আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

সড়ক দুর্ঘটনা : এ শোকের শেষ কোথায়?

আফতাব চৌধুরী
| সম্পাদকীয়

যেসব কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, এর মধ্যে প্রধান হলো অনিয়ন্ত্রিত গতি, বেপরোয়া চালনা, বিকল ব্রেক, চালকের অন্যমনস্কতা, গাড়ি চালনার সময় মোবাইলে কথা বলা, হাসিঠাট্টায় ব্যস্ত থেকে গাড়ি চালনা, মদ খেয়ে উন্মত্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং ঘুরানো এবং সর্বোপরি রাস্তায় গাড়ি চলাচলের নিয়ম না জানা। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যোগ্যতা বিচার না করেই অর্থ বা অন্য কারণে প্রভাবিত হয়ে লাইসেন্স দিয়ে দেয়

লক্ষ করলে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি, যার জন্য পথযাত্রী মানুষ, অন্যান্য প্রাণী কিংবা যানবাহনের কোনো নিরাপত্তা নেই। পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, বিগত দুই মাসে এ দেশের রাস্তায় বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং তার ফলে পুরুষ-নারী ও শিশুসহ অগণিত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অসংখ্য। এদের মধ্যে হয়তো অনেকেই বিকলাঙ্গ জীবনযাপন করছেন অথবা আগামীতে করবেন। দুর্ঘটনাগুলোর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চালকের অনিয়ন্ত্রিত চালনা, বেপরোয়া গতি অনেক মানুষকে জীবন বা অঙ্গহানির দিকে ঠেলে দিয়েছে। কখনও গাড়ি বা বাইক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়েছে অথবা খাদের নিচে তার স্থান হয়েছে। রাস্তার গাছ বা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ধাক্কা মেরে ছোট গাড়ি বা বাইক উল্টে যাওয়াও তো এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। দুই বাস বা ট্রাক বা ট্যাক্সির একে অপরকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে প্রবণতা বা উগ্র প্রতিযোগিতা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার ফলেই ঘটছে দুর্ঘটনা। আবার রাস্তার বাঁকে বাস, ট্রাক, সিএনজি, কার, মাইক্রোবাস বা বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষ তো অবিরাম ঘটছেই। এতে মরছে মানুষ, নষ্ট হচ্ছে সম্পদ, দেখা দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি।
অতি সম্প্রতি নাটোরের বরাইগ্রাম উপজেলায় পাবনা থেকে রাজশাহীগামী চ্যালেঞ্জার পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বনপাড়া থেকে ঈশ্বরদীগামী লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরও তিনজনসহ মোট ১৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২৫ জনের মতো। আহতদের মধ্যে কয়জনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। প্রত্যক্ষদর্শী পথচারীদের মতে, ঈদের ছুটিতে মহাসড়ক ফাঁকা পেয়ে বাসচালকদের দ্রুতগতিতে অথবা মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানোর ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কুমিল্লার শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস প্রাইভেট কারকে ওভারটেকিং করতে গিয়ে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়ক থেকে ছিটকে খাদে পড়ে দুমড়েমুচড়ে ঘটনাস্থলে বাসের দুই যাত্রী, কক্সবাজারের রামুতে যাত্রীবাহী হানিফ পরিবহনের বাসের ধাক্কায় এক সিএনজিযাত্রী, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় মসজিদের মুয়াজ্জিন, ফরিদপুরে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ জন, মাগুরা-ঝিনাইদহ সড়কের আসমাখালীতে একটি যাত্রীবাহী বাসের চাপায় এক যুবকসহ সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন দেড় শতাধিক।
দুর্ঘটনার জন্য আমরা অনেক সময় খারাপ রাস্তাকেই দায়ী করি; কিন্তু দেখা যায়, খারাপ রাস্তায় কখনও মারাত্মক দুর্ঘটনা তত বেশি ঘটে না, কারণ সামনের রাস্তা খারাপ জানলে নিতান্ত অপটু চালকও অত্যন্ত হুঁশিয়ার হয়ে গাড়ি চালান। রাস্তা যখন মসৃণ এবং সেখানে যখন গর্ত, খানাখন্দ থাকে না, তখনই চালকের পা শক্ত হয়ে অ্যাক্সিলেটরে চেপে বসে গাড়ির গতিকে অতিমাত্রায় বাড়িয়ে দেয়।
যেসব কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, এর মধ্যে প্রধান হলো অনিয়ন্ত্রিত গতি, বেপরোয়া চালনা, বিকল ব্রেক, চালকের অন্যমনস্কতা, গাড়ি চালনার সময় মোবাইলে কথা বলা, হাসিঠাট্টায় ব্যস্ত থেকে গাড়ি চালনা, মদ খেয়ে উন্মত্ত অবস্থায় স্টিয়ারিং ঘুরানো এবং সর্বোপরি রাস্তায় গাড়ি চলাচলের নিয়ম না জানা। ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যোগ্যতা বিচার না করেই অর্থ বা অন্য কারণে প্রভাবিত হয়ে লাইসেন্স দিয়ে দেয়। এভাবে প্রশাসনিক দুর্নীতিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেক সময় দেখা যায়, চালক যখন সতর্ক হয়ে ধীরগতিতে গাড়ি চালান, এর আরোহীরা তাকে ধমক দেন এবং গাড়ির গতি আরও বাড়ানোর জন্য তাকে উত্তেজিত করেন। যে চালক দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান, তিনি আরোহীদের বাহবা পান বেশি। আবার অনেক সময় চালক বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে অনেক যাত্রীই তাকে হুঁশিয়ার করে দেন; কিন্তু সে এসব কথার পাত্তা না দিয়েই বেপরোয়া গাড়ি চালাতে থাকে, ফলে ঘটে দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। আমাদের দেশের গণতন্ত্রের ধারক এবং বাহকেরাই সবচেয়ে বেশি ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘন করে থাকেন। আমাদের দেশে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কনভয় নিয়ে যখন শোভাযাত্রা করেন, সব নিয়ম ভেঙে রাজপথে চলেন, তখন সে রাস্তায় জনসাধারণের পথচলা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। গণতন্ত্রের নামে এই প্রহসনের ব্যাপারে কিন্তু কেউ মাথা ঘামান না। জনসমাগম সহজে ঘটানোর জন্য রাস্তার মোড়ে বা হাঁটবাজার কিংবা ব্যস্ত জনবহুল এলাকায়ও মিটিং-মিছিল করে যানবাহন চলাচলে ব্যাঘাত ঘটানো হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদেরও যানবাহন চলাচলে ট্রাফিক নিয়ম মোটেই মেনে চলতে দেখা যায় না।
রাস্তায় গাড়ি চলাচলের সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সেই নিয়মগুলোর রক্ষাকর্তারা, যেমন পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তারা এবং পুলিশ বিভাগ যদি তাদের কর্তব্যে অবহেলা না করে থাকে, তবে অধিকাংশ দুর্ঘটনাই হয়তো এড়ানো সম্ভব হতো। দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়ির মালিক ও চালকের সেই দুর্ঘটনার জন্য দোষ ও দায়িত্ব কতখানি, পথচারী মানুষের সাক্ষ্য নিয়ে তা বিচার করে কর্তৃপক্ষ কিন্তু রাস্তাতেই দোষীর উপযুক্ত শাস্তি বিধান করতে