আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

দুর্ঘটনা ও যানজট : ইসলামের নির্দেশনা

মাহফুজুর রহমান তানিম
| প্রকৃতি ও পরিবেশ

জনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে হলে এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলা সঠিক রাখতে যথাযথ ট্রাফিক আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। দারে কুতনির একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুসলমানদের কোনো পথে বা কোনো বাজারে যদি কেউ কোনো জন্তু দাঁড় করিয়ে রাখে এরপর জন্তুটি যদি সামনের বা পেছনের পা দিয়ে কোনো কিছু মাড়ায় তাহলে মালিক ক্ষতিপূরণ দেবে।’ এ হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, কোনো ব্যক্তি তার যানবাহনের 
মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করলে সে জরিমানা দিতে বাধ্য

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও আহতের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। মৃত্যু মানেই স্বজন হারানোর কান্না। শোক ছাড়াও সড়ক দুর্ঘটনায় কখনও কখনও গোটা পরিবার ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। পাশাপাশি আরেকটি সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছেÑ তা হলো যানজট। যানজট রাজধানীর সবচেয়ে বড় সমস্যা। যানজটে প্রতিদিন নগরবাসীর ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে রাজধানীর যানজট বছরে ৯৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি বা অপচয় ঘটাচ্ছে। এই দুই সমস্যা নিরসনে ইসলামের কয়েকটি নির্দেশনা উল্লেখ করা হলো। 

জনসচেতনতা বৃদ্ধি
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। গবেষকদের মতে সচেতনতার অভাব সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ। গাড়ি চালক, পথচারী সবাই নিজেদের দায়িত্বে সজাগ দৃষ্টি রাখলেই এ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। চালকদের উদাসীনতা, ট্রাফিক আইন না মানা, দ্রুতগতিতে যানবাহন চালানো, ওভারটেক, ফিটনেসবিহীন ও অনিবন্ধিত গাড়ি, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও সড়কের বেহাল দশা; অন্যদিকে পথচারীর মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হওয়া, যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ট্রাকে যাত্রী বহন, কখনও মালামালের ওপর যাত্রী বহন ইত্যাদি কারণে বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। ইসলাম সব সময়ই দায়িত্ব সচেতন হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে। বোখারি শরিফের একটি হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রতিটি মানুষই দায়িত্বশীল, সুতরাং প্রত্যেকে অবশ্যই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বোখারি : ২৫৫৮)।

স্বাভাবিক গতিতে যানবাহন চালানো
দ্রুতগতিতে যানবাহন চালানো এবং রাস্তা পারাপার উভয়টিই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ইসলাম এ কাজগুলো ধীরস্থিরভাবে করার নির্দেশ দিয়েছে। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘ধীরস্থিরে কাজ করা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আর তাড়াহুড়ো করা শয়তানের পক্ষ থেকে।’ (বায়হাকি : ২০৭৬৭)। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে।’ (সূরা আল ফোরকান : ৬৩)।

দক্ষ চালক নিশ্চিতকরণ
গাড়ি চালকদের অদক্ষতা, অসচেতনতা ও অসাবধানতার কারণে অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। অদক্ষ চালকরা সাধারণত বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে থাকে, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, মাদক গ্রহণ করে গাড়ি চালানোর প্রবণতা কেড়ে নেয় অসংখ্য মানুষের প্রাণ। সড়ক হয়ে ওঠে অনিরাপদ। অথচ রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত মুসলিম ওই ব্যক্তি যার হাত ও মুখ থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (বোখারি : ৯)। 
আইনের যথাযথ প্রয়োগ
সড়কে  ট্রাফিক আইন না মানা, লাইসেন্সবিহীন চালক ও দুর্ঘটনায় দোষী চালকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অনেক আইন রয়েছে; কিন্তু সেসব আইনের প্রয়োগ নেই। ইসলাম আইন প্রয়োগের ব্যাপারে অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহর বাণীÑ ‘হে মোমিনরা! তোমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী হও। যদিও তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে অথবা তোমাদের পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে কোনো বিরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।’ (সূরা নিসা : ১৩৫)।

