আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

জোটে একক, মহাজোটে হাফ ডজন প্রত্যাশী

মো. কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা
| শেষ পাতা

কুমিল্লার দাউদকান্দির ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এবং মেঘনা উপজেলার আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-১ সংসদীয় আসন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এ নির্বাচনি আসনের মাঝ দিয়ে গেছে। নানা কারণেই এ আসন গুরুত্বপূর্ণ। গোমতী সেতু পেরিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাড়া দেশের পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলের ১০টি জেলার লোকজনের সড়ক পথে যাতায়াতের প্রবেশমুখ এ সংসদীয় এলাকা। স্বাধীনতার পর এ আসনে খুব একটা সুখবর ছিল না আওয়ামী লীগের জন্য। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ আসন আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়ে যায়। ২০০৩ সালে মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর দলটির সাংগঠনিক অবস্থা বদলে যায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির দুর্গ হিসেবে খ্যাত দলের স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের আসনে বিজয় লাভ করেন সুবিদ আলী ভূঁইয়া।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সুবিদ আলী ভূঁইয়ার জন্য বেগ পেতে হয়নি। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের লক্ষ্য আসনটি ধরে রাখা, আর বিএনপি চায় এ আসন পুনরুদ্ধার করতে। তবে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে একাধিক প্রার্থী মাঠে প্রচারণায় থাকায় বিভক্তি ও টানাপড়েন থাকায় নানা সংকটে রয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। অপরদিকে আসনটি পুনরুদ্ধারে আটঘাট বেঁধে মাঠে রয়েছে বিএনপি। একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে সম্ভাব্য একক প্রার্থী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিপরীতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় মহাজোটের হাফডজন সম্ভাব্য প্রার্থী এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। 
আওয়ামী লীগ : মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে পরাজিত করেন। দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। বিএনপিবিহীন ওই নির্বাচনে সুবিদ আলী ভূঁইয়া ফুরফুরে মেজাজে অনেকটা বিনা বাধায় নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে সুবিদ 
আলী ভূঁইয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দলের বিদ্রোহী স্বতন্ত্রপ্রার্থী নাইম হাসান এবং মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক আবু জায়েদ আল-মাহমুদ (মাখন সরকার)। ওই নির্বাচনে সুবিদ আলী ভূঁইয়া পান ৯০ হাজার ৩৭৮ ভোট এবং দলের বিদ্রোহী নাইম হাসান ১৮ হাজার ৫৭২ ভোট। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ থেকে কমপক্ষে হাফডজন এবং মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকেও সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে বিচরণ করছেন। বর্তমান সংসদ সদস্য ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুবিদ আলী ভূঁইয়া বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গেল প্রায় সাড়ে ৯ বছরে এ নির্বাচনি এলাকায় তারই প্রচেষ্টায় শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘জনগণ আমার পাশে আছে, তৃতীয়বারের মতো নৌকার মনোনয়ন পেলে এ আসনটি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আবারও উপহার দিতে পারব।’ 
অপরদিকে এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সবুর। তিনিও এ আসন এলাকার বেশ আলোচিত ও সব মহলে তার বেশ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে জানান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তিনি বলেন, ছাত্রজীবন থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি। এরশাদের আমলে ফ্রিডম পার্টির জনসভায় বাধা দিতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে বহিষ্কার হয়েছি। নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য থেকে দলের জন্য নিবেদিতভাবে কাজ করেছি। আওয়ামী লীগ যখন যে দায়িত্ব আমাকে দিয়েছে তা শতভাগ পালন করার চেষ্টা করেছি। সম্ভাবনাময় এ আসন নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন আছে, সুযোগ পেলে তা বাস্তবায়ন করে মডেল আসন হিসেবে গড়ে তুলব। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে যদি মনোনয়ন দেন, তাহলে নৌকার বিজয় সুনিশ্চিত করতে পারব, ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, আমার লক্ষ্য একটাই, নৌকাকে বিজয়ী করা।  
