা হচ্ছে না। না করলে কেন করা হচ্ছে না, সেজন্য কী করতে হবে ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় না নিলে প্রকল্পটি তার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে হয়তো দূরেই থেকে যাবে। প্রাথমিক শিক্ষালয়গুলো যেভাবে সাজানো থাকা উচিত আমরা কি তার ধারেকাছেও যেতে পারছি? তবে কিছু কিছু বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষালয় যেগুলোকে আমরা কিন্ডারগার্টেন বলে জানি, সেগুলোতে এ রকম দেখা যায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেওয়ালজুড়ে থাকা উচিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও জাতীয় নিদর্শনের ছবি, যা শিক্ষার্থীদের দেশের ইতিহাস ও অতীত নিদর্শন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী করে তুলবে। সেগুলো হতে পারে ময়নামতি বৌদ্ধবিহার, আহসান মঞ্জিল, লালবাগের কেল্লা, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার, সোনারগাঁ কারুশিল্প জাদুঘর, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, জাতীয় সংসদ ভবন, জাতীয় শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় জাদুঘর, কমলাপুর রেলস্টেশন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সুন্দরবন, বঙ্গবন্ধু সেতু ইত্যাদি। আমরা অপেক্ষায় আছি আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো কবে প্রকৃত শিশুশিক্ষাবান্ধব হবে। 

মাছুম বিল্লাহ
ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত
[email protected]