আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি

আবুল হাসান ও বিনয় জোয়ার্দার, মাদারীপুর
| শেষ পাতা

সারা দেশের মতোই একাদশ সংসদ নির্বাচনের হাওয়া ক্রমেই বইছে মাদারীপুর-২ (রাজৈর-মাদারীপুর অংশ) আসনটিতে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এলাকার সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতেও থাকার চেষ্টা করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। প্রার্থীরা নানা অজুহাতে প্রত্যন্ত এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। মাদারীপুর-২ আওয়ামী লীগের অন্যতম ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২৯ হাজার ১০০। 

আওয়ামী লীগ এ আসনটিতে বরাবরই একক অবস্থান এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়। এ আসনটি রাজৈর উপজেলা ও মাদারীপুর সদর উপজেলার ১১ ইউনিয়ন সমন্বয়ে গঠিত। তবে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী শাজাহান খান এবং বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী মনোয়ন চাইবেন বলে জানা যায়। আওয়ামী লীগ এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হচ্ছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এ আসন থেকে তিনি একনাগাড়ে ছয়বার আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর সদরে বিজয়ী হন মরহুম মৌলভী আচমত আলী খান (আওয়ামী লীগ)। তার ছেলেই বর্তমান সংসদ সদস্য নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এ আসন থেকে তিনি পাঁচবার আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ও একবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। পরপর দুইবার মন্ত্রী হওয়ার কারণে তিনি নিয়মিতভাবে মাদারীপুরে আসেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ সব ধরনের অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। স্থানীয় নেতাকর্মীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে রয়েছে তার সুসম্পর্ক। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে মাদারীপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ জন্য এখন পর্যন্ত চলছে দুই গ্রুপের সমর্থকদের মধ্যে কখনও ভেতরে ভেতরে আবার কখনও প্রকাশ্যে মারামারি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দেন বর্তমান সংসদ সদস্য নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, যা খান গ্রুপ নামে পরিচিত। অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আ ফ ম  বাহাউদ্দিন নাছিম, যা নাছিম গ্রুপ নামে পরিচিত। দ্বন্দ্বের কারণে বেশিরভাগ দলীয় কর্মসূচি পৃথক পৃথকভাবে পালন করা হয়। ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক নেতা এলে তখন বা বিশেষ কোনো সময় এই দুই বড় নেতাকে এক মঞ্চে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শাজাহান খান মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তার সংসদীয় এলাকায় বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্নয়নে বেশ নজর দেন। প্রতিটি এলাকায় ব্রিজ-কালভার্ট, স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক উন্নয়ন করেন। নির্বাচনি এলাকার প্রতিটি অঞ্চলে তার সরব উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তিনি মরা কুমার নদ খনন করে সর্বমহলের প্রশংসা পেয়েছেন। শাজাহান খানের একক প্রচেষ্টায় হবিগঞ্জ সেতু, সেখপুর, শম্ভুক সেতু, শ্রীনদী-কবিরাজপুর সেতু, রাজৈর পৌর ভবন, রাজৈর থানা ভবন, মাদারীপুর কাজিরটেক আচমত আলী খান সেতু, মাদারীপুর শিল্পকলা ভবন, মাদারীপুরে আড়াইশ বেড হাসপাতাল, নার্সিং ইনস্টিটিউট, ইকোপার্কসহ অসংখ্য ব্রিজ কালভার্ট ও সংযোগ সেতু নির্মাণসহ নদীভাঙ্গন রোধে রক্ষাবাঁধের সংস্কার ও মাদারীপুর শহর রক্ষাবাঁধ থেকে সাবেক কাজীরটেক ফেরীঘাট পর্যন্ত জনগণের চলাচলের জন্য ওয়াকওয়ে নির্মাণ করেছেন। তাছাড়া শাজাহান খানের রয়েছে শ্রমিক সংঠনের অকুন্ঠ সমর্থন। এসব কারণে আওয়ামী লীগ তাকেই মনোনয়ন দেবে বলে তার কর্মী-সমর্থক ও এলাকাবাসী জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। নৌ পরিবহনমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য শাজাহান খান বলেন, নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দায়িত্ব। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়ার জন্য একটি বোর্ড রয়েছে। সেখান থেকেই প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি মনোনয়ন চাইব এবং আমার বিশ্বাস মাদারীপুর-২ আসনে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের তাদের নিজ নিজ এলাকায় অসমাপ্ত কাজের উন্নয়ন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আমি আমার নির্বাচনি এলাকায় যেসব উন্নয়ন করেছি তা এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তারপরও এখন অনেক উন্নয়ন করার মতো কাজ বাকি আছে। আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনার সরকার বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে এবং উন্নয়নের ধারা বজায় রাখবে। সে হিসেবে মাদারীপুরেও উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাবে বলে আমি আশা করছি। এছাড়াও মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লা, আওয়ামী লীগ নেতা ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি গোলাম মাওলা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানা যায়। তবে এ আসনে তাদের তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচারণা বা কার্যক্রম চোখে পড়েনি। তাই অনেকেই মনে করেন এ আসনে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ছাড়া আর কোনো বিকল্পপ্রার্থীর তেমন ভূমিকা নেই বললেই চলে।
