আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

মা-বাবার হক আদায়ে সচেষ্ট থাকুন

শায়খ ড. আলী বিন আবদুর রহমান হুজায়ফি
| নবী জীবন

সন্তানকে দুধ পান করানো আল্লাহর একটি অন্যতম নিদর্শন। বাবা সন্তান লালন-পালনের তত্ত্বাবধান করেন। সন্তানের জীবিকার ব্যবস্থা করেন। মা-বাবা সন্তান অসুস্থ হলে চিকিৎসা করেন। সন্তানের ঘুমের জন্য তারা রাত জাগেন। তার বিশ্রামের জন্য 
কষ্ট করেন

মানুষের যাবতীয় আমল বা কর্ম তার পক্ষে বা বিপক্ষে যাবে। আনুগত্য ও অবাধ্যতায় আল্লাহর কোনো লাভ-ক্ষতি হয় না। আল্লাহ বলেন, ‘যে সৎকর্ম করে সে তার কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কর্ম করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে, অতঃপর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছেই ফিরে যাবে।’ (সূরা জাসিয়া : ১৫)। বান্দা তার ওপর অর্পিত হক ও দায়িত্বগুলো পালন করলে তা দুনিয়া ও আখেরাতে তার জন্য প্রতিদান বয়ে আনে। শরিয়ত কর্তৃক অর্পিত হকগুলো আদায় ও দায়িত্ব পালনে ত্রুটি এবং অবহেলা করলে অথবা একেবারে তা ছেড়ে দিলে দুনিয়া এবং আখেরাতে এর শাস্তি ও খেসারত তাকেই পোহাতে হবে। তৌহিদ তথা আল্লাহর একত্ব মেনে নেওয়া আল্লাহর হক, যা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। শিরক করে আল্লাহর এ হক নষ্ট করলে জাহান্নাম অবধারিত। 
দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি মানুষের প্রাপ্য অধিকার ক্ষুণœ করে ফেলে এবং তাকে তা প্রদান না করে, তাহলে সে দুনিয়া ও আখেরাতের প্রতিদান থেকে নিজেকে বঞ্চিত করল এবং নিজেকে শাস্তির সম্মুখীন করে দিল। মানুষের জীবন তো তার সুখ-দুঃখ ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সব মিলে কেটেই যায়। যদিও মানুষের জীবন তার প্রাপ্ত অধিকার পাওয়ার ওপর নির্ভর করে না বা থেমে থাকে না; কিন্তু আল্লাহর কাছে সব প্রতিপক্ষ সমবেত হবে। তখন আল্লাহ মজলুমের হক নষ্টকারী জালেমের কাছ থেকে মজলুমের হক ফিরিয়ে দেবেন। কেয়ামতের ময়দানে সব হক আদায় করা হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন তোমরা অন্যদের প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে বাধ্য থাকবে, এমনকি শিংবিশিষ্ট বকরি থেকে শিংবিহীন বকরির অধিকারও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’ (মুসলিম)।
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের হকের পর মা-বাবার হক সবচেয়ে বড়। তাই কোরআনে মা-বাবার হকের কথা আল্লাহ তাঁর সঙ্গে মিলিয়ে বর্ণনা করেছেন। ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বল।’ (সূরা ইসরা : ২২-২৪)।
আল্লাহ মা-বাবার অধিকারকে উচ্চাসনে বসিয়েছেন। তিনি তাদের মাধ্যমেই তোমাকে অস্তিত্ব দান করে সৃষ্টি করেছেন। মা গর্ভকালীন ধাপগুলোয় চূড়ান্ত কষ্ট পেয়েছেন। প্রসবের সময় মৃত্যুর দোরগোড়ায় চলে গিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সঙ্গে এবং প্রসব করে কষ্টের সঙ্গে।’ (সূরা আহকাফ : ১৫)।
সন্তানকে দুধ পান করানো আল্লাহর একটি অন্যতম নিদর্শন। বাবা সন্তান লালন-পালনের তত্ত্বাবধান করেন। সন্তানের জীবিকার ব্যবস্থা করেন। মা-বাবা সন্তান অসুস্থ হলে চিকিৎসা করেন। সন্তানের ঘুমের জন্য তারা রাত জাগেন। তার বিশ্রামের জন্য কষ্ট করেন। নিজেদের পথ সংকীর্ণ করে সন্তানের পথ প্রশস্ত করেন। সন্তান যাতে সুখী হয়, সে জন্য সন্তানের ক্লেদ বহন করেন। তার পূর্ণতা লাভ ও সঠিকভাবে গঠনের লক্ষ্যে তাকে শিক্ষাদান করেন। তারা চান সন্তান তাদের চেয়ে সুন্দর হোক। তাই বারবার মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ ও তাদের অবাধ্যতার ক্ষেত্রে বারবার কঠোর হুমকি দেখে সন্তানের বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। সন্তান যত চেষ্টা-সাধনাই করুক, কখনোই জন্মদাতার প্রতি সদাচরণের চূড়ায় পৌঁছতে পারবে না, তবে একটি ক্ষেত্র ছাড়া। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘সন্তান কিছুতেই তার জন্মদাতার প্রতিদান দিতে পারবে না; কিন্তু বাবাকে দাস অবস্থায় পেয়ে তাকে ক্রয় করে যদি স্বাধীন করে দেয় তবে পারবে।’
মা-বাবা জান্নাতের দুটি দ্বার। যে তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে, সে তাতে প্রবেশ করবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তার নাক মলিন হোক, তার নাক মলিন হোক, তার নাক মলিন হোক।’ বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, কে সে? তিনি বললেন, ‘যে মা-বাবা উভয়কে অথবা একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় পেয়েও জান্নাতে যেতে পারল না।’ (মুসলিম)। মা-বাবা তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হলে তোমার প্রতিপালকও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি জনকের সন্তুষ্টির মাঝে এবং আল্লাহর ক্রোধ জনকের ক্রোধের মাঝে।’ (তিরমিজি)।
মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ হচ্ছে কোনো অন্যায় কাজ ছাড়া তাদের আনুগত্য করা, তাদের নির্দেশ ও উপদেশ বাস্তবায়ন করা, তাদের সঙ্গে কোমল ব্যবহার করা। তাদের আনন্দ দেওয়া। তাদের পেছনে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করা। তাদের প্রতি দয়া ও মমতা দেখানো। তাদের দুঃখে সমবেদনা জানানো। তাদের জন্য প্রশান্তি নিয়ে আসা। তাদের আত্মীয় ও প্রিয়জনদের সঙ্গে ভালো আচরণ করে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। তাদের জীবন থেকে সবধরনের কষ্টের দিকগুলো দূরা করা। তারা যা বর্জন করতে বলেন, তা থেকে বিরত থাকা। সারা জীবন তাদের ভালোবাসা। জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায় তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। এসবের বিপরীত করলেই তা হবে অবাধ্যতা। হাদিসে এসেছে, মা-বাবার অবাধ্যতা বেড়ে যাওয়া কেয়ামতের একটি আলামত।
মা-বাবার সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবাধ্যতা হলো তাদের সন্তানের তত্ত্বাবধান থেকে বের করে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া। এটা ইসলামের চরিত্র নয়। এটা কোনো মহৎ আচরণ হতে পারে না।
মা-বাবার প্রতি অন্যতম মারাত্মক অবাধ্যতা হলো তাদের বিরুদ্ধে উদ্ধত হওয়া। প্রহার, অপমান, বঞ্চনা বা গালাগাল করে তাদের প্রতি বৈরিতা করা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘৫০০ বছরের দূরত্বের পথ থেকে জান্নাতে ঘ্রাণ পাওয়া যায়। তথাপি মা-বাবার অবাধ্য ব্যক্তি তার ঘ্রাণও পাবে না।’ (তাবরানি)।
মা-বাবার হকগুলো আদায় করলে বিরাট প্রতিদান ও বরকত লাভের পাশাপাশি তা মহৎ চরিত্র ও উত্তম আচরণ বলে বিবেচিত হয়। যার অন্তর পবিত্র, শেকড় সুস্থ, স্বভাব নির্মল, কর্ম সুন্দর, সেই এ বৈশিষ্ট্য লালন করতে পারে। ভালোর প্রতিদান ভালোই হয়। সৎকর্মের বিপরীতে বিশ্বস্ত ও দায়িত্বশীল হওয়াই কর্তব্য। ভালোর দ্বারাই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে হয়। হীন চরিত্রের মনুষ্যত্বহীন নিকৃষ্ট স্বভাবের লোকই ভালোর বিপরীতে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকে। আল্লাহ দুর্ভাগা ক্ষতিগ্রস্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন, ‘আর এমন লোক আছে, যে তার মা-বাবাকে বলে, আফসোস তোমাদের জন্য! তোমরা কি আমাকে এ ভয় দেখাতে চাও যে, আমি পুনরুত্থিত হব যদিও আমার আগে বহু পুরুষ গত হয়েছে? তখন তার মা-বাবা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলে, দুর্ভোগ তোমার জন্য! তুমি বিশ্বাস স্থাপন করো, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য।’
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) এর কাছে একজন লোক এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, মানুষের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি আমার সুন্দর সান্নিধ্য পাওয়ার অধিকার রাখে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা, তারপর তোমার মা, তারপর তোমার মা। তারপর তোমার বাবা। তারপর তোমার যে বেশি কাছের। তারপর যে বেশি আপন।’ (বোখারি ও মুসলিম)।

২০ জিলহজ ১৪৩৯ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