আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
| প্রবীণ কথা

গণপরিবহন যেমনÑ বাস, ট্রেন, লঞ্চ ইত্যাদিতে বয়স্ক যাত্রীদের জন্য রিজার্ভ বা সংরক্ষিত আসন থাকা উচিত। বয়স্ক ব্যক্তিদের পক্ষে ভেতরে ধাক্কাধাক্কি করে পরিবহনে ওঠা এবং সিট না পেলে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। যেহেতু তারা আমাদের আপনজন, তাই তাদের কথা বিবেচনা করে গণপরিবহনে সংরক্ষতি আসনের ব্যবস্থা করা অতীব জরুরি

প্রবীণ ব্যক্তিরা সম্মানিত। অতীতে তারা পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণে অনেক কিছুই করে গেছেন। তাদের যেন কোনোরকম অবহেলা করা না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আমরা যারা নবীন, তারা যেন ভুলে না যাই একদিন এ অবস্থায় আমরাও