আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

মাসে ৬০০ কোটি টাকা লোকসান গুনছে বিপিসি

সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম
| প্রথম পাতা

প্রতি মাসে গড়ে ৬০০ কোটি টাকা করে লোকসান গুনছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিদেশ থেকে তিন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করে দেশে বাজারজাত করার পর এসব লোকসান হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে এখন ২০ কোটি টাকা করে লোকসান গোনা হচ্ছে। দেশে দৈনিক বিক্রির তালিকায় ডিজেলের পরিমাণ বেশি। এর মধ্যে ডিজেল বিক্রি করে প্রতিদিন সর্বাধিক ১৬ থেকে ১৮ কোটি টাকা করে লোকসান গোনা হচ্ছে। লোকসানের তালিকায় দ্বিতীয় জ্বালানি হিসেবে অবস্থান করছে ফার্নেস অয়েল। প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা করে লোকসান গোনা হচ্ছে ফার্নেস অয়েল খাতে। আর প্রতিদিন কেরোসিন বিক্রি করে অন্তত গড়ে ৫০ লাখ টাকা করে লোকসান গোনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত দুই ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেল বিক্রি বাবত মুনাফা অর্জনের সুদিন হারিয়ে গেছে। বিপিসির ঘাড়ে নেমে এসেছে পুরানো লোকসানের খড়গ।

এ ব্যাপারে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স অ্যান্ড প্ল্যানিং) সৈয়দ মোজাম্মেল হক জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পর থেকে বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে লোকসান গুনছে। কোনো মাসে দৈনিক ২০ কোটি টাকা; আবার কোনো মাসে দৈনিক ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম না কমা পর্যন্ত লোকসান কমা কিংবা আগের মতো মুনাফা অর্জনের সুযোগ নেই। কেবল দাম কমলেই বিপিসি মুনাফা অর্জন করতে

পারবে। বিপিসির অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের এপ্রিলের আগ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল। পরিশোধিত ও অপরিশোধিত দুই ধরনের জ্বালানি তেলের দামই ছিল কম। কিন্তু ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির হতে থাকে। জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের দাম। ২০১৬ সালের এপ্রিলের আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল মাত্র ৪৩ মার্কিন ডলার। আর এপ্রিলের পর থেকে বাড়তে থাকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৮১ মার্কিন ডলার। ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পরিশোধিত প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ছিল ৫০ মার্কিন ডলার। সে ডিজেল এখন প্রতি ব্যারেল বিপিসি কিনছে ৯২ ডলার করে। ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রতি টন ফার্নেস অয়েলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ছিল ২১৬ ডলার। সে ফার্নেস অয়েলের টনপ্রতি দাম বাড়তে বাড়তে এখন ৪৭০ মার্কিন ডলারে ঠেকেছে।

বিপিসির অপারেশন্স ও পরিকল্পনা বিভাগ সূত্র জানায়, দেশে প্রতি বছর পরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদা বেশি থাকে। বছরে এখন ডিজেলের গড় চাহিদা ৫৭ লাখ টন। দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে পরিশোধন করে বিপিসি ডিজেল পায় ৫ থেকে ৭ লাখ টন। বছরে গড়ে অন্তত ৪৫ লাখ টন ডিজেল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ক্রয় করে দেশের চাহিদা সামাল দিতে হয়। জ্বালানি তেল আমদানিতে লোকসান বাড়তে থাকায় জ্বালানি তেল কেনা বাবত বিপিসির ঋণের বোঝাও বেড়ে চলেছে। ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকেই লোকসান হচ্ছে বেশি। এর আগে তিন বছরের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা দামের চেয়ে দেশের বাজারে বেশি দামে তেল বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ মুনাফা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় না করে দেশের বাজারে বিক্রি করা হয়েছিল জ্বালানি তেল। তাতে তেল বিক্রি করে বেশ মুনাফা হয়েছিল বিপিসির। বিক্রীত তেল থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিপিসি ৪ হাজার ২০৮ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করে। কিন্তু এখন বিপিসির সে লাভের সুদিন নেই। লোকসানের ঘানি টানতে গিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা।

বিপিসির সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি তেল আমদানিতে জেদ্দাভিত্তিক আইটিএফসি থেকে নিয়মিত ঋণ নেয় বিপিসি। গেল আট মাসে বিপুল অর্থ ঋণ হিসেবে নেওয়া হয় আইটিএফসি থেকে। এখন আরও বিপুল অর্থ ঋণ নিতে প্রস্তাব আছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। ঋণের চাহিদা কেবল বেড়েই চলেছে। আইটিএফসির ঋণ অনমনীয়। এটির সুদহার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। বিপিসির পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে, জ্বালানি তেল আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঋণ নিতে সম্মত হয়েছে বিপিসি। এখানে যেসব বিবেচনা কাজ করেছে তা হলো, জ্বালানি তেলের সরবরাহ সচল রাখা, বৈদেশিক মুুদ্রার স্থিতির ওপর চাপ কমানো এবং আইটিএফসিকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনায় রাখা।

বিপিসির হিসাব বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৪ সালের মাঝামাঝি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে থাকে। এতে জ্বালানি তেল আমদানিতে ভর্তুকি কমতে থাকে সরকারের। আর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় না করায় পরে মুনাফা গোনে বিপিসি। ফলে তেল কেনার জন্য আইটিএফসি থেকে উচ্চ সুদের যে অনমনীয় ঋণ নেয়, সেটির গ্রহণও কমতে থাকে। বাড়তে থাকে বিপিসির মুনাফা। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে।

তেল কোম্পানি যমুনার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেল সমানভাবে বণ্টন করে দেওয়া হয় রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনাকে। তিন কোম্পানি নিয়োগকৃত ডিলারদের মাধ্যমে জ্বালানি তেল বাজারজাত করে। দেশজুড়ে তালিকাভুক্ত পেট্রোলপাম্প কিংবা ডিলারদের নিজস্ব মজুত অবস্থান থেকে জ্বালানি তেল বিক্রি করা হয়। তবে বেশিরভাগ জ্বালানি তেল বিক্রি করা হয় অনুমোদিত পেট্রোলপাম্প থেকেই। জ্বালানির মধ্যে শুধু জেট ফুয়েল এককভাবে বাজারজাত করে তেল কোম্পানি পদ্মা। বিমানের জ্বালানি জেট ফুয়েল দেশের বিমানবন্দরগুলোয় সরবরাহ নীরবচ্ছিন্ন রাখতে নেওয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা। তিন তেল কোম্পানির পাশাপাশি বেসরকারি স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডও (এসএওসিএল) দেশের বিভিন্ন স্থানে ডিলারদের মাধ্যমে জ্বালানি তেল বাজারজাত করে। তবে তা তিন তেল কোম্পানির চেয়ে কম।

ইআরএলের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। বাড়ানো হচ্ছে আরও নতুন পরিশোধন ইউনিট। কেবল দেশে চাহিদার সব জ্বালানি তেল অন্তত ৪০ লাখ টন পরিশোধন সক্ষমতা থাকলে বিপিসি কখনও লোকসানে পড়বে না। এজন্য দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন ক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। শুধু সরকারি পর্যায়ে নয়, বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোক্তারা জ্বালানি তেল পরিশোধন কারখানা তৈরি করতে এগিয়ে আসতে পারেন।