আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

শানে মুস্তফা (সা.)

আফতাব চৌধুরী
| নবী জীবন

ইসলাম ধর্মের প্রচারক হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সারা বিশ্বের কাছে তিনি মহানবী নামেই পরিচিত। চান্দ্রমাস রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ মক্কা নগরীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জীবিতকালে মহান সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত ইসলামের বাণী যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন মুহাম্মদ (সা.)। যিনি অন্যান্য সব নবীর চেয়ে উত্তম এবং যাঁর বৈশিষ্ট্য হলো তিনি অদৃশ্য বিষয়াদির সংবাদবাহক। 
অন্যান্য নবীর সঙ্গে সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) এর তফাতটা হচ্ছে, অন্যরা মহান স্রষ্টার বাণী শুনে সাক্ষ্য দিয়েছেন। অথচ শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিশেষ এক রাতে (মিরাজ) অদৃশ্য জগতের সবকিছু স্বচক্ষে দেখে এসেছেন। মহানবীর জীবন-দর্শন তথা গুণাবলি কোনো নিবন্ধে শেষ করা সম্ভব নয়। তিনি ব্যাপক গুণের অধিকারী। তাই পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে নবী, নিশ্চয় আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী, সুসংবাদদাতা, ভয় প্রদর্শনকারী, আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁর দিকে আহ্বানকারী এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।’ সমগ্র মানবজাতির জন্য পয়গম্বর হজরত মুহাম্মদ (সা.) কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ এই আয়াতের ঘোষণা তার প্রমাণ।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) পুরো জাতির জন্য শ্রেষ্ঠতম পথিকৃৎ, বিশ্বসভায় যাঁর অবদান সর্বাধিক, যাঁর উপমা নেই, যাঁর তুলনা তিনি নিজেই। জীবনের সব ক্ষেত্রে তিনি মানুষের  সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথদ্রষ্টা। আশ্রয়প্রার্থীর জন্য বিশ্বস্ততম ভরসাস্থল। তিনিই রাহমাতুল্লিল আলামিন (সা.), যাঁর জন্য রাব্বুল আলামিনের সুশোভিত আয়োজন আঠারো হাজার মখলুখাত, যাঁর প্রতি দরুদ পাঠান স্বয়ং আল্লাহ ও মাসুম ফেরেশতারা, আরশে আজিমে যাঁর নাম ছিল মুহাম্মাদুর রাসুল্লাহ (সা.), যাঁর অসিলা নিয়ে তওবা করেন আদম সফিউল্লাহ, যাঁর সুবাদে মুক্তি পান নুহ নবিউল্লাহ, যাঁর আগমনের আগাম সংবাদ দেন ঈসা রুহল্লাহ, যাঁর আগমনের জন্য দোয়া করেন ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ, যাঁর বদৌলতে নাজাত পান ইসমাইল জবিহুল্লাহ, যাঁর মাধ্যমে নবুয়তের সূচনা ও পরিসমাপ্তি ঘটেছে, যাঁর আগমনে পূর্ববর্তী কিতাবগুলো মনসুখ বা রহিত হয় এবং দ্বীনে ইসলাম পূর্ণতা লাভ করে, যাঁর ওপর নাজিল হয় শ্রেষ্ঠতম আসমানি কিতাব আল কোরআন, যাঁর সন্তুষ্টির জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে ফিরিয়ে বায়তুল্লাহকে দুনিয়াবাসীর কেবলা নির্ধারণ করা হয়, যাঁর আঙুলের ইশারায় চাঁদ দ্বিখ-িত হয়েছে, অস্তগামী সূর্য ফিরে দাঁড়িয়েছে, আদেশ পেয়ে মেঘ এসে বৃষ্টি বর্ষণ করেছে, দুটি গাছ কদম মোবারকে এসে হাজির হয়েছে, রাস্তায় বের হলে গাছ-পাথর সালাম জানিয়েছে, কঙ্করগুলো হাতের তালুতে বসে তসবিহ জপেছে, কণা কণা পাথরের টুকরো সামনে পেয়ে কলেমা তৈয়্যেবা পড়েছে, ওহুদ নামক পর্বত ভালোবাসা জানিয়েছে, বিচ্ছেদের বেদনায় মরা খেজুর গাছ প্রাণীর মতো কেঁদেছে, প্রয়োজনে আঙুল মোবারকের ফাঁক থেকে পানির ঝরনা হয়ে গেছে। যে নবীর বরকতে গোটা পৃথিবীর জমি সেজদার উপযোগী হয়েছে, এখনও দিনরাত হাজার হাজার ফেরেশতা যাঁর রওজা শরিফ পর্যবেক্ষণ করেন। কেয়ামতের দিন যাঁকে দান করা হবে সর্বোচ্চ প্রশংসিত স্থান মাকামে মাহমুদ, যাঁর হাত মোবারকে থাকবে প্রশংসার পতাকা লিওয়ায়ে হামদ, যাঁর দায়িত্ব থাকবে হাউজে কাওসারের সার্বিক অধিকার। যাঁর সম্মান ও মর্যাদার শেষ নেই। 