দলের অপর সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আবদুল মান্নান, মেঘনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সফিকুল আলম, উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক শাহজাহান আলী ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার নাইম হাসান। মনোনয়নের বিষয়ে ড. আবদুল মান্নান বলেন, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। ১৯৭৪ সালে বাকশালে যোগদান করি। এরপর কৃষি ও সমবায় বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য আমাকে বুলগেরিয়ায় পাঠানো হয়। দেশে ফেরার পর থেকে দলের জন্য কাজ করছি। ২০০৮ এবং ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়ার নির্বাচনি প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। দুটি নির্বাচনেই দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সক্ষম হই, ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, এ আসনের প্রতিটি মাঠ-ঘাট আমার চেনা, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে আমি জনগণের সঙ্গে কাজ করেছি; এখনও করছি। তাই আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে দল আমাকে মনোনয়ন দিলে এ আসন নেত্রীকে উপহার দিতে পারব বলে আশা করছি।  
সফিকুল আলম বলেন, ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাই। পরে দলের সিদ্ধান্তে সরে যাই। তাই আগামী নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। শাহজাহান আলী ভূঁইয়া বলেন, দেশ স্বাধীনের পর এখানে দলের জন্য অনেক কাজ করেছি, এখনও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে দলের জন্য নিবেদিতভাবে কাজ করছি। দলে আমার অবদানের কথা আসন এলাকার সবস্তরের নেতাকর্মীর জানা। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে এ আসনটি জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আবারও উপহার দিতে পারব বলে আশা করছি। ব্যারিস্টার নাইম হাসান বলেন, ‘পারিবারিকভাবে আওয়ামী লীগের জন্য আমার বাবা ও পরিবারের সবার অনেক ত্যাগ আছে। আমিও দলের জন্য কাজ করছি। দুই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ করে আসছি। আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইব।  
বিএনপি : এ আসনে ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত টানা চারটি সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসন বিএনপির হাতছাড়া হয়। দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় নৌকার প্রার্থীর জন্য বিজয় সহজ হয়। তবে এ আসন এলাকার দুই উপজেলায় ড. মোশাররফের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। তার নেতৃত্বে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে এ আসন পুনরুদ্ধারের আশা করছেন দলের নেতাকর্মীরা। এ লক্ষ্যে আসন এলাকায় প্রতিনিয়ত সভা-সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণসহ গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। 
ক্ষমতাসীন জোটে হাফডজনেরও বেশি সম্ভাব্য প্রার্থীর পৃথক কর্মসূচি পালন ও সমন্বয়হীনতাসহ দলীয় টানাপড়েন ও বিভক্তির সুযোগটি কাজে লাগাতে নানা কৌশলে মাঠে কাজ করছে বিএনপি। সব মিলিয়ে এ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী হিসেবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হলে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। জনগণকে নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দিতে হবে। বিএনপিও চায় এমন নির্বাচনে অংশ নিতে। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষ প্রার্থী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর জয়ে কোনো অসুবিধা হবে না। তিনি বলেন, আমার হাত ধরে এলাকার অনেক উন্নয়ন হয়েছে। অবহেলিত মেঘনা উপজেলায় উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। এছাড়াও এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুতায়ন, যোগাযোগসহ সার্বিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. মোশাররফ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে আটকে রেখেছে। তাকে মুক্তি দেওয়াসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব না। নেত্রীকে মুক্তির পর অন্য দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কুমিল্লার সবগুলো আসনেই বিএনপির প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন।
জাতীয় পার্টি (এরশাদ) : সরকারের শরিক ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে এলাকায় গণসংযোগ ও প্রচারণা চালাচ্ছেন আগামী নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী জাতীয় ছাত্রসমাজের কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈয়দ মো. ইফতেখার আহসান হাসান। তিনি বলেন, এ আসনে জাতীয় পার্টির দুঃসময়ে আমি মাঠে কর্মীদের সংগঠিত করতে কাজ করেছি। আমি ছাত্রসমাজের সভাপতি হওয়ায় সারা দেশে সাংগঠনিকভাবে কাজ করছি। দলকে সুসংগঠিত করছি। আগামী নির্বাচনে দল থেকে জনগণ ও নেতাকর্মীরা আমাকে চায়। পল্লীবন্ধু এরশাদ ও সংসদের বিরোধী দলের নেত্রী রওশন এরশাদ আমাকে দলের মনোনয়ন দেবেন বলে আশা করি।