আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

যাত্রা শুরু ঢাকা ও চীনা স্টক এক্সচেঞ্জের

নিজস্ব প্রতিবেদক
| অর্থ-বাণিজ্য

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চীনের কনসোর্টিয়াম শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের যাত্রা শুরু হলো। মঙ্গলবার সকালে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে শেয়ার ও অর্থ বিনিময়ের মাধ্যমে এ যাত্রার সূচনা হয়েছে। এর মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মোট শেয়ারের ২৫ শতাংশের মালিকানায় থাকবে চীনের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ। 

এদিন রাজধানীর একটি হোটেলে ডিএসই আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চীনের শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কাছ থেকে মোট ৯৬২ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সরকারের স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ কাটা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। ফলে মোট ৯৪৭ কোটি টাকা জমা হয়েছে ডিএসইর অ্যাকাউন্টে। চীনা কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধি জি ওয়েনহাই ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএসই চেয়ারম্যান আবুল হাসেম বলেন, পুঁজিবাজারের জন্য আজকের দিনটি ঐতিহাসিক। এটি যে শুধু পুঁজিবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তা নয় বরং সারা দেশের জন্য সুখবর। কারণ আজকের এ চুক্তির মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে পরিণত হয়েছে। সকালে সাংহাই ও সেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জের বিও অ্যাকাউন্টে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তারা স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে শেয়ারের মূল্য (৯৬২ কোটি টাকা) পরিশোধ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএসইর পরিচালক বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া, সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান, মিনহাজ মান্নান ইমন, শরীফ আতাউর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। 
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জি ওয়েনহাই বলেন, বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জের মান উন্নয়ন এবং অন্যান্য সব ধরনের সহযোগিতা করবে চীনের সেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়াম। আমরা ডিএসইর প্রযুক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে চাই। এর মাধ্যমে উন্নয়নের এক ধাপ এগিয়ে যাবে ডিএসই। একইসঙ্গে স্ট্যাটিজিক ম্যানেজমেন্ট শক্তিশালী না হওয়া পর্যন্ত সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান বলেন, ৩ সেপ্টেম্বর চীনা কনসোর্টিয়াম অর্থ দিয়েছে এবং ৪ সেপ্টেম্বর শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ডিএসই আরও এগিয়ে যাবে। চীনা কনসোর্টিয়াম থেকে প্রাপ্ত অর্থ স্টেকহোল্ডাররা বাজারে বিনিয়োগ করলে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উল্লেখ, ২৬ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক চীনের সাংহাই ও সেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জ জোটকে নিটা অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে ১৪ মে চীনা জোটের সঙ্গে চুক্তি সই করে ডিএসই। 
এ বিষয়ে বাজার বিশ্লেষক দেবব্রত কুমার সরকার জানান, এখন দেশের পুঁজিবাজার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করল। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি অনেক বড় সুসংবাদ। চীনের বড় ফান্ডও এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এ চুক্তির মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নে চীনের যে প্রস্তাব সেটি আমাদের জন্য ইতিবাচক। তাদের মোট বিনিয়োগের মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা ডিএসইর তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়নের কাজে ব্যয় করবে। এতে আগামীতে পুঁজিবাজার তথ্যপ্রযুক্তির দিক দিয়ে আরও সমৃদ্ধ হবে। 