যানজট সমস্যা
সড়ক দুর্ঘটনার মতো আরও একটি সমস্যা হলো যানজট। এ সমস্যা এখন শুধু রাজধানীবাসীর নয়, অন্যান্য বিভাগীয় জেলা শহরেও যানজট এক বিড়ম্বনার নাম। দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিচ্ছে এ ভয়ঙ্কর সমস্যা। এ সমস্যা দূর করতে ইসলাম কিছু নির্দেশনা  দিয়েছে। যেমনÑ
চলাচলের রাস্তা নির্বিঘœ রাখা 
যানজট নিরসনের অন্যতম উপায় হলো, যান ও মানুষ চলাচলের রাস্তায় কোনো প্রতিবন্ধকতা না রাখা। ফুটপাতে হাঁটার জায়গাজুড়ে পণ্যসামগ্রীর পসরা আর হকারদের ব্যস্ততা, রাস্তা দখল করে গাড়ি পার্কিং বাড়িয়ে দিচ্ছে রাস্তার যানজট। অথচ রাসুল (সা.) রাস্তায় ক্ষতিকর কোনো কিছু রাখার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। হজরত মু’আজ বিন জাবাল (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘তোমরা তিনটি অভিশাপ আনয়নকারী কর্ম থেকে বাঁচো। আর তা হলো, ঘাটে, মাঝ রাস্তায় এবং ছায়ায় প্রাকৃতিককর্ম সম্পাদন করা।’ (আবু দাউদ : ২৬; ইবনে মাজাহ : ৩২৮; তারগিব : ১৪১)। অন্য হাদিসে এসেছে, একদা এক সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর নবী! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যার দ্বারা আমি উপকৃত হতে পারব। তিনি বললেন, ‘মুসলিমদের রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করো।’ (মুসলিম : ৬৮৩৯)। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ তো ঈমানের অঙ্গ বলে হাদিস শরিফে ঘোষণা রয়েছে।

ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ
জনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে হলে এবং ট্রাফিক শৃঙ্খলা সঠিক রাখতে যথাযথ ট্রাফিক আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। দারে কুতনির একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুসলমানদের কোনো পথে বা কোনো বাজারে যদি কেউ কোনো জন্তু দাঁড় করিয়ে রাখে এরপর জন্তুটি যদি সামনের বা পেছনের পা দিয়ে কোনো কিছু মাড়ায় তাহলে মালিক ক্ষতিপূরণ দেবে।’ এ হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়, কোনো ব্যক্তি তার যানবাহনের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করলে সে জরিমানা দিতে বাধ্য। 

দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা
সবাই তার নাগরিক ও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে যানজট দূরীকরণে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে খুব সহজেই এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। হাদিসের দৃষ্টিতে রাস্তারও কিছু হক রয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খ পূর্ণ করার প্রতি বিশেষ তাগিদ দিয়েছেন রাসুল (সা.)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা রাস্তার হক আদায় করো।’ সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, রাস্তার হক কী ইয়া রাসুলুল্লাহ? তিনি বললেন, ‘দৃষ্টি অবনত রাখা, কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা, সালামের উত্তর প্রদান, সৎকর্মে আদেশ ও অসৎকর্মের নিষেধ করা।’ (বোখারি : ২৪৬৫; মুসলিম : ৫৬৮৫)। তিনি আরও বলেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তায় চলতে চলতে একটি কাঁটার ডাল পেল, সে সেটিকে সরিয়ে দিল। আল্লাহ তার এই কাজের মূল্যায়ন করলেন এবং তাকে পাপমুক্ত করে দিলেন।’ (বোখারি : ৬৫২; মুসলিম : ৫০৪৯)।
হাদিস ও কোরআনের এসব শিক্ষা গাড়ির চালক, হেলপারসহ পরিবহন কর্মীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। আশা করা যায় যে, তাতে সর্বাধিক সুফল পাওয়া যাবে।