পারে। অপরাধী বাস-ট্যাক্সি, অটো কিংবা মোটরসাইকেল চালক যদি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়, তবে ধাবমান পুলিশভ্যান সঙ্গে সঙ্গে তার পেছনে ছুটে তাকে ধরে আনতে পারে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তিস্বরূপ অর্থ জরিমানা, জেল কিংবা চালকের লাইসেন্স বাতিল করা যেতে পারে। গাড়ির নম্বর, মালিক ও চালকের নাম উল্লেখ করে, খবরের কাগজে এবং সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এ শাস্তির কথা বিজ্ঞাপিত করতে হবে। কিন্তু যে দেশে প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্যকে রাস্তায় দেখা যায়, গাড়ি থামিয়ে জানালায় হাত ঢুকিয়ে নির্লজ্জভাবে চালকের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে অপরাধীকে ছেড়ে দিচ্ছে, সে দেশে এসব আশা করা যায় কি? 
গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় হলো, স্কুল কিংবা হাসপাতালের কাছে দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গায় গাড়ির গতি কমিয়ে আনবে। কিন্তু আমাদের দেশে জাতীয় মহাসড়কগুলো নাকি স্পিডব্রেকারের আইনের আওতার বাইরে। সেক্ষেত্রে রাস্তার উচ্চতাকে সামান্য কমানোর বদলে এসব জায়গায় অস্থায়ী ফলক-নির্দেশনামা বসিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করা যেতে পারে।
অনেক সময় রাস্তায় বিচরণকারী গরু-ছাগল-কুকুর ও বিড়ালও দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে চালকদের শাস্তি না দিয়ে ওইসব পশুর মালিকদের অর্থ জরিমানা করা উচিত। অনেক সময় আবার আমরা নিরাপত্তার সব আইন ভেঙে গ্রামের গরিব মানুষকে বাসের ছাদে বসে যাতায়াত করতে দেখি। এখানে দোষ যেমন সাধারণ মানুষের, তেমনি অপরাধ ড্রাইভার ও কন্ডাক্টরেরও। সরকার কি আইন পাস করে এই বিপজ্জনক অভ্যাস বন্ধ করতে পারে না? জনসংখ্যার অতি বৃদ্ধি যদি এমনি বিপদসংকুল ভ্রমণের কারণ হয়, তবে সরকারের উচিত, রাস্তায় আরও অধিকসংখ্যক নতুন বাস নামিয়ে আগে থেকেই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা রোধ করা।
দুর্ঘটনার দায়িত্ব সরকার কোনোমতেই এড়াতে পারে না। জনগণ এবং বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে সতর্ক থাকতে হবে, দেখতে হবে সরকার আইনের ফাঁকগুলো বন্ধ করে পথচারী মানুষ এবং যানবাহন চালকদের অক্ষরে অক্ষরে আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে পারছে কি না। সরকারকে দেখতে হবে সরষের মধ্যে যেন ভূত না থাকে। অত্যন্ত কঠোর হাতে বিআরটিএ কিংবা পুলিশ বিভাগে অবৈধ লেনদেন বন্ধ করতে হবে।
পাশ্চাত্য দেশে ‘ভগ্ন কাচ তত্ত্ব’ নামে একটি যুক্তি আছে, যার অর্থ হলো, যে গাড়ির কাচ ভাঙা সমাজবিরোধীরা সেই কাচ ভাঙা গাড়ির ওপরেই ক্রমাগত আঘাত হানে। আইনের শাসন নেই বলেই আমাদের দেশে এত বেশি পথদুর্ঘটনা হয়। আমাদের শাসনযন্ত্রের এমনি বিকলাঙ্গ অবস্থা যে অপরাধীরা জানে, তারা গুরুতর অপরাধ করলেও অর্থ কিংবা পেশিশক্তির কৌলিন্যে পার পেয়ে যাবে। তাদের কোনো সাজা হবে না। সরকারকে তাই প্রমাণ করতে হবে, দেশে আইনের শাসন আছে এবং ধনবান বা ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরাও যদি আইন ভঙ্গ করে, তবে তাদের সাজা অনিবার্য। এই সত্য আমাদের নেতাদের উপলব্ধি করতেই হবে তাদের নিজেদের স্বার্থেই। 

আফতাব চৌধুরী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট