আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৪-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আজ উঠছে এনইসি সভায়; ৩ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রাক্কলন; কমবে দুর্যোগ ঝুঁকি

অনুমোদনের অপেক্ষায় ‘ডেল্টা প্ল্যান’

আবু সাইম
| প্রথম পাতা

বাংলাদেশ পৃথিবীর পঞ্চম দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। নদীমাতৃক এদেশে মাত্রাতিরিক্ত পানির প্রবাহে কখনও বন্যা, অবার কখনও পানির অভাবে খরার মতো দুর্যোগ ডেকে আনে। নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো দুর্যোগও রয়েছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ বা ‘ডেল্টা প্ল্যান’ নামে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা নিতে যাচ্ছে সরকার। এ পরিকল্পনার পুরোটা জুড়েই রয়েছে ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা, মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার কৌশল। পুরো শতাব্দীর এ পরিকল্পনায় প্রস্তুতি পর্ব বা প্রথম পর্যায়ে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা ব্যয় বা বিনিয়োগের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এরই মধ্যে এ কৌশল বা ‘ডেল্টা প্ল্যান’ চূড়ান্ত করেছে দায়িত্বে নিয়োজিত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। শতবর্ষী পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়াটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় তোলা হচ্ছে আজ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে সভাপতিত্ব করবেন। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ডেল্টা পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়ায় জলবায়ুজনিত ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বর্তমান ধারা বিবেচনায় ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৪২ শতাংশের মতো বাড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ার কথা থাকলেও পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে তা কমতে পারে। দেশের প্রায় ৭০ ভাগ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১ মিটার উচ্চতার মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় বন্যার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। কোনো কোনো অংশে খরার কারণে কৃষি চাষ বিপর্যস্ত হতে পারে। আবার প্রতি বছর দেশের ৫০ থেকে ৬০ হাজার বসতি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দশমিক ২ থেকে ১ মিটার বাড়ার কারণে দেশের সাড়ে ১৭ শতাংশ এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেতে পারে। বাড়তে পারে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা, পরিমাণ ও তীব্রতা।
জানতে চাইলে জিইডির সদস্য ড. শামসুল আলম দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশ অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে দেশে নদীভাঙন বাড়ছে, কৃষি খাত বিপর্যস্ত হচ্ছে, স্বাদু পানি দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। তাই জলবায়ুর অভিজ্ঞতা মোকাবিলা করা, কৃষি-শিল্প ও গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য পানি নিশ্চিত করতে ডেল্টা প্ল্যান নেওয়া হয়েছে। জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলা করা এক-দুই-পাঁচ বছরের ব্যাপার নয়, তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া আবশ্যক ছিল। এতে বিনিয়োগ বাড়বে, প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে, প্রাকৃতিক সম্পদের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচবে। স্বল্পমেয়াদে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছে। এ সময়ে সরকারের কী পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে তার সুনির্দিষ্ট বিন্যাস দেখানো হয়েছে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত দেশের মাথাপিছু আয় তিনগুণ বেড়ে যাবে, দেশজ আয় (জিডিপি) বাড়বে, বৈদেশিক আয় বাড়বে। এর বাস্তবায়ন সফলতার ওপর মধ্যমেয়াদে ২০৫০ সালের নিরিখে আরও কিছু কার্যক্রম নেওয়া হবে। তিনি বলেন, এরকম ডেল্টা প্ল্যান করেই নেদারল্যান্ডস উন্নত দেশ হয়েছে, এছাড়া মিশর কিছু করেছে নীল নদকে ঘিরে। এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া পরিকল্পনা শুরু করলেও তা শেষ করতে পারেনি। বাংলাদেশের পূর্ণ পরিকল্পনা শেষ হতে যাচ্ছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনায় ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও এলাকার সাদৃশ্য বিবেচনায় সমগ্র দেশকে ৬টি বিশেষ অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ সমুদ্রের কাছাকাছি থাকা ‘উপকূলীয় অঞ্চল’, শুষ্ক এলাকা উত্তরবঙ্গের ‘বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল’, উত্তর-পূর্ব এলাকার প্রাকৃতিক জলাধার ‘হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল’, দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার ‘পার্বত্য অঞ্চল’, নদীর তীরবর্তী ‘নদী অঞ্চল ও মোহনা’ এবং ‘নগরাঞ্চল’। অঞ্চল ভেদে আর্থসামাজিক বৈষম্য এবং এর সাধারণ ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনায় স্বল্পমেয়াদে ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর জিডিপির আড়াই শতাংশ সমপরিমাণ বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ হবে এবং বাকি দশমিক ৫০ শতাংশ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করা হবে। আর মোট অর্থের ৮০ ভাগ জোগান আসবে সরকারি তহবিল থেকে এবং ২০ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে নেওয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ সামগ্রিক অর্থায়নের পরিমাণ হবে ৩৭ দশমিক ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২ হাজার ৯৭৮ দশমিক ২৭ বিলিয়ন টাকা বা ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ তহবিল গঠনেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
জিইডি সূত্র জানায়, বিনিয়োগের প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা ১২ বছরে ব্যয় হবে ৮০টি প্রকল্পে; এর মধ্যে পানিসম্পদ খাতসহ ৬৫টি প্রকল্প অবকাঠামো উন্নয়নে এবং ১৫টি প্রকল্প প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতায় নেওয়া হবে। বিশ্বব্যাংকের কারিগরি সহযোগিতায় বিভিন্ন খাতের এসব প্রকল্প নির্বাচন করা হয়েছে। প্রকল্প নির্বাচনে তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছেÑ অতিরিক্ত পানি ব্যবহার রোধ, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ এবং গুণ-মানসম্পন্ন পানির সরবরাহ। প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থার উন্নতি, অবস্থার পরিবর্তন এবং ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য প্রস্তাবিত ২৩ প্রকল্পে ৮৮ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা, বরেন্দ্র ও খরা অঞ্চলের জন্য ৯ প্রকল্পে ১৬ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা, হাওর ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য ৬ প্রকল্পে ২ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা, পার্বত্য অঞ্চলের জন্য ৮ প্রকল্পে ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকা, নদী ও মোহনা অঞ্চলের জন্য সাত প্রকল্পে ৪৮ হাজার ২৬১ কোটি টাকা, নগরাঞ্চলের জন্য প্রস্তাবিত ১২ প্রকল্পে ৬৭ হাজার ১৫২ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। ক্রস কাটিং বা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অঞ্চলে ১৫ প্রকল্পের জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৮ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা।