আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

অ্যাপস নয়, চুক্তিতে আগ্রহ চালকদের; অভিযোগে মেলে না প্রতিকার; ঘটছে প্রাণহানিও

‘রাইড শেয়ারিং’ বাইকে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

সাজ্জাদ মাহমুদ খান
| প্রথম পাতা

 

মঙ্গলবার বিকাল ৪টা। রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে ছয়-সাতজন মোটরসাইকেলচালক দাঁড়িয়ে আছেন। চালকরা লোকাল গাড়ির হেলপারের মতো যাত্রীদের ডাকাডাকি করছেন। ঢাকা মেট্রো হ-৫৫-১০২৬ গাড়ির চালক এক যাত্রীর কাছে ফার্মগেট যেতে ১০০ টাকা ভাড়া চাইলেন। যাত্রী রাজি না হওয়ায় পাশের ঢাকা মেট্রো হ-৩২-২২৯৬ মোটরসাইকেলের চালক ৮০ টাকায় যেতে রাজি হলেন। এভাবেই ‘রাইড শেয়ারিং’ মোটরসাইকেল চালকরা বেশি লাভের আশায় অ্যাপস ব্যবহার না করে চুক্তিভিত্তিক যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে যাত্রী ও চালক দুই পক্ষের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। এছাড়া বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, নারীদের সঙ্গে অশ্লীল আচরণ, ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করা এবং যাত্রীদের সঙ্গে খারাপ আচরণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে অ্যাপসভিত্তিক মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ নিয়ে সেবা প্রদানকারী সংস্থাটির কল সেন্টারে ফোন করলেও তেমন লাভ হয় না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

নিয়মিত রাইড শেয়ারিং বাইক ব্যবহার করা রাজধানীর ফার্মগেটের জামাল হোসেন জানান, অফিস টাইম তথা সকালের দিকে অনেক চালক রাস্তার মোড়ে মোড়ে মোটরসাইকেল নিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারা অ্যাপসে যেতে চান না। ওই সময় তারা চুক্তিতে যাত্রী বহন করেন। যাত্রীরা কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে চুক্তিতে যান। আবার রাত হলেও চালকরা অ্যাপসে না গিয়ে চুক্তিতে যেতে বাধ্য করেন। এতে যাত্রী ও চালক দুইজনই ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ চালক কৌশলে যাত্রীর সবকিছু লুটে নিতে পারে। আবার ছিনতাইকারীরাও কৌশলে চালকের মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিতে পারে। ফলে উভয় পক্ষেই ঝুঁকি বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাঠাও, সহজ.কম, চলো, বাহন, আমার বাইক, শেয়ার মোটরসাইকেল, বিডি বাইক ও ইজিয়ারসহ অ্যাপসভিত্তিক বাইকে রাইড শেয়ারিং চালুর পর সিএনজি অটোরিকশা চালকদের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছিলেন বলে যাত্রীরা ধারণা করেছিলেন। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে বাইকারদের খারাপ ব্যবহার, নারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও শ্লীলতাহানি, অ্যাপে না গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে যাওয়ার অফার, যাত্রা শুরুর আগেই অ্যাপ রাইড চালু করাসহ বিভিন্ন সমস্যা বাড়ছে। অধিক আয়ের লোভে কম সময়ে বেশি যাত্রী পাওয়ার আশায় আইন-কানুন ও দুর্ঘটনার পরোয়া না করে গাড়ি চালান চালকরা। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর ফলে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনায় চালক, আরোহী ও পথচারীর প্রাণহানি বাড়ছে। সর্বশেষ রোববার রাতে রাজধানীর মতিঝিলে একটি লরি ট্রাকের ধাক্কায় একই সঙ্গে ‘পাঠাও’চালক ও আরোহীসহ দুইজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া চলতি বছর জুলাইয়ে চট্টগ্রামে এক নারী চিকিৎসককে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে এক পাঠাওচালককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মারুফ হাসান বাপ্পী নামে এক ব্যক্তি জানান, তিনি বাসাবো থেকে শান্তিনগর যাবেন। অ্যাপসে রিকোয়েস্ট দেওয়ার পর দেখেন পাশেই একজন বাইকার দাঁড়িয়ে আছে। তিনি রিকোয়েস্ট বাতিল না করে তাকে বলেন, ভাই আপনি কি রাইড শেয়ার করেন? সে বলে হ্যাঁ। আর আমাকে দেখায় এটা কি আপনি রিকোয়েস্ট দিচ্ছেন? আমি বলি হ্যাঁ। সে বলে যাব কিন্তু আশি টাকা দিতে হবে। কিন্তু আমার অ্যাপসে দেখাচ্ছিল ৬০ টাকা। বাধ্য হয়ে তিনি ৮০ টাকায় যান।

নিয়মিত পাঠাও অ্যাপস ব্যবহার করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী জানান, কোনো রকম যোগ্যতার পরীক্ষা ছাড়াই পাঠাও অ্যাপসে রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ দেওয়া হয়। এসব রেজিস্ট্রেশনকারীর অনেকেই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জায়গাগুলো চেনেন না। এছাড়া অনেক বাইকার আছেন যারা সবেমাত্র মোটরসাইকেল চালানো শিখেছেন; কিন্তু এখনও দক্ষতা ও পরিপক্বতা আসেনি। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব চালকের ভিন্ন কোনো আয়ের উৎস না থাকায় মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন তারা ফুলটাইম পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এছাড়া যারা পার্টটাইম হিসেবে চালাচ্ছেন তাদের মধ্যে পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। এসব চালক কোনো ধরনের আইন-কানুন ও অ্যাপসের তোয়াক্কা না করে চুক্তিতে যাত্রী বহন করেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অদক্ষ লোককে রেজিস্ট্রেশন দেওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতি মাসেই নগরীর কোথাও না কোথাও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এতে চালকের পাশাপাশি আরোহীরাও মারা যাচ্ছেন।

চুক্তিতে না যাওয়ার ব্যাপারে একাধিক চালক জানান, অ্যাপের মাধ্যমে গেলে রাইড শেয়ারিং কোম্পানিকে ভাড়ার একটি অংশ দিয়ে দিতে হয়। কিন্তু অ্যাপস বন্ধ রেখে ওই ভাড়ায় যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলে পুরোটাই চালকের থাকে। তাই অনেকেই এখন অ্যাপস বন্ধ করে সিএনজি অটোরিকশার মতো মোড়ে মাড়ে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। ‘পাঠাও ইউজার অব বাংলাদেশ’ নামে একটি ফেইসবুক গ্রুপে মঙ্গলবার দুপুরে শরীফ আহমেদ নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, পাঠাওচালকরা গুলিস্তান ফ্লাইওভারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যেতে প্রত্যেক যাত্রীর কাছ থেকে ৬০ টাকা করে নিচ্ছেন। দুইজন রাইডারকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই অনলাইনে যাবেন? চালকরা বললেন, এখন অনলাইনে লাভ হবে না, অফলাইন এখন গরম ব্যবসা।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অ্যাপসে গেলে চালক ও গ্রাহক উভয়ের তথ্যই কর্তৃপক্ষের কাছে থাকে। কিন্তু চুক্তিতে চালকের চাহিদামতো গেলে চালক ও যাত্রী উভয়ই নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। আর অ্যাপ বন্ধ রেখে চুক্তিতে চলাচলের বিষয়টি সব রাইড শেয়ারিং কোম্পানিই কমবেশি টের পাচ্ছে। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য যাত্রীদের সতর্ক করা হচ্ছে। কোনো চালক চুক্তিতে যেতে চাইলে ওই গাড়ির নম্বর নিয়ে কল সেন্টারে অভিযোগ জানানো হলে তারা নিবন্ধন বাতিল করে দেবে।

কয়েকজন সেবা গ্রহীতা জানান, অধিক যাত্রী পরিবহনের আশায় চালকরা বেপরোয়া গতিতে গন্তব্যে পৌঁছতে চায়। যাতে যে কোনো সময়ে জীবন ও অঙ্গহানির মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেবা গ্রহণকালে দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত অনেক চালক ও আরোহী প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে রোববার মতিঝিলে একটি লরির চাপায় পাঠাওচালক রিপন শিকদার (৩০) ও আরোহী জানে আলম (৩১) মারা যান। চালক রিপন সিকদার খিলগাঁও হাজীপাড়ার বাসিন্দা। ২০ আগস্ট মোহাম্মদপুরে ট্রাকের ধাক্কায় সোহেল পারভেজ (৩২) নামে এক পাঠাওচালক নিহত হয়েছেন। ৪ জুলাই বিমানবন্দর গোলচত্বর এলাকায় বিআরটিসির দোতলা বাসের ধাক্কায় নাজমুল হাসান (৩২) নামের এক পাঠাও আরোহী নিহত হন। এ ঘটনায় পাঠাওচালক গুরুতর আহত হন। দুর্ঘটনাটির তদন্তকারী বিমানবন্দর থানার এসআই শরীফ হোসেন জানান, ঘটনাস্থলে নাজমুলকে বহনকারী মোটরসাইকেলের চালকের হেলমেট পাওয়া গেলেও লাশে পরিহিত বা আশপাশে আর কোনো হেলমেট খুঁজে পায়নি পুলিশ। ১৯ জুন ভোরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ফারুক হোসেন রিংকু (৩৩) নামে এক চালক নিহত হন। ৫ মার্চ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় কাজী মারুফ আহম্মেদ (২৪) নামে এক চালক নিহত হন। 

সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা অনিয়মের বাইরেও পাঠাওচালকদের বিরুদ্ধে নারীদের শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণচষ্টার অভিযোগ রয়েছে। ২৯ জুলাই চট্টগ্রামে এক শিক্ষানবিস নারী চিকিৎসককে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ওঠে এক পাঠাওচালকের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর মিজানুর রহমান নামে ওই চালককে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানা পুলিশ। রামপুরা এলাকার সামিয়া নামে এক নারী জানান, নারী আরোহীদের অনেক চালক পরবর্তী সময়ে ফোন করে বিরক্ত করেন। অকারণে বারবার ফোন করে কথা বলতে চাওয়া এবং গল্প করতে চাওয়ার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।