আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

সংসদ নির্বাচন বনাম প্রত্যাশিত ইভিএম

মোজাম্মেল হক বর্ণালী
| সম্পাদকীয়

সময়ের বিবর্তনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে সমতালে পাল্লা দিতে বাংলাদেশকেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ওপর বিশেষ নজর রাখতে হবে। বর্তমানে সুজলাসুফলা, শস্যশ্যামলা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের পুরোপুরি আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার এ মহৎ কাজেরই ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমান তথা আগামী বিশ্ব আইসিটিবিহীন অকল্পনীয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ইভিএম কী? এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে জনগণের ধারণা এখনও সুস্পষ্ট নয়। কাজেই পুরো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে হলে প্রথমেই দরকার সাধারণ জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন করতে নির্বাচন কমিশনকে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করতে হলে এখনই সরকার তথা নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি ও কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রান্তিক পর্যায়ে উপজেলায় নির্বাচন কর্মকর্তার মাধ্যমে উঠান বৈঠক, গণসংযোগ, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, প্রচারপত্র বিলি, এমনকি প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়েও এর ব্যবহারের সুফল ও কুফল সম্পর্কে সাধারণ ভোটারদের সচেতন করে তুলতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম হলো ভোটদানের সহজতর মাধ্যম। এতে কাগজের ব্যালট ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের প্রয়োজন হয় না। এ ব্যবস্থায় ব্যালট কাগজে সিল মেরে ভোট প্রদানের পরিবর্তে ভোটাররা পছন্দের প্রতীকের পাশে সুইস টিপে তাদের নাগরিক অধিকার ভোট প্রদান করতে পারবেন। যে-কোনো নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন, তা-ও জানা যাবে চোখের পলকেই। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে সারা বিশ্বের সঙ্গে সমান তালে চলতে গেলে ইভিএমের কোনো বিকল্প নেই। ইভিএম ব্যবহার করার ফলে এ দেশের নাগরিক তথা রাষ্ট্র বহুবিদ সুবিধা পাবেনÑ ক. কোটি কোটি ব্যালট ছাপানোর জন্য কাগজের খরচ, তৎপ্রেক্ষিতে তা ছাপার খরচসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পরিবহন খরচ। এমনকি ভোটের দিন প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসংক্রান্ত পরিচালনা খরচ থেকেও রেহাই পাবে সরকার। খ. দ্রুত ও নির্ভুল ফলাফল প্রদান ও প্রদর্শন। গ. এতে ভোট বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ঘ. একই মেশিনকে পরবর্তী যে-কোনো স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে ব্যবহার এবং ঙ. কেন্দ্র দখল কিংবা ব্যালট পেপার ছিনতাইরোধ। উল্লেখিত সুবিধাগুলো পাবে রাষ্ট্র ও তার পাশাপাশি দেশের জনগণও। ভোট গ্রহণের দিন প্রত্যেক বুথের জন্য একটি করে ইভিএম ব্যবহার করতে হয়। ইভিএমের দুটি অংশ থাকেÑ ক. ব্যালট ইউনিট, খ. কন্ট্রোল ইউনিট। দুটি ইউনিটকে কেন্দ্র করে একটি ক্যাবল থাকে। ইভিএম মেশিনটি সম্পূর্ণ ব্যাটারিচালিত। এ মেশিনের ব্যালট ইউনিটটি থাকে বুথের ভেতরে। ব্যালট ইউনিটের ঠিক উপরের দিকে প্রার্থীর নাম ও প্রতীক ছাপানো থাকে এবং প্রতিটি প্রতীকের পাশে আছে একটি করে সুইস। পছন্দের প্রতীকের পাশের সুইসটা ক্লিক করলেই তার পাশে রাখা সবুজ বাতি তাৎক্ষণিকভাবে জ্বলে ওঠে ও ভোটাররা এবং ভোটকেন্দ্রের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একবার করে দীর্ঘ বীপ ধ্বনি শুনতে পাবেন। এই বাতি জ্বলা ও বীপ ধ্বনির আওয়াজ শুনে ভোটার বুঝতে পারবেন, তার ভোটটি সফলভাবে দেওয়া হয়েছে। যে-কোনো ধরনের লোকই খুব সহজেই ইভিএম দ্বারা ভোট প্রদান করতে পারবেন। ভোটার ভোট প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রটি নাগরিকের ভোট গ্রহণের তথ্য সঙ্গে সঙ্গে তার মেমোরিতে সংরক্ষণ করে। এ পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ বা তার মেমোরিতে সংরক্ষিত তথ্যটি ১০ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখা যায়। কন্ট্রোল ইউনিটটি থাকে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের সামনে রাখা টেবিলে। এ ইউনিটে ‘ব্যালট’ নামক একটি সুইস রয়েছে, যা চাপলে বুথের মধ্যে রাখা সংযুক্ত ব্যালট ইউনিটটি একটি ভোট গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হয়। ‘ব্যালট’ সুইস চেপে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ভোটারকে ভোট দিতে বুথে পাঠান। ভোটার ভোট প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে ব্যালট ইউনিটটি অকার্যকর হয়ে যায়। সেই অবস্থায় বারবার আরও ভোট দিলেও মেশিন তা গ্রহণ করে না। ভোটদান শেষে ভোটার বুথ থেকে বেরিয়ে গেলে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার কন্ট্রোল ইউনিটের ‘ব্যালট’ সুইসটি চেপে পরবর্তী ভোটারের জন্য ব্যালট ইউনিটটি কার্যকর করতে পারেন। কন্ট্রোল ইউনিটের ঠিক সামনের দিকে একটি বড় মনিটর সংযুক্ত রয়েছে, যা যে-কোনো ভোটারের চোখে পড়বে। ভোটার ঠিকমতো তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে মনিটরটির সংখ্যা এক বেড়ে যায়। ফলে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার বা পোলিং এজেন্টরা সহজে বুঝতে পারেন, ভোটারের ভোটটি মোট ভোটের সঙ্গে যোগ হলো অর্থাৎ ভোটটি গৃহীত হলো। ব্যালট ইউনিটে প্রার্থীর সংখ্যা প্রতিটি ব্যালট ইউনিটে ১২ জন প্রার্থীর জন্য বরাদ্দ থাকে। তবে কোনো আসনে প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হলে সর্বোচ্চ ৬০ জন প্রার্থীর জন্য পর্যন্ত ব্যবস্থা করা যায়। কাজেই বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন এত অল্প সময়ে সর্বসাধারণকে অবহিতকরণ করতে পারবে কি না, তা খতিয়ে দেখা নির্বাচন কমিশনের ব্যাপার। প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে ইভিএমের বিকল্প নেই। নির্ভেজাল, ত্রুটি ও শঙ্কামুক্ত নির্বাচন উপহার দিতে গেলে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ইভিএম ব্যবহারের বিকল্প নেই। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথায়Ñ ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসেÑ বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য চাই ইভিএম। কাজেই বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা না করে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ চলাচলের পথ সুগম করা হোক। 

মোজাম্মেল হক বর্ণালী
সংস্কৃতিকর্মী, কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