আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

কোনো আকিফার যেন আর এমন মৃত্যু না হয়

বিশ্বজিত রায়
| সম্পাদকীয়

চালকশত্রুর বেহিসেবি গাড়ি চালনায় নিহত শিশুসন্তান আকিফার ছোট্ট দেহের ব্যথা অসহনীয় বাস্তবতা এবং তার জন্মধাত্রী-দাতার সন্তানহারা পাহাড়সম কষ্টের মাত্রাতিরিক্ত ভার ভাবনা নিজের অস্তিত্বে হানা দিলে আমি কিছু সময়ের জন্য আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি। দুর্ঘটনায় আকিফা নিহতের খবরে আমি যতটুকু না আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছি, তার চেয়ে শতগুণ বেশি আঘাতে জর্জরিত হারুন-রিনা দম্পতির মানসিক অবস্থা কী হতে পারে, তা ভেবে। সন্তানশূন্য কষ্টে কাতর মা রিনা খাতুনের জিজ্ঞাসাÑ ‘আমার সোনামণিরে তোমরা বাঁচতে দিলে না। আমার মা আর বাবা বলে ডাকবে না। পুতুল খেলবে না। ওকে ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচব।’ দুনিয়ার ‘দুর্বিষহ বোঝা’ সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে আকিফার মা-বাবা অ্যাম্বুলেন্সে কুষ্টিয়ার পথে রওনা দেওয়ার আগ মুহূর্তে স্ত্রী রিনার আহাজারিতে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি ব্যথাক্রান্ত হারুন, গুমরে কেঁদে ওঠেন তিনি। বলতে থাকেনÑ ‘আমি বিচার চাই।’ এ সময় তিনি ঘটনার ভিডিও ফুটেজটি সড়কমন্ত্রীকে দেখারও অনুরোধ জানান।

আট মাসের শিশুকন্যা আকিফার মর্মন্তুদ মৃত্যুর খবরে কলিজা মোচড় দিয়ে ওঠে। কষ্টের পাথরপিষ্ট যন্ত্রণায় দুমড়েমুচড়ে যায় অন্তরস্থল। বেদনাব্যথিত মনে অদৃশ্য শূন্যতা কাজ করছিল সর্বদা। তখন শোক ধিকৃত ছায়ায় ঢাকা পড়ে বিমূঢ় দেহখানি। হারিয়ে যায় বাকশক্তি। নির্বাক নিঃস্ব নিস্তব্ধ হৃদয়ে মাথা নিচু করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করি। তারপরও অশান্তির অযাচিত খেলায় পরাস্ত হতে হয়েছে বারবার। সতত দৃষ্টিসীমায় চলে আসছিল দুর্ঘটনাকবলিত আট মাসের শিশুকন্যা আকিফার নিশ্চল চেহারাটুকু। সেই আকিফার বয়সি আমার কন্যা কুহেলিকার দুরন্ত অবয়ব আমায় ধৈর্যহীন করে তোলে। প্রাণপ্রিয় কন্যার একটু অসন্তুষ্টি কান্নার শব্দ যেখানে বক্ষবিদ্ধ শেলের কষ্ট সমতুল্য মনে হয়, সেখানে এমন সন্তানশূন্য যন্ত্রণাপীড়ন আমাকে আরও অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যায়। সংবরণ করতে পারিনি নিজেকে।
ব্যবসায়ী অফিস কম্পিউটার মনিটরে ভেসে ওঠা সংবাদপত্রের হৃদয়স্পর্শী আকিফার খবর আর সম্মুখস্থলে ব্যস্ত বাজারের মনুষ্য আনাগোনা আমাকে বিব্রতকর ব্যথামগ্ন বিমর্ষ পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। কুষ্টিয়ার চৌড়হাস মোড়ে অঘটনের শিকার আকিফা হত বেদনাভারি শূন্যতায় মুমূর্ষুপ্রায় হারুন-উর-রশীদ ও রিনা খাতুন দম্পতির কষ্টকান্না আমায় ব্যাপকভাবে তাড়িত করে। কারণ তাদের এ মেয়েবয়সি এক কন্যাসন্তানের জনক যে আমি। তাই হারুন-রিনা দম্পতির সন্তানহারা বাতাস ভারি চিৎকারী কান্নার করুণ আওয়াজ আমার কানে সজোরে বেজে ওঠে। অফিসের সামনে হেঁটে চলা মানুষের দৃষ্টিকে আড়াল করতে কম্পিউটার টেবিলে মাথা নুয়ে নিজের কষ্ট আর আবেগ সামলানোর অহেতুক প্রচেষ্টা ব্যর্থ অশ্রুফোঁটা অনবরত চরণতলে পড়তে থাকে। অবিশ্বাস্য এ আবেগ সামলে ওঠে নিজেকে স্বাভাবিক গ-িতে ফিরিয়ে আনতে খুব কষ্ট হয়।
সন্তান হত্যার বিচার চেয়েছেন হতভাগা এ বাবা। প্রিয় শিশুসন্তান আকিফা শূন্যতায় কাতর নিজেকে সাময়িক সামাল দিতে হয়তো তিনি এ বাক্য উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু বক্ষভর্তি আদর-সোহাগ-ভালোবাসার ফুটফুটে কোমল বেলুনটি যে ফুটো হয়ে গেছে, সেই নিস্তেজ চিরকষ্ট উন্মাদী মনকে সামলাবেন কী করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্বশীলরা কী বলে সান্ত¡না দেবেন প্রিয়জন হারা এ স্বজনদের। 
সন্তানহারা বেদনায় মূর্ছাগত হারুন-রিনা দম্পতিকে প্রবোধ দেওয়ার মতো হয়তো কেউ ছুটে যাবেন না কুষ্টিয়ার বাড়িতে। অন্য অজস্র মানুষের বুক খালি হওয়া অঘটন-পরবর্তী লোকদেখানো বিচারের আশ্বাসেই বিলীন হয়ে যাবে আকিফা হত্যার রেশ। কিছুদিন যাওয়ার পর কেউ মনে রাখবে না আকিফা নামের সুন্দর শিশুটিকে। কিন্তু হারুন-রিনা দম্পতির মনে থেকে যাবে চিরজীবনের দগদগে ক্ষত। যে অবিচারী ঘৃণ্য চালক ইচ্ছাবশত এত বড় একটি ক্ষতের জন্ম দিয়ে গেল, সেই চালক নামীয় দুর্ধর্ষ হত্যাকারীর বিচার করবে কে?
রাষ্ট্রযন্ত্রের আশকারায় চালক নামীয় দায়িত্বজ্ঞানহীন ধূর্ত মানুষগুলো একের পর এক অঘটন অপরাধ সংঘটিত করে আসছে। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় অনবরত সড়কে প্রাণ ঝরছে। শিশু আকিফা তেমনি এক খামখেয়ালিপনার বলি। শুধু শিশু আকিফাই নয়, আকিফার মতো অসংখ্য মানুষ প্রতিনিয়তই সড়ক দস্যুতার শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। আর গুণধর চালক সাহেবরা মানুষ নিধনের ইচ্ছেঘুড়ি প্রতিযোগিতায় গা ভাসাচ্ছেন। সেই প্রতিযোগী চালকের খেয়ালিপনায় প্রাণ হারানো আকিফা খবরে উত্তাল সংবাদমাধ্যম। হৃদয়বিদারক এ হত্যা কাহিনির ভিডিও ফুটেজেও উঠে এসেছে চালকের ইচ্ছাকৃত মৃত্যু মহড়ার খ-িত চিত্র। জাতীয় একটি দৈনিক সেই ভিডিও ফুটেজের নয়টি স্থিরচিত্র একত্রিত করে ‘এটি কি হত্যা নয়’ শিরোনামে নয় ভাগের ক্যাপশন বর্ণনেÑ ‘ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ১. রিনা খাতুন যখন রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে বাসটি তখন এপাশে দাঁড়ানো; ২. তিনি সন্তানকে নিয়ে রাস্তা পার হওয়া শুরু করেছেন, তখনও বাসটি সেখানে দাঁড়িয়ে; ৩. রিনা খাতুন এপাশে এসে বাসটির ডান পাশ দিয়ে হাঁটছেন, তখনও বাসটি দাঁড়িয়ে; ৪. তিনি বাসটির ডান কোনায় আসার সময়ও বাসটি দাঁড়িয়ে; ৫. তিনি যখন চালকের ঠিক সামনে, তখন হঠাৎ বাসটি চলতে শুরু করে; ৬. তিনি যখন বাসটি অতিক্রম করছেন, তখন গতি বাড়াতে থাকেন চালক; ৭. বাসটি রিনা খাতুনকে ধাক্কা দিচ্ছে; ৮. ধাক্কা লেগেই তার কোল থেকে ছিটকে পড়ছে আকিফা; ৯. কোলের সন্তান পড়ে যাওয়ার পরও রিনা খাতুনকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায় বাসটি’ তুলে ধরা হয়েছে চালক আগ্রাসনের ভয়াবহতা। এই মানুষ মারার বৈধতা কোথায় পেল অন্যায্য চালকগোষ্ঠী। তারা মানুষ মেরে ফেললেও তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে না, কথা বলা যাবে না। কিছু বললেই ধর্মঘট ডেকে অচল করে দেবে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা। নিজেদের পাইলট মনে করা এই মরণ দূতের এত শক্তি-সাহস কোথা থেকে আসে। এর গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। খোঁজে বের করতে হবে গণপরিবহনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা শক্তিধর মানুষটিকে।
