আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৫-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

রাজশাহীর পদ্মার চরে সৌরবিদ্যুৎই ভরসা

শিক্ষা, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকটও তীব্র

সোনা চৌধুরী, রাজশাহী
| দেশ

চর আষাঢ়িয়াদহ। ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার একটি ইউনিয়ন। পুরো ইউনিয়নের উত্তরে পদ্মা নদী। দক্ষিণে ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। দুর্গম চরের এ ইউনিয়নের বাসিন্দাদের চলতে হয় নানা দুর্যোগ আর দুর্ভোগ মোকাবিলা করে। প্রতি বছর নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় অনেকের ঘরবাড়ি। গোদাগাড়ীর বিদিরপুর থেকে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় এক ঘণ্টা লাগে চর আষাঢ়িয়াদহ পৌঁছাতে। ইউনিয়নের ভেতরেই রয়েছে বিশাল বিল। ফসলের মাঠ। কৃষিকাজ এখানকার বাসিন্দাদের প্রধান পেশা। গ্রামের মানুষ বেশ সহজ সরল। কিন্তু তাদের অন্তহীন সমস্যা। ইউনিয়নজুড়ে চলাচলের ভালো কোনো রাস্তা নেই। নেই স্বাস্থ্য সুবিধাও। একটু অসুখ-বিসুখে গ্রামের মানুষকে ৭ থেকে ৮ কিলোমিটারের পদ্মা নদী পার হয়ে এপারে আসতে হয়। চর আষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সূত্রে জানা গেছে, এখানে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। প্রধান গ্রামগুলো হলো, বোয়ালমারী, সাহেবনগর দিয়াড়মানিকচর, চর ভুবনপাড়া, আষাঢ়িয়াদহ, পানিপার, আষাঢ়িয়াদহ নতুন গ্রাম, কানাপাড়া, নওশেরা ও হনুমন্তনগর। ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১, ২, ৩ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে চলাচল উপযোগী কোনো রাস্তা নেই। সম্পূর্ণটাই কাঁচা রাস্তা। সেই রাস্তাগুলো একটু বৃষ্টি হলে হাঁটুসমান কাদা জমে। সাহেবনগর গ্রামে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি সীমান্ত আউট পোস্ট (বিওপি) রয়েছে। সেখানে পৌঁছাতে হলে ভাঙাচোরা, এবড়োখেবড়ো আর কর্দমাক্ত রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। বিজিবি সদস্যরা নদীর তীর থেকে সীমান্ত ফাঁড়িতে পৌঁছান মোটরসাইকেলে। ভাঙাচোরা, এবড়োখেবড়ো রাস্তায় মোটরসাইকেলেই তারা অভ্যস্ত। আর একটি যানবাহন চলে ওই রাস্তায়। তা হচ্ছে ট্রলি। ট্রলি করে সীমান্ত ফাঁড়ি কিংবা ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছানো যায়। এলাকাবাসী জানান, নদীর তীর থেকে সাহেবনগর সীমান্তে যেতে একটি মাত্র বাহন এই ট্রলি। এছাড়া ভাড়ায় মোটরসাইকেলও পাওয়া যায়। বর্ষাকালজুড়ে এ অবস্থায় থাকে রাস্তার। দীর্ঘ সময় রাস্তা মেরামতও হয় না। তবে বিলের ওপর এক কিলোমিটার রাস্তা পুরো সিমেন্ট ঢালাই রয়েছে। সেই রাস্তা ভাঙে না। ইউপি চেয়ারম্যান মো. সানাউল্লাহ জানান, রাস্তাগুলো মেরামতের জন্য বরাদ্দ মেলে না। তাই দুর্ভোগ নিয়ে চলাচল করতে হয় ইউনিয়নবাসীকে। ইউনিয়নের বাসিন্দাদের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিও খুব কঠিন। চরে চিকিৎসা হয় না বললেই চলে। চিকিৎসাসেবা পেতে সেখানকার মানুষকে যেতে হয় পদ্মী নদী পার হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ইউনিয়নে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও থাকেন না কোনো ভালো চিকিৎসক। বসেন একজন প্যারামেডিক চিকিৎসক। তিনি চিকিৎসা দিলেও মেলে না প্রয়োজনীয় ওষুধ। সরকারিভাবে চাহিদার তুলনায় খুবই যৎসামান্য ওষুধ দেওয়া হয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে। তাই ওষুধ কিনতে ঠিকই তাদের পার হতে হয় পদ্মা নদী। সরেজমিন গেলে চরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নারীদের গর্ভকালীন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বলতে কিছুই নেই। গর্ভধারণকালীন সময় তারা কোনো চিকিৎসা সেবাই পান না। তখন জীবন হাতে নিয়েই তাদের সময় পার করতে হয়। অনেকের জীবনাবসানও ঘটে। প্রসবকালীন সময় তাদের জীবন হাতে পৌঁছাতে হয় শহরের হাসপাতালে। চর ভুবনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার আলী বলেন, পরিস্থিতি এত ভয়াবহ যে, কেউ অ্যাকসিডেন্ট করলে কিংবা একটু পড়ে গিয়ে হাঁটু ভেঙে গেলে চরে চিকিৎসা পাওয়ার উপায় নেই। রাত ১টা হোক, ২টা হোক, পদ্মা নদীতে তুফান চলছে, তারপরও রাজশাহী ছাড়া কোনো উপায় নেই। নওশেরা গ্রামের বাসিন্দা ইয়াসিন আলী বলেন, এখানে মাত্র একজন ডাক্তার আসেন। তা-ও সপ্তাহে মাত্র দুই দিন। আর যারা ভিজিটর হিসেবে আসেন, তারা সকাল ১০টার সময় এসে দুপুর ২টার দিকে চলে যান। ওষুধও পাওয়া যায় না। একদিন ওষুধ দিয়ে বলে আর কোনো ওষুধ নেই। আগে গরুর গাড়ি ভর্তি করে ওষুধ আনা হতো, এখন কোনো ওষুধই আসে না। যেটুকু ওষুধ আসে তা-ও ডাক্তাররা বিক্রি করে খায়। ইউনিয়নে বিদ্যালয়ের সংখ্যাও অপ্রতুল। যে ক’টা বিদ্যালয় আছে সেখানে শিক্ষক সংকটও প্রকট। ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়নের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে মোট ৯টি আর উচ্চবিদ্যালয় আছে দুইটি। কোনো কলেজ নেই। চরে বিদ্যুতেরও ব্যবস্থা হয়নি। সৌরবিদ্যুৎই চরের মানুষের ভরসা। চর আষাঢ়িয়াদহ কানাপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার। জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল ২১৯ জন। আর এসএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করেছে ১২০ জন। 
অথচ এদের পাঠদানের জন্য শিক্ষক মাত্র ৯ জন। অস্থায়ীভাবে শিক্ষক আছেন দুইজন। পদ শূন্য রয়েছে মাত্র দুইজন শিক্ষকের। অর্থাৎ অনুপাতে ১০০ শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একজন শিক্ষক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রকট সমস্যা থাকলেও চরাঞ্চলে বেশ ভালো ফসল ফলে। ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি, পাটসহ প্রায় সবধরনের ফসলই উৎপাদন হয়। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন তারা। অনেক সময় অতিরিক্ত খরচ করেই নদীর ওপারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন উৎপন্ন ফসল। এভাবেই নানা প্রতিকূলতা পার করে জীবন চলে চরের সংগ্রামী মানুষের।