আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৪-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

শিশু শ্রমিক নিয়োগে দন্ড ৫ হাজার টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রথম পাতা

শ্রম আইন সংশোধনীর প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
আইনি ভিত্তি পাচ্ছে উৎসব ভাতা \

কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও শ্রমিকের বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি অর্ধেক কমিয়ে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৮ এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের এ কথা জানান। তিনি বলেন, শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য ২০০৬ সালে প্রথম এ আইন করা হয়েছিল। ২০১৩ সালে এটির অনেক বড় সংশোধন হয়; প্রায় ৯০টি ধারা সংশোধন হয়। বর্তমান শ্রম আইনে ৩৫৪টি ধারা আছে। সংশোধিত আইনে নতুন দুটি ধারা, চারটি উপধারা ও আটটি দফা সংযোজন, ছয়টি উপধারা বিলুপ্তি, একটি তফসিলে সংশোধন এবং ৪১টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আইএলও’র (বিশ্ব শ্রম সংস্থা) কনভেনশন অনুযায়ী আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেখানে শাস্তি বেশি ছিল সেখানে শাস্তি কমানো হয়েছে। শাস্তিগুলো মোটামুটি অর্ধেক কমানো হয়েছে। অনেক নতুন সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনে মালিক ও শ্রমিকের অসদাচরণ বা বিধান লঙ্ঘনের জন্য শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদ- বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-। আগে শাস্তি ছিল ২ বছরের কারাদ- বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-। প্রস্তাবিত আইনে মালিক ও শ্রমিকের বিভিন্ন অসদাচরণের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বল প্রয়োগ, হুমকি প্রদর্শন, কোনো স্থানে আটক বা উচ্ছেদ, শারীরিক আঘাত এবং পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, অথবা অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করে মালিককে নিষ্পত্তিনামায় দস্তখত করতে বা কোনো দাবি গ্রহণ বা মেনে নিতে বাধ্য করতে চেষ্টা করতে পারবেন না। করলে এটা অসদাচরণ হবে। অসদাচরণের জন্য যে সাজা আইনে রয়েছে, তা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। 

