আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৪-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

শিং মাছের পোনায় সাফল্য

মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ
| সুসংবাদ প্রতিদিন

দেশি মাছের মধ্যে শিং মাছের একটি আলাদা বিশেষত্ব আছে। এ মাছ বাজারের একটি দামি মাছ। এ মাছ খেলে দ্রুত রক্ত বৃদ্ধি হয়। বিল, ডোবা ও খালে এ মাছ প্রাকৃতিকভাবেই চাষ হয়ে আসছিল। কিন্তু দিন দিন প্রাকৃতিক জলাশয় বিলীন হওয়ার সঙ্গে এ মাছটিও বিলুপ্তির পথে। 

এদিকটি চিন্তা করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ মৎস্য সম্প্রসারণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের খামারে ২০১৭ সালে শিং মাছের পোনা উৎপাদন শুরু হয়। সফলতা পাওয়ায় এ বছরও (২০১৮) শিং মাছের পোনা উৎপাদন করা হয়েছে। চাষিরা শায়েস্তাগঞ্জ মৎস্য সম্প্রসারণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের খামার ব্যবস্থাপক মো. নাছির উদ্দিনের সার্বিক পরামর্শ পেয়ে এ মাছের পোনা সংগ্রহ করে নিজেদের পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন। জানা গেছে, শিং মাছের চাষে সফলতা আসায় বর্তমানে শুধু শায়েস্তাগঞ্জ নয়, এর বাইরেও বিভিন্ন এলাকার খামারিরা পুকুর প্রস্তুত করে পুরোদমে শিং মাছের চাষ শুরু করেছেন।

শায়েস্তাগঞ্জ মৎস্য সম্প্রসারণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের খামার থেকে শিং মাছের পোনা সংগ্রহ করে চাষ করেছেন রিপন মিয়া। তিনি বলেন, বাজারে শিং মাছের চাহিদা রয়েছে। দেশি এ মাছটি ডোবা ও খাল থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে। তাই দেশীয় মাছের ঐতিহ্য রক্ষায় এ মাছ চাষ করে যেমন আনন্দ পাচ্ছি, তেমনি লাভবানও হচ্ছি। রিপনের মতো শত শত চাষি আজ জেলার বিভিন্ন স্থানে দেশীয় শিং মাছের চাষ করছেন।

মো. নাছির উদ্দিন বলেন, পুকুরে শিং মাছ চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা। ভালো করে চাষ করতে পারলে কার্পজাতীয় মাছের তুলনায় শিং মাছ চাষে লাভ বেশি। তাছাড়া কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমেও পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশি শিং মাছের পোনা উৎপাদন এবং চাষ সম্ভব। তিনি জানান, এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশি শিং মাছের পোনা পাওয়া যায়। এ মাছ একক চাষের জন্য ৫০০ থেকে ১ হাজার পোনা মজুত করা যাবে। শিং মাছ চাষে পুকুরে প্রতি শতাংশে ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি সাইজের ৮ থেকে ১০ পিস রুই, কাতলা, গ্রাসকার্প, মৃগেল মাছের পোনা ছাড়তে হবে। কিছু কার্পজাতীয় মাছের পোনা ছাড়লে পুকুরের পরিবেশ ভালো থাকে। তিনি বলেন, পুকুর নির্বাচনের সময় কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে পুকুর অবশ্যই বন্যামুক্ত হতে হবে। পুকুরের পার হতে হবে মজবুত। কোনো ধরনের ছিদ্র থাকলে সব শিং মাছ চলে যাবে। বৃষ্টির সময় পানির উচ্চতা ৪ ফুটের বেশি হবে নাÑ এমন পুকুর নির্বাচন করতে হবে। পুকুর আয়তাকার হলে ভালো ফল পাওয়া যায়। পুকুরের আয়তন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে হতে হবে। এক প্রান্ত অন্য প্রান্তের চেয়ে ১ ফুট ঢালু রাখা দরকার। নতুন পুকুরের চেয়ে পুরানো পুকুরে শিং মাছ চাষ ভালো হয়। নতুন পুকুর হলে ভালোভাবে চাষ দিয়ে প্রতি শতাংশে কমপক্ষে ২০ কেজি গোবর ও ভালোভাবে মই দিয়ে তারপর চুন দিতে হবে। পুরানো পুকুর হলে প্রথমেই সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলতে হবে। এরপর চুন দিতে হবে শতাংশপ্রতি ১ কেজি। চারদিকে জাল দিয়ে ভালোভাবে ঘের দিতে হবে। চারপাশে জাল দেওয়ার পর পুকুরে শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে ২ থেকে ৩ ফুট পরিষ্কার পানি দিতে হবে। পানি দেওয়ার ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে ছাড়তে হবে পোনা। পোনা ছাড়ার পর এক ইঞ্চি ফাঁসের একটি জাল পেতে রাখতে হবে।
তিনি জানান, পোনা মজুতের পর প্রথম ১০ দিন দৈনিক মাছের ওজনের ২০ শতাংশ খাবার প্রয়োগ করতে হয়। ছোট থাকা শিং মাছ সাধারণত রাতের বেলা খেতে পছন্দ করে। তাই ২০ শতাংশ খাবারকে দুই বেলায় সমান ভাগ করে ভোরের দিকে একটু অন্ধকার থাকতে প্রয়োগ করতে হয়। মাছ মজুতের পরের ১০ দিন ১৫ শতাংশ হারে এবং এর পরের ১০ দিন মাছের ওজনের ১০ শতাংশ হারে পুকুরে খাবার প্রয়োগ করতে হয়। এভাবে এক মাস খাবার প্রয়োগের পর ৫ শতাংশ হারে পুকুরে খাবার দিতে হবে। শিং মাছ ৩ ইঞ্চি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনের বেলা খাবার দিতে হবে। সন্ধ্যার পর যে খাবার দেওয়া হতো সেটি সন্ধ্যার একটু আগে এগিয়ে এনে আস্তে আস্তে বিকালে দিতে হয়। অন্যদিকে ভোরবেলার খাবারও এমন করে সকাল ৯ থেকে ১০টার দিকে পিছিয়ে নিতে হবে। তিনি আরও জানান, অন্যান্য মাছ জাল টেনে ধরা গেলেও শিং মাছ জাল টেনে ধরা কঠিন। শিং মাছ ধরতে হলে শেষরাতের দিকে পুকুর সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলতে হবে। শিং মাছ ধরার উত্তম সময় হলো ভোরবেলা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। মাছ ধরার পর মাছ থেকে গেলে শ্যালো দিয়ে কমপক্ষে ২ ফুট ঠান্ডা পানি দিয়ে পুকুর ভরে রাখা। পরদিন আবার একই নিয়মে মাছ ধরতে হবে। শিং মাছের পুকুর একপাশে ঢালু রাখা দরকার। তা না হলে পুকুরজুড়ে মাছ ছড়িয়ে থাকবে। মাছের কাঁটা বিধলে সেখানে খুবই ব্যথা হয়। কাঁটা বেধানো জায়গায় ব্যথানাশক মলম লাগিয়ে গরম পানি দিলে সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা উপশম হয়।