এ আসনে কে হবেন বিএনপির প্রার্থী তা বোঝা যাচ্ছে না। সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে এক ধরনের জট তৈরি হয়েছে দলটির মাঝে। গ্রুপিংয়ের অভিযোগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । বিএনপির জেলা কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দুই ভাগে বিভক্ত জেলা বিএনপি ও অংগসংগঠনের নেতারা। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহান্দার আলী জাহান অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দেন জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান মুরাদ। এই গ্রুপিংয়ের প্রভাবে দুই গ্রুপ থেকেই তাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রার্থী রয়েছে পছন্দের তালিকায়। এ আসন থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীরা হচ্ছেন কেন্দ্রীয় বিএনপি নেত্রী ও সাবেক সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান, জেলা বিএনপির সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক আবু মুন্সী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহান্দার আলী জাহান, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক মিল্টন বৈদ্য, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান কাওছার হাওলাদার ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু ভূঁইয়ার ছেলে বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম তুষার ভূঁইয়া। তবে কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের নামই বেশি  শোনা যাচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে। তিনি বর্তমানে কেন্দ্রীয় বিএনপির মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দলের জন্য কাজ করছেন। ইডেন কলেজের ভিপি থাকাকালে রাজপথে আন্দোলনে সাহসী ভূমিকার কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুনজরে পড়েন। এরপর সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কেন্দ্রীয় নেত্রী হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির একজন প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে তার নেতৃত্বে হানা দেওয়া সম্ভব বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাছাড়া স্থানীয় বিএনপির নেতৃত্বে মতবিরোধ থাকলেও হেলেন জেরীন খান সম্পর্কে কোনো বিতর্কের কথা শোনা যায় না। সে কারণে দলের হাইকমান্ড হেলেন জেরিন খানের মনোনয়নের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে পারে। 
হেলেন জেরিন খান বলেন, আমি ৮৬ সালে ছাত্রজীবন থেকেই জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছি। এরপর ইডেন কলেজের ভিপি নির্বাচিত হই। ২০০১ সালে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই। এরপর চরমুগরিয়া কলেজসহ এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, মসজিদ, মন্দির, স্কুল কলেজের উন্নয়নে কাজ করি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং আমাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। দেশের জনগণ একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। জেলা বিএনপির সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক আবু মুন্সি বলেন, দল যদি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে আমি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী। আশা করি, দল আমাকে মনোনয়ন দেবে। 
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহান্দার আলী জাহান বলেন, ছাত্রজীবন থেকেই মাদারীপুরে প্রথমে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হই। সরকারি নাজিম উদ্দিন কলেজের ছাত্রছাত্রী সংসদের জিএস ও কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। এখন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে আছি। বিগত দিনে রাজনীতিতে যখন সংকটাপন্ন ছিল তখনও সাধারণ মানুষের পাশে থেকে সক্রিয়ভাবে বিএনপির রাজনীতি করেছি। ভবিষ্যতেও জনগণের পাশে থেকে রাজনীতি করে যেতে চাই। সে ক্ষেত্রে দল যদি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মিল্টন বৈদ্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ি। সে সুবাদে গেল উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে রাজৈর থেকে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। সেখানে রাজৈর উপজেলার সাধারণ মানুষ যেভাবে আমাকে ভোট দিয়েছে তা আপনারা দেখেছেন। মানুষের ভালোবাসার কারণে আবার আমি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে চাই। তবে নির্বাচনের সব কিছুই নির্ভর করছে দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর। কেন্দ্র থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে আমি তা মেনে নেব। তাছাড়া ১০ বছরে রাজৈরে ক্ষমতার ছোঁয়া লাগেনি। তাই উন্নয়নও হয়নি। মাদারীপুর বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিএনপির তরুণ নেতা মনিরুল ইসলাম তুষার ভূইয়া বলেন, দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। দল যদি মনোনয়ন দেয় তাহলে নির্বাচনে অংশ নেব। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান কাওসার হাওলাদার বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-২ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চাইব। 
এ আসন থেকে একক প্রার্থী হিসেবে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি জাকারিয়া অপুর নাম শোনা যাচ্ছে। এছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক মাওলানা লোকমান হোসেন জাফরী এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা যায়। এ আসনে জামায়াতের সংগঠন থাকলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার মতো কোনো নেতা তাদের নেই। মাদারীপুরে জাসদের জেলা কমিটি রয়েছে। তবে জাসদের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও জাসদের জেলা কমিটির সভাপতি শেখ বজলুর রশিদ ব্যতীত দলের আর কোনো ব্যক্তি নেই যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে।