আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বাংলাদেশ সাক্ষর সমাজ থেকে কত দূরে?

শাওয়াল খান
| সম্পাদকীয়

সাক্ষরতার সংজ্ঞা ক্রমে বিবর্তিত হচ্ছে, সেই সঙ্গে শিক্ষাও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন, আমাদের সাক্ষরতা কি ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমাজে সম্পৃক্ত হতে সক্ষম? সাক্ষরতার সংজ্ঞা সময়ের ব্যাপ্তি অনুসারে বিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করেছে, যা আমাদের নির্মীয়মাণ সাক্ষর সমাজকে ক্রমে সমৃদ্ধ করছে

 

‘সবার জন্য শিক্ষা’ বেশ শ্রুতিমধুর একটি সেøাগান। এর মর্মার্থ উপলব্ধি করলে শুধু শ্রুতিমধুর নয়, বেশ আশাজাগানিয়াও বলতে হবে। নব্বইয়ের দশক থেকে এই সুমধুর সেøাগান বিশ্বজুড়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও সেই থেকে এই ডামাডোল কম বাজেনি। তবু ‘সবার জন্য শিক্ষা’র পথ এখনও প্রশস্ত হয়নি। শিক্ষার প্রাথমিক সেøাগান সাক্ষরতা, সেটাও অর্জিত হয়নি কাক্সিক্ষত মাত্রায়। এমন পরিস্থিতিতে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নামক মনোমুগ্ধকর এই সেøাগান প্রশ্ন জাগাচ্ছেÑ আমরা একটা সাক্ষর সমাজ নির্মাণ থেকে কত দূরে? 
বিশ্বসমাজ নব্বইয়ের দশক থেকে শিক্ষা নিয়ে মনোমুগ্ধকর এ সেøাগান ছড়িয়ে বিশ্বব্যাপী আশার সঞ্চার করেছে। উদ্দেশ্যÑ সাক্ষর সমাজ বিনির্মাণ। যোগ্যতার মানবসম্পদ তৈরি। সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার, বিশ্বব্যাপী বহমান দ্রুতগতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার। বিশ্বব্যাপী এই হাওয়াই বইছে এখন। সমগ্র বিশ্ব যেন সেøাগান বা বৈশ্বিক এক পল্লী। দ্রুতগতির যোগাযোগ মাধ্যম এবং আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ মানুষের চলার গতি এবং জীবনমান উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তনের হাওয়া প্রয়োজন সর্বক্ষেত্রে। 
তবে পরিবর্তনের সবচেয়ে দ্রুতগতি পরিলক্ষিত হয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচরণে, সামাজিক কর্মকা-ে। আর মানুষের জীবনাচরণ ও সামাজিক কর্মকা-কে প্রভাবিত করছে সাক্ষরতা ও শিক্ষা। কারণ সাক্ষরতা ও শিক্ষার প্রভাব থেকে কোনো মানুষই মুক্ত নয়। এর প্রকৃত একটা উদাহরণ বাংলাদেশে এখন সাক্ষর-নিরক্ষর প্রায় সব মানুষের হাতে হাতে মোবাইল প্রযুক্তি। চলমান বিশ্বে সাক্ষরতা দক্ষতা অর্জন এবং শিক্ষা সংস্কার উন্নত জীবনের প্রধান ও অন্যতম শর্ত। এটা হতে পারে একান্ত নিজস্ব কর্মপরিধির ক্ষেত্রে, পারিবারিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপরিসরে, এমনকি জনস্বার্থে রাষ্ট্রের কর্মপরিকল্পনা, ভাবধারা ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নীতিগত ক্ষেত্রে এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রেও। নতুন নতুন আবিষ্কৃত তথ্যপ্রযুক্তিও এক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে বলা চলে। এক্ষেত্রে জনগণের সাক্ষরতা দক্ষতা অর্জনের দায়, শিক্ষা অর্জনের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। একটি সাক্ষর সমাজ রাষ্ট্রের পথচলার যোগ্যতার সাথী এবং সময়ের পথপ্রদর্শক। প্রযুক্তিনির্ভর দুনিয়ায় সেই বিষয়টা নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। 
শিক্ষার ইতিহাস মানুষের ইতিহাসের মতোই পুরানো। মানুষ যখন থেকেই সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে শুরু করে, তখন থেকেই শিক্ষার প্রয়োজন অনুভূত হতে থাকে। প্রাচীনকালের গুহচিত্র সেই কথাই বলে। এখন সে কথায় যাচ্ছিনে, মানুষের শিক্ষার ইতিহাস বা শিক্ষার শুরু, শিক্ষার ধারা জানতে হলে, পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমের কর্মপরিধি জানতে হলেও একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। 