সড়ক দুর্ঘটনায় বিক্ষুব্ধ ছাত্র আন্দোলনের রেশ এখনও কাটেনি। তারপরও একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণ বিসর্জন হচ্ছে। ২৯ জুলাই রাজধানীতে গাড়িচাপায় নিহত হয় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া ও করিম। এর প্রতিবাদে চালকের বিচার ও নৌপরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনে নামে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এ সময় চালকদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সহজে লাইসেন্স পাওয়ার বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। 
ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল গতি থামাতে ৬ আগস্ট ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ অনুমোদন দেয় মন্ত্রিপরিষদ। সেই আইনেও চালকদের শাস্তির ধরন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। দুর্ঘটনায় কোনটি মৃত্যু আর কোনটি হত্যা, তা নিয়ে আইনে ধোঁয়াশা আছে বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। শিশু আকিফা নিহতের ঘটনায় কোনটি মৃত্যু আর কোনটি হত্যা, এ নিয়ে অনুমোদিত সড়ক আইনকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সরাসরি সড়কমন্ত্রীর কাছে এ প্রশ্নের জবাব চেয়েছেন বাসচাপায় সন্তান হারানো আকিফার বাবা হারুন-উর-রশীদ। ‘বাসটিকে থামা অবস্থায় দেখতে পেয়েই তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বাসের সামনে দিয়ে পার হচ্ছিলেন। কিন্তু চালক না দেখেই চালিয়ে দিলেন। তার মানে চালক ইচ্ছাকৃতভাবে চাপা দিয়েছেন। 
যোগাযোগমন্ত্রী (সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী) বলুন এটি ইচ্ছাকৃত কি না?’ শুধু তা-ই নয়, এটা হত্যা কি না, তা নিশ্চিত হতে মর্মন্তুদ এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজটিও মন্ত্রীকে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
আজ আকিফা নেই। অঝোরে কাঁদছেন মা-বাবা, কাঁদছে আকিফার কুষ্টিয়ার চৌড়হাস বাড়ির বসতঘরটি, কাঁদছে সাদা-লালের প্রিয় পুতুলটি। যে আকিফা দুরন্ত হাসিতে মাতিয়ে রাখত পুরো পরিবার-বাড়ি, সেই বাড়িটিতে শোকের মাতম। শিশু আকিফার মৃত্যুতে পুরো দেশ সমব্যথি হলেও জাগাতে পারেনি কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিবিদ কাউকে। হায়রে মানবতা, হায়রে বাংলাদেশ। সন্তানহারা শোকে কাতর পরিবারের পাশে নেই কেউ-ই; বরং অপরাধী চালকগোষ্ঠীকেই প্রশ্রয় দিয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তার জ্বলন্ত প্রমাণ পত্রিকান্তরে ভেসে উঠছে।
জাতীয় দৈনিকের একটি খবরে বলা হয়, সবাই বলছেন, এটি স্রেফ হত্যাকা-। আকিফার বাবাও বলছেন, বেপরোয়া চালক তার মেয়েকে হত্যা করেছে। ব্যতিক্রম শুধু কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশ। তারা হারুন-উর-রশীদের ৩০২ ধারায় (হত্যার অভিযোগ) করা মামলা নিতে রাজি নয়। তারা মামলা নিয়েছে ৩০৪ ধারায়। বৃহস্পতিবার রাতে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা করেন হারুন-উর-রশীদ। তিনি ৩০২ ধারায় মামলা করতে চাইলেও পুলিশ তা নেয়নি। ওই ধারায় বলা হয়েছেÑ ‘যে ব্যক্তি খুন করে, সে মৃত্যুদ-ে বা যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত হবে এবং তদুপরি অর্থদ-েও দ-িত হবে।’ পুলিশ এ ধারায় মামলা নিতে রাজি না হওয়ায় হারুন-উর-রশীদ পরে ৩০৪ ধারায় মামলা করেন। এ ধারায় খুন নয়, এমন শাস্তিযোগ্য নরহত্যার সাজার কথা বলা হয়েছে। ধারাটিতে বলা হয়েছেÑ ‘যে ব্যক্তি খুন নহে এইরূপ শাস্তিযোগ্য নরহত্যা করে, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদ-ে বা ১০ বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদ-ে দ-িত হবে এবং তদুপরি অর্থদ-েও দ-িত হতে পারে।’
তার মানে উদ্দেশ্য একটাইÑ সড়ক হত্যাকা-ে চিহ্নিত অপরাধী চালককেই সুবিধা দেওয়া। এভাবেই এদের ছেড়ে দিয়ে সড়কে মানুষ হত্যার বৈধতা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে সাধারণ মানুষ অর্থাৎ প্রিয়জনহারা স্বজন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। সড়কে বেপরোয়া এ চালক সমাজকে বশে আনার সামর্থ্য কি সরকারের নেই? এই নিষ্ঠুরতা থেকে পরিত্রাণ চায় মানুষ। যেভাবে হোক, যে করে হোক উচ্ছৃঙ্খল বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন অপরাধী চালককে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি নিয়ে এসে সড়ক দুর্ঘটনার মতো ভয়াবহ অপকর্ম থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে হবে। স্বজনহারা মানুষকে দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তি দিতে হবে। সবশেষে বলব, প্রিয় আকিফা, করিও না মোদের মার্জনা। হ

ষ বিশ্বজিত রায়
কলামিস্ট
জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ
[email protected]