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ দেশের পুঁজিবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এ চুক্তির মাধ্যমে সেই পথ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের পুঁজিবাজারে এ সময়টিতে সবচেয়ে মন্দার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। কারণ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের কারণে রাজনৈতিক প্রভাবে প্রতিবারই পুঁজিবাজারে তারল্য সমস্যা তৈরি হয়। এ সময়টিতে চীনা কনসোর্টিয়ামের টাকা পুঁজিবাজারে আসায় সেটির মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ তৈরি হবে, যা পুরো বাজারের জন্য ইতিবাচক। 
চীনের কনসোর্টিয়াম ডিএসইর প্রতিটি শেয়ারের দাম ধরা হয়েছিল ২২ টাকা। তবে শর্তানুযায়ী, ডিএসইর শেয়ারহোল্ডাররা এরই মধ্যে শেয়ারপ্রতি ১ টাকা লভ্যাংশ নেওয়ায় সমপরিমাণ দর কমে এসেছে। এক্ষেত্রে চীনা কনসোর্টিয়াম ডিএসইর ১৮০ কোটি শেয়ারের ২৫ শতাংশ বা ৪৫ কোটি শেয়ারের জন্য প্রতিটি দর দিয়েছে ২১ টাকা। অন্যদিকে চীনা কনসোর্টিয়াম ডিএসইর কারিগরি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ৩০০ কোটিরও বেশি টাকা (৩৭ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় করবে। অর্থ পরিশোধ এবং ডিএসইর শেয়ার নিতে চীনা কনসোর্টিয়ামের ১১ সদস্যের এক প্রতিনিধি দল ঢাকায় অবস্থান করছে। ২৬ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক চীনের সাংহাই ও সেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামকে নিটা অ্যাকাউন্ট (বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ টাকায় রূপান্তরের বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট) খোলার অনুমতি দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ অনুমতির বিষয়টি পরের দিন ২৭ আগস্ট ডিএসই থেকে জোটটিকে জানিয়ে দেয়। ১৪ মে রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের দুই শেয়ারবাজার শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ডিএসইর চুক্তি সম্পন্ন হয়।
শুরুর দিকে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ এবং শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে পার্টনার করতে ডিএসইর বোর্ডসভায় সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে তা পাঠানো হয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কাছে। সেই প্রস্তাবে কিছু ত্রুটি থাকায় তা অনুমোদন না করে সংশোধিত প্রস্তাব দেয় বিএসইসি। একইসঙ্গে কিছু শর্ত পরিপালনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়। 
শর্তগুলোর মধ্যে ছিল, শেয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্টে (এসপিএ) এমন কোনো শর্ত রাখা যাবে না, যা স্থানীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমন কোনো প্রস্তাবও রাখা যাবে না, যা পরিপালন করতে ডিএসইর বিদ্যমান মেমোরেন্ডাম এবং আর্টিক্যালস অব অ্যাসোসিয়েশন সংশোধন করতে হয়। পাশাপাশি ডিএসইর সাধারণ শেয়ারহোল্ডার ও বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট উন্নয়নের বিরুদ্ধে না যায়। এসপিএসহ কৌশলগত ইস্যু চূড়ান্ত করে কমিশনে জমা দেওয়ার আগে ডিএসইর শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নিতে হবে। কৌশলগত বিনিয়োগকারী ইস্যুতে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন ডিএসইর সাধারণ সভায় উপস্থাপন করতে হবে। ডিএসইর সাধারণ সভার সিদ্ধান্তপত্র, এসপিএসহ কনসোর্টিয়ামের অন্য কাগজাদি নিয়ে কমিশনে চূড়ান্ত আবেদন করতে হবে।
এরপর সব বিষয় সমাধান করে ডিএসইর বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের মাধ্যমে তা আবার বিএসইসির কাছে পাঠানো হয়। এরপরই বিএসইসির পক্ষ থেকে অনুমোদন পাওয়া যায়। 
জানা গেছে, ২০১০ সালে পুঁজিবাজার ধসের পর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বাড়াতে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা আলাদা করার জন্য ডিমিউচুয়ালাইজেশন অ্যাক্ট ২০১৩ করা হয়। কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ছাড়াও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিক বিবেচনায় কৌশলগত অংশীদার নেওয়ারও এবং তাদের জন্য মোট শেয়ারের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়। আর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বা ব্রোকারেজ মালিকরা স্টক এক্সচেঞ্জটির ৪০ শতাংশ শেয়ারের মালিকানায় থাকবেন। বাকি ৩৫ শতাংশ শেয়ার-পরবর্তী সময় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে হবে।