বাংলাদেশের তথা এই অঞ্চলের প্রারম্ভিক শিক্ষাব্যবস্থা সুপ্রাচীন ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর প্রোথিত। প্রাচীন যুগ, মধ্য যুগ ও ব্রিটিশ শাসন আমলের সামাজিক ব্যবস্থায় প্রারম্ভিক শিক্ষা তথা প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব অনুভূত হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে শিশুদের পাঠশালা, মক্তব এবং টোলে পাঠানোর রীতি প্রচলিত ছিল। এটা ছিল সামাজিক নিয়মের একটা অংশ। মূলত সমাজ সম্পৃক্ততার অংশ হিসেবে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণে অভ্যস্ত করার রেওয়াজ চালু হয়েছিল। তবে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এর ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, চলমান সময়েও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার প্রমাণ বাংলাদেশে এখনও ৪০ ভাগ মানুষ নিরক্ষর। নিরক্ষরতার খোলস ছাড়াতে পারলেই একজন মানুষ সাক্ষর সমাজের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেন।
সাক্ষর সমাজ আসলে কী? সময়ের পরিক্রমায় ভারতীয় উপমহাদেশে সাক্ষরতা শব্দের প্রথম প্রয়োগ দেখা যায় ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দের আদম শুমারির দলিল দস্তাবেজে। মাতৃভাষা অথবা যে-কোনো ভাষার অক্ষর প্রয়োগ করে অর্থপূর্ণ শব্দ তৈরি থেকেই, বাক্য তৈরির প্রক্রিয়ায় জন্ম নেয় সাক্ষর শব্দের। আর সেই প্রক্রিয়ায়, বলার, লেখার এবং এককথায় মনের ভাব প্রকাশ করার আগাগোড়া প্রক্রিয়াটির নাম সাক্ষরতা। এই সাক্ষরতার সঙ্গে দক্ষতা অর্জনের সম্পর্ক রয়েছে। এই দক্ষতাগুলো সামাজিক কর্মকা-ের মাধ্যমে অর্জিত হয়। মূলত সাক্ষরতা দক্ষতাসম্পন্ন মানুষের সমন্বয়ে পরিচালিত সমাজই সাক্ষর সমাজ হিসেবে পরিচিত। তবে স্বল্পমাত্রার সাক্ষরও সাক্ষর সমাজের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বলে রাখা ভালো, সাক্ষরতা শিক্ষার শেষ কথা নয়। 
তাই শিক্ষার যৌক্তিকতার কারণে ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী একটাই রব ওঠেÑ সবার জন্য শিক্ষা। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে বিশ্ব নেতারা অঙ্গীকার করেন, ২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।  (World Declaration on Education for all, Jomtien, Thailand, UNESEO, 1990)। একই বছর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শিশু অধিকারবিষয়ক সম্মেলন, ১৯৯০ সালে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৯টি জনবহুল দেশের ‘সবার জন্য শিক্ষা’ শীর্ষক সম্মেলনে বাংলাদেশ বিশ্ব ঘোষণার সঙ্গে একাত্মতা প্রকশ করে। এরপর ১৯৯৪ সালে স্পেনে ইউনেস্কো কর্তৃক আয়োজিত World Conference on special Needs Education-এ প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব সুবিধাবঞ্চিত শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় একীভূত শিক্ষা দর্শন বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৪-১৮ জুলাই ১৯৭৭ সালে জার্মানির হামবুর্গে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বয়স্ক সম্মেলনেও বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে এবং হামবুর্গ ঘোষণা মতে ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশেও দেশব্যাপী আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস এবং বয়স্ক শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে বয়স্ক শিক্ষা সপ্তাহ উদযাপন আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের অনুষ্ঠান সূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। 
মূলত বিশ্বব্যাপী সাক্ষরতা ও শিক্ষা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কিছু পদক্ষেপ শুরুর দিনক্ষণ নব্বইয়ের দশকে পরিলক্ষিত হলেও এসবের উদ্ভব আমাদের দেশে অনেক আগেই ছিল। শিক্ষার আনুষ্ঠানিকতা সবসময় প্রাতিষ্ঠানিক ছিল না। এমনকি রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতার অংশও ছিল না। এখন যেমন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাকে অনেকখানি সমৃদ্ধ করেছে সব শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার বাধ্যবাধকতায় এনে। তবে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে, সেটা হচ্ছে মূলধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে, পরীক্ষাকে ঘিরে কোচিং নামক ব্যাপক শিক্ষা বাণিজ্য, অবিশ্বাস্য পাসের হার, জিপিএ-৫, সোনালি জিপিএ ইত্যাদি। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে অর্জিত শিক্ষার মান নিয়েও। আমাদের ভাবতে হবে, অর্জিত শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কারণ কী? শিক্ষা পদ্ধতির দুর্বল দিক চিহ্নিত করে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করা শিক্ষাব্যবস্থারই অংশ। এর জন্য দরকার শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। সেটাই এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। শিক্ষা যেহেতু সাক্ষরতা দিয়েই শুরু, তাই কাল পরিক্রমায় বিবর্তিত সাক্ষরতাও সামগ্রিক শিক্ষা সংস্কারকে এগিয়ে রাখে, সর্বোপরি সাক্ষর সমাজ নির্মাণের পটভূমি তৈরি করে। ১৯৪০-এর দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতাকে ‘সাক্ষরতা’ বলে অভিহিত করা হয়। ধীরে ধীরে এটা পরিবর্তিত হতে থাকে। ষাটের দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতার সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষই সাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হয়। সত্তরের দশকে পড়া, লেখা ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতার দক্ষতা এবং আশির দশকে পড়া, লেখা, হিসাব-নিকাশ, সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতা দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়। নব্বইয়ের দশকে এসে সাক্ষরতা ভিন্ন রূপলাভ করে এবং সম্প্রসারিত অবয়বে দক্ষতার ক্ষেত্রে সংযোজিত হয় জীবনের নতুন নতুন চাহিদা। যেমনÑ সামাজিক কর্মকা-ের দক্ষতা, যোগাযোগের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, আত্ম প্রতিরক্ষার দক্ষতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, সাংস্কৃতিক দক্ষতা, সামগ্রিক পরিবেশ পরিস্থিতি অনুধাবনের দক্ষতা, সর্বোপরি অধিকার ও ক্ষমতায়নের দক্ষতা অর্জনের মূলে রয়েছে সাক্ষরতার মৌলিক দক্ষতা।
পড়ালেখা ও হিসাব-নিকাশের মৌলিক দক্ষতাই সাক্ষরতার মূল স্তম্ভ। এই তিন মৌলিক দক্ষতাকে সম্মিলিতভাবে 3rs বলা হয়। 3rs হচ্ছে, Reading, Writing  এবং Arithmetic। মূল ধারণাটি এসেছে জার্মান ভাষা থেকে। একজন সাক্ষর ব্যক্তি মাতৃভাষায় সহজে লিখতে, পড়তে ও বুঝতে পারে। মনের ভাব বলে প্রকাশ করতে পারে, লিখে প্রকাশ করতে পারে এবং দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশ মুখে মুখে করতে পারে আবার লিখেও রাখতে পারে। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে সাক্ষরতার যে সংজ্ঞা নিরূপণ করা হয়েছিল সেখানে বলা হয়েছিল যে, মাতৃভাষায় কথা শুনে বুঝতে পারা, মৌখিক ও লিখিতভাবে তা প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন হিসাব করা ও লিখে রাখার ক্ষমতাই সাক্ষরতা দক্ষতা। ৩ৎং অর্জনের মাধ্যমে সাক্ষরতার মৌলিক দক্ষতাগুলো অর্জন সম্ভব হয়।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ঘোষিত জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ধারা ২৬-এ সাক্ষরতা অধিকারের কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এই ঘোষণায় বলা হয়, শিক্ষা প্রতিটি মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। মৌলিক স্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্য এই শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগও বিস্তৃত হতে হবে। জাতিসংঘের এই ঘোষণার পর সদস্যভুক্ত প্রায় প্রতিটি দেশ সাংবিধানিকভাবে সাক্ষরতাকে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ধারা ১৭-তে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাক্ষরতা অর্জনের বিধান রয়েছে।
