আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য

২৩ বছরে ঘাটতি সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা

এএইচ সেলিম উল্লাহ, কক্সবাজার
| শেষ পাতা

টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যের যাত্রা ২৩ বছরে পদার্পণ করছে বুধবার। সীমান্ত চোরাচালান রোধ, দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও ব্যবসা প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য চালু করা হয়। সীমান্ত বাণিজ্য চালুর পর থেকে আমদানি বাড়লেও রপ্তানি ক্রমেই কমছে। ফলে ২৩ বছরে আমদানি-রপ্তানিতে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। এ দীর্ঘ সময়ে টেকনাফ স্থলবন্দরটি ১ হাজার ১৮৫ কোটি ৭০ লাখ ৫৭ হাজার ৩২৫ টাকা রাজস্ব আয় করলেও সীমান্ত বাণিজ্যের সুফল ঘরে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। এমনটাই মনে করছেন বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা।  

টেকনাফ স্থলবন্দর শুল্ক স্টেশন সূত্রমতে, সীমান্ত বাণিজ্য চালুর পর ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে ৪ হাজার ৭২০ কোটি ৪৯ লাখ ১৩ হাজার ৭৪১ টাকার পণ্য আমদানি করা হলেও বাংলাদেশ থেকে মাত্র ২০৯ কোটি ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ২৮১ টাকার পণ্য রপ্তানি হয়। এতে ২৩ বছরে ৪ হাজার ৫১০ কোটি ৯২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৬০ টাকার বাণিজ্য ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। 

২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭১৭ কোটি ৭৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকার পণ্য আমদানি হয়। এর বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় ১৪ কোটি ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার ৮৪১ টাকার পণ্য। এতে এক বছরেই বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৭০৩ কোটি ৩৪ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৩৬৪ কোটি ৮ লাখ ৭৪ হাজার ১৭৭ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ৩০৭ কোটি ২০ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।
সর্বশেষ চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে ১১৭ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকার পণ্য আমদানি হলেও বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি পণ্য গেছে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৪১ হাজার টাকার। এ দুই মাসেই বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১৫ কোটি ৩৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
এ পরিসংখ্যান থেকে বলা যায় টেকনাফের সঙ্গে ব্যবসা করে লাভবান হচ্ছেন মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা। মিয়ানমার থেকে হিমায়িত মাছ, শুঁটকি, কাঠ, আদা, হলুদ, বরই, সুপারি, মুলি বাঁশ, বেত, স্যান্ডেল, ছাতা, আইএনসি, আচার, সেনেকা মাটি, চিংড়ি, গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি আমদানি হয়। এতে ওই দেশের ব্যবসায়ীরা আয় করছেন শত শত কোটি ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা সীমান্ত বাণিজ্য সুবিধা করতে পারছেন না। টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারে রপ্তানি হচ্ছে গেঞ্জি, থান কাপড়, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিক সামগ্রী, কোমল পানীয়, চানাচুর, বিস্কুট, সিমেন্ট, ওষুধ, প্রসাধনী সামগ্রী, নারীর মাথার চুল প্রভৃতি। মিয়ানমারে এসব পণ্যের চাহিদা থাকলেও বাজার ধরা যাচ্ছে না। ফলে বাড়ছে না আশানুরূপ বাণিজ্য। তাই সার্বিক বাণিজ্য লেনদেন বাংলাদেশের অনুকূলে নয়। এজন্য মিয়ানমারের অসহযোগিতা ও বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ২৩ বছর ধরে এভাবেই চলছে বিধায় বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগ না নিলে এ বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ কেবল বাড়তে থাকবে বলে মনে করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরাও। 
অন্যদিকে বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ কম দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা মিয়ানমার থেকে পণ্য আমদানি করেন। এটি না করা হলে প্রকৃত ঘাটতি বহুগুণ বেড়ে যেত বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক ব্যবসায়ী। তাদের মতে, মিয়ানমার থেকে বেশ কিছু পণ্য ‘আন্ডার ইন ভয়েস’ দেখিয়ে আনা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাংক ড্রাফট ব্যবহার না করে হুন্ডির মাধ্যমেও লেনদেন হয়ে আসছে। ফলে পণ্যের আমদানি মূল্য হেরফের হয়। তাই প্রকৃত বাণিজ্য ঘাটতি নিরূপণ করা বাস্তবিক অর্থেই কঠিন।
টেকনাফ সীমান্ত আমদানিকারক সমিতির সভাপতি ও টেকনাফ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র আবদুল্লাহ মনির বলেন, সীমান্ত বাণিজ্য চালু হওয়ার পর দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও বাণিজ্যে নানা সমস্যার কারণে অনেক ব্যবসায়ী এ বন্দর থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন। বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাড়িয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মিয়ানমারে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সৃষ্টি করে রপ্তানি বৃদ্ধি করা গেলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়ত। সেদিকেই সরকারের নজর দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। 
স্থানীয়দের মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্যের সরাসরি যোগাযোগ মাধ্যম হলো টেকনাফ স্থলবন্দর। নামে স্থলবন্দর হলেও আসলে বাণিজ্য হয় নৌপথে। নাফ নদীই দুই দেশের সীমান্ত চিহ্নিত করায় মালামাল এপার-ওপার নৌপথেই হয়ে আসছে। এ সুযোগে সীমান্তে বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি মাদক, চোরাচালান ও হুন্ডি ব্যবসার প্রসারও রয়েছে। সীমান্তরক্ষী বিজিবি ও বিসিজি প্রতি বছর সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে কোটি কোটি টাকার মাদক ও চোরাই পণ্য আটক করছে। এরপরও অবৈধ পাচার ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হয়। সীমান্ত বাণিজ্যের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এ সমস্যা কেবল বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। 
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য রয়েছে। তবে কালের বিবর্তনে এটি কমে এসেছিল। কিন্তু টেকনাফ স্থলবন্দর হওয়ার পর থেকে রাখাইন এস্টেটের (আরাকানের) সিটওয়ে কেন্দ্রিক বাণিজ্যের একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়। এরপর বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে গঠন করা হয় ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’। এ গ্রুপ বেশ কয়েকবার বৈঠকের পর গেল বছরের শেষ সময়ে রাখাইন এস্টেটে কাজ করার কথা থাকলেও রোহিঙ্গা সংকটের কারণে তা ভেস্তে যায়। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন আবশ্যক। যে পরিমাণ রাজস্ব আয় হয়েছে সেভাবে কোনো কিছুরই উন্নয়ন হয়নি। যার ফলে সম্প্রতি জেটিতে মশলা বোঝাই একটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। বর্তমানে রাখাইন এস্টেটে বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করছেন বিদেশি উদ্যোক্তারা। এর প্রভাব টেকনাফ স্থলবন্দরেও পড়তে পারে। তাই সমস্যা চিহ্নিত করে চলমান পণ্যসহ রপ্তানি বাণিজ্যে নিত্যনতুন পণ্য যুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। 
টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সীমান্ত বাণিজ্যের নানা সমস্যার কথা সংশ্লিষ্টদের বার বার অবগত করা হয়। আমলাতান্ত্রিকতার কারণে এটি দ্রুত আলোর মুখ দেখে না। এরপরও বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে দেশীয় পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা হয়। ফলে রপ্তানি অতীতের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্ত বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সরকার ও ব্যবসায়ীদের একীভূত প্রচেষ্টা দরকার।