কোরআন শরিফে পবিত্র মুহাম্মদ নাম মাত্র চারবার পেশ করা হয়েছে। চার অক্ষর বিশিষ্ট এ মোবারক নামটি চারবার উল্লেখ করার প্রেক্ষাপট নিয়ে রহস্যময় আলোচনা রয়েছে। সব মানুষের নাম রাখা হয় জন্মের কিছু দিনের মধ্যেই। অথচ নবীজির মুধুমাখা মুহাম্মদ নামের সূচনা হলো সেই সময়, যখন সৃষ্টিজগৎ বলতে কিছুই ছিল না। একবার সাহাবায় কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ। আপনি কবে থেকে নবী হিসেবে ভূষিত হয়েছেন। জবাবে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, অর্থাৎ আমি তখন থেকে নবী, যখন আদম মাটি ও পানির মধ্যখানে ছিলেন। 
ওই হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি বলেন, আল্লাহ তায়ালা সেই আদিকাল তথা আদম সৃষ্টির অনেক আগে তাঁকে নবীরূপে মনোনীত করে সৃষ্টিকুলের চিরসুন্দর গুণ মুহাম্মদ নামে আখ্যায়িত করেন। অবশেষে আল্লাহ মাটিতে পানি মিশ্রিত করে আদমের প্রতিকৃতি তৈরি করেন এবং রুহ ফুঁকে দেন। এরপর মাথা তুলে আরশে আজিমে মুহাম্মদ নামের কলেমা তৈয়্যেবা আদম (আ.) এর প্রথম দৃষ্টিগোচর হয়। ফলে, তিনি বেহেশত থেকে অবতরণ করার পর নিজের অপরাধের জন্য দারুণভাবে অনুতপ্ত হন। ৩০০ বছরের মতো সময় কেঁদে কেঁদে অতিবাহিত করেন। আল্লাহর কী মেহেরবানি। এমন সময় তার হৃদয়ে সেই মুহাম্মদ নামাঙ্কিত কলেমায়ে তৈয়্যেবার কথা ভেসে ওঠে। এরপর সেই কলেমার অসিলা ধরে দোয়া করেন এবং ক্ষমাপ্রাপ্ত হন। এ প্রসঙ্গে কোরআন পাকের আয়াতÑ ‘ফাতালাক্কা আদামু মির রাব্বিহি কালিমাতিন ফাতা বা আলাইহি ইন্নাহু হুওয়াত তাওয়াবুর রহিম।’ অর্থাৎ ‘অতঃপর আদম (আ.) কিছু কলেমার কথা মনে করলেন, তখন আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নিলেন, তিনি তো তওবা কবুলকারী মেহেরবান।’ 
উপরিউক্ত কলেমা কোনটি? এ নিয়ে ওলামায় কেরামদের একাধিক অভিমত থাকলেও তাফসিরে রুহুল বয়ানে ওই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সেই কলেমা হলোÑ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’ হুজুর আলাইহিস সালামের পবিত্র মুহাম্মদ নাম অগণিত গাছ ও পাথরে কুদরিত কলমে লিখিত ছিল। হজরত সুলাইমান বিন দাউদ (আ.) একটি কুরদতি আংটি পেয়েছিলেন। এটি আসমান থেকে তার প্রতি নিক্ষিপ্ত হয়। তিনি এর মাধ্যমে রাজ্য পরিচালনা করেন। হাদিস শরিফে এসেছে, এই আংটির নকশায় লিখিত ছিলÑ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’
হজরত মুসা (আ.) এর সময়ে এই কলেমায়ে তৈয়্যেবার সন্ধান পাওয়া গেছে বিখ্যাত শাম দেশের প্রাচীনতম শহরের ইন্তাকিয়া গ্রামে। ওই গ্রামের সাতপুরুষ আগের কয়েকজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি একটি ফলকে যে সাতটি উপদেশ বাক্য লিখে রাখেন, তাতে সপ্তমটি ছিলÑ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।’ মুসা ও খিজির (আ.) শিক্ষামূলক এক সফরের সময় এ কলেমাটি হেফাজত করে রাখেন।