শিক্ষা মানুষের পথচলার সাথী, জীবন যুদ্ধের হাতিয়ার। সাক্ষরতা শিক্ষার প্রাথমিক সোপান, জীবনের সার্বিক অগ্রগতির নির্দেশক। প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক, আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বা উপানুষ্ঠানিক হাতে-কলমে যে-কোনো শিক্ষা গ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অবশ্যই সাক্ষরতা জ্ঞান অর্জন করতে হয়। তাই শিক্ষার আবশ্যিক শর্ত সাক্ষরতা অর্জনের জাতিসংঘ এবং ইউনেস্কোর বিশেষ অনুপ্রেরণায় উদযাপিত হয় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতার দিবস। এই অনুপ্রেরণা শুরু হয়েছিল বহু আগে  ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে পৃথিবী থেকে নিরক্ষরতা দূর করার জন্য গৃহীত একটা প্রস্তাব থেকে। এই প্রস্তাবে গরিব দেশের মানুষকে সাক্ষর করার জন্য আন্দোলন এবং প্রচার অভিযান চালানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৫ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক ৮ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৬ সাল থেকে এ দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদযাপিত হয়।
পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তনসহ নানাবিধ কারণে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের কর্মসূচি উজ্জ্বলতা হারালেও জাতীয় জীবনে সাক্ষরতার প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে। কারণ ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দের ভারতীয় দলিল-দস্তাবেজে স্থান করে নেওয়া সাক্ষরতার সংজ্ঞা পরিবর্তিত, পরিমার্জিত ও বিবর্তিত হতে হতে সাক্ষরতা শিক্ষার মৌলিক ভিত্তির সঙ্গে প্রায় একীভূত হতে চলেছে। সাক্ষরতার সংজ্ঞা কালের বিবর্তনে বিবর্তিত অনেক সমৃদ্ধ এবং চলমান সময়কে ধারণ করে চলেছে। আবার অর্জিত দক্ষতার ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণ ঘটছে। নতুন সাক্ষররা জীবনের নানা প্রয়োজনে অর্জিত দক্ষতা কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে এবং ফলপ্রসূ প্রভাব ফেলতে সক্ষম হচ্ছে। এই ফলপ্রসূ প্রভাবই সাক্ষর সমাজের অন্যতম শর্ত। তবে এমন ফলপ্রসূ প্রভাব সৃষ্টিকারী সাক্ষর ব্যক্তির সংখ্যা এখনও সীমিত। আমাদের প্রত্যাশা, সমাজের প্রত্যেক মানুষ কার্যকর সাক্ষরতার আওতায় আসুক, বাংলাদেশের মাটিতে কর্মোদ্যমপূর্ণ একটি সাক্ষর সমাজ উদ্ভাসিত হোক।
সাক্ষরতার সংজ্ঞা ক্রমে বিবর্তিত হচ্ছে, সেই সঙ্গে শিক্ষাও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন, আমাদের সাক্ষরতা কি ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমাজে সম্পৃক্ত হতে সক্ষম? সাক্ষরতার সংজ্ঞা সময়ের ব্যাপ্তি অনুসারে বিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করেছে, যা আমাদের নির্মীয়মাণ সাক্ষর সমাজকে ক্রমে সমৃদ্ধ করছে। যেমন সাক্ষর বলতে ১৯০১-এ মাতৃভাষায় নাম স্বাক্ষর করতে পারার ক্ষমতা। ১৯৫১-এ স্পষ্ট ছাপার অক্ষরে লেখা যে-কোনো বাক্য পড়তে পারার ক্ষমতা। ১৯৬১-এ দেখেশুনে, বুঝে যে-কোনো ভাষা পড়তে পারার ক্ষমতা। ১৯৭৪-এ যে-কোনো ভাষা পড়তে এবং লিখতে সক্ষম হওয়া। ১৯৮১-তে যে-কোনো ভাষায় চিঠি লিখতে পারার ক্ষমতা। ১৯৮৯-তে মাতৃভাষায় কথা শুনে বুঝতে পারা, মৌখিকভাবে ও লিখিতভাবে তা ব্যক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন হিসাব করার এবং লিপিবদ্ধ করে রাখার ক্ষমতা। ২০০৩-এ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে বাংলাভাষায় কথা শুনে বুঝতে পারবে, মৌখিক ও লিখিতভাবে তা প্রকাশ করতে পারবে, সমাজ পরিবেশকে বিশ্লেষণ করতে পারবে, দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী যেমনÑ আলোকচিত্র, লেখচিত্র, পোস্টার, বই, ছবি, চার্ট, ব্যানার ইত্যাদি পড়তে ও ব্যাখ্যা করতে পারবে এবং সেই সঙ্গে অতি প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশ করতে ও তা টুকে রাখতে পারবেÑ এমনটাই সাক্ষরতার আওতায় সম্পৃক্ত করা হয়।
২০০৭ সালে এসে সাক্ষরতা দক্ষতার পরিধি আরও সম্প্রসারিত হয়েছে; উল্লিখিত 3rs, 6rs-এ উন্নীত হয়েছে। সম্প্রসারিত নতুন 3rs  হলো-Rights- অধিকার সচেতনতা, Respect- পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং Resilience- অভিযোজন ক্ষমতা। সন্দেহ নেই অদূর ভবিষ্যতে সাক্ষরতার সংজ্ঞায় তথ্যপ্রযুক্তির নতুন নতুন দিকও যুক্ত হবে বাস্তবতার প্রয়োজনে। এখনই চাষবাসসহ বিভিন্ন সেবা পেতে মানুষ বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করছে। ধারণা করা হচ্ছে, খুব দ্রুত তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। তাই প্রশ্ন, আমাদের সাক্ষর সমাজ কি তা গ্রহণে প্রস্তুত অথবা প্রস্তুতি কতদূর? হ

শাওয়াল খান
লেখক ও শিক্ষাকর্মী