শফিউল আলম বলেন, কোনো মালিক শ্রমিকের চাকরির নিয়োগপত্রে ট্রেড ইউনিয়নে যোগদান নিষেধাজ্ঞা, কোনো ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য পদ চালু রাখার অধিকারের ওপর কোনো বাধা সৃষ্টির জন্য কোনো শর্ত আরোপ করতে পারবেন না। মালিক এ বিধান লঙ্ঘন করলে শাস্তি পাবেন। বেআইনি ধর্মঘট ডাকার দ- আগে এক বছর ছিল, সংশোধিত আইনে তা কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। জরিমানা আগের মতোই ৫ হাজার টাকা রয়েছে। তিনি জানান, কোনো ব্যক্তি একই সময়ে একাধিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হলে আগে ৬ মাস কারাদ-ের বিধান ছিল। এখন তা কমিয়ে এক মাস করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে শ্রমিকের সমর্থন হার কমছে এবং নতুন আইনে ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকের সমর্থনের হার কমানো হয়েছে জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে মোট শ্রমিকের ৩০ শতাংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়। সংশোধিত আইনে তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ধর্মঘট ডাকার ক্ষেত্রে আগে দুই-তৃতীয়াংশ শ্রমিকের সমর্থন লাগত নতুন আইন অনুযায়ী সেটা ৫১ শতাংশ হচ্ছে।
আইনি ভিত্তি পাচ্ছে উৎসব ভাতা : মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রস্তাবিত আইনে নতুন উৎসব ভাতা যুক্ত করা হয়েছে, যেটা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন। কোনো কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিককে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসবের প্রাক্কালে বিধির মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে উৎসব ভাতা দিতে হবে। শ্রমিকরা এতদিন উৎসব ভাতা পেলেও শ্রম আইনে এ বিষয়ে কোনো বিধান ছিল না। শফিউল আলম বলেন, প্রতিবন্ধী শ্রমিককে বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির কাজে বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা যাবে না। আগে এ ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে শিশু শ্রমিককে বিপজ্জনক কাজে নিয়োগের বিধান ছিল। অপ্রাপ্ত বয়স্ক শব্দটি শ্রম আইন থেকে বাদ দিয়ে সেখানে কিশোর শব্দটি যোগ করা হয়েছে। আগে ১২ বছর বয়সি শিশুরা কারখানায় হালকা কাজের সুযোগ পেত। সংশোধিত আইন অনুযায়ী ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোররা হালকা কাজ করতে পারবে বলে জানান তিনি। কোনো ব্যক্তি কোনো শিশুকে চাকরিতে নিযুক্ত করলে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদ-ে দ-িত হবেন বলেও আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের আইনে বিশ্রাম কক্ষ রাখার বিধান ছিল জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, এখন খাবার কক্ষও যুক্ত হয়েছে। ২৫ জনের বেশি শ্রমিক নিযুক্ত থাকেনÑ এমন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা যাতে সঙ্গে আনা খাবার খেতে ও বিশ্রাম করতে পারেন, সেজন্য উপযুক্ত খাবার কক্ষ ও বিশ্রাম রুম রাখতে হবে। আগের আইনের বাধ্যতামূলক গ্রুপ বিমা চালু করার কথা বলা হয়েছে। যেখানে কেন্দ্রীয় কল্যাণ ফান্ড থাকবে, সেখানে থেকে যে শ্রমিক সুবিধা পাবেন, সেখানে আলাদা গ্রুপ বীমা করার দরকার নেই।
মাতৃত্বকালীন ছুটি না দিলে শাস্তি : মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মালিককে নোটিশ দেওয়ার আগেই যদি কোনো নারী শ্রমিক সন্তান প্রসব করে থাকেন, তবে সন্তান প্রসবের প্রমাণ পেশ করার পরবর্তী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রসূতিকল্যাণ সুবিধাসহ প্রসব-পরবর্তী ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকার অনুমতি দেবেন মালিক। মাতৃত্বকালীন ছুটির বিকল্প হিসেবে এটি যুক্ত করা হলো। কোনো মালিক কোনো নারী শ্রমিককে প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করলে তিনি ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদ-ে দ-িত হবেন। বিদ্যমান আইনে ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, তবে শর্ত থাকে যে কোনো নারী শ্রমিক প্রসূতিকালীন ছুটিতে যাওয়ার নির্ধারিত তারিখের আগে গর্ভপাত ঘটলে তিনি কোনো প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা পাবেন না। তবে স্বাস্থ্যগত কারণে ছুটির প্রয়োজন হলে তা পাবেন।
ছুটি ও কর্মঘণ্টা : শফিউল আলম বলেন, সংশোধিত আইন অনুযায়ী শ্রমিকরা ইচ্ছা প্রকাশ করলে সিবিএ বা অংশগ্রহণকারী কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করে, উৎসব ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটির যোগ করে তা ভোগ করতে পারবেন। কোনো শ্রমিকের কাজের সময় এমনভাবে ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে আহার ও বিশ্রামের বিরতি ছাড়া ১০ ঘণ্টার বেশি না হয়। তবে সরকার কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম করলে, সেটা ভিন্ন কথা। কোনো শ্রমিককে উৎসব ছুটির দিনে কাজ করতে বলা যাবে না। যদি কোনো শ্রমিককে দিয়ে উৎসব ছুটির দিনে কাজ করানো হয়, এজন্য তাকে এক দিনের বিকল্প ছুটি এবং দুই দিনের ক্ষতিপূরণমূলক মজুরি দিতে হবে। 
ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের সময় কমবে : ট্রেড ইউনিয়নে রেজিস্ট্রশনের বিষয়ে একটি পরিবর্তন আনা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আগে যেটা পরিচালক করতেন, এখন সেটা করবেন মহাপরিচালক। রেজিস্ট্রেশনের দরখাস্ত পাওয়ার ৫৫ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। আগে এ সময় ছিল ৬০ দিন। তবে আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে ৩০ দিনের মধ্যে শ্রম আদালতে আপিল করতে পারবেন। রেজিস্ট্রেশন কাজ সম্পন্ন করার জন্য সরকার এসওপি বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর তৈরি করে দেবে। এটা নতুন যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো শ্রমিক বেআইনি ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করবেন না বা চালু রাখবেন না বা এতে অংশগ্রহণের জন্য অন্য কোনো ব্যক্তিকে প্ররোচিত করবেন না। এগুলো আইএলও কমিটির বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। শফিউল আলম বলেন, শ্রম আদালতগুলো মামলা দায়েরের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে রায় দিয়ে দেবেন। এ সময়ের মধ্যে কোনোভাবে রায় দেওয়া সম্ভব না হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অবশ্যই রায় দিতে হবে; অর্থাৎ ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ করতে হবে। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালকেও ৯০ দিন করে দুই দফায় ১৮০ দিনে মধ্যে অবশ্যই আপিল শেষ করতে হবে।
আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী সংশোধিত আইনে মালিক, শ্রমিক ও সরকার মিলে একটি ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ গঠন করতে পারবে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, শ্রমিকরা কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে ১ লাখ টাকার বদলে ২ লাখ টাকা এবং স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সোয়া ১ লাখ টাকা পরিবর্তে আড়াই লাখ টাকা পাবেন। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী শ্রমিক সংগঠনগুলো বিদেশ থেকে চাঁদা গ্রহণ করলে সরকারকে জানাতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, সংশোধিত শ্রম আইন ইপিজেড এলাকার কারখানার জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ, ইপিজেডগুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। আর শ্রম আইন হচ্ছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আইন। তবে বিদ্যমান আইনগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা হচ্ছে।
আইনের সংশোধনের বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রস্তাবিত আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। আসন্ন সংসদ অধিবেশনে এ আইন পাস হবে। মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্য জানান, বৈঠকে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছেন, সাংবাদিকদের এ আইনে শ্রমিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা আছে। তাদের শ্রমিক না বলে অন্য কোনো পেশাজীবী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হলে ভালো হবে। জবাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, সাংবাদিকদের কোনো সংগঠন থেকেই এ ধরনের কোনো প্রস্তাব আসেনি। সুতরাং, স্বপ্রণোদিত হয়ে কিছু করা ঠিক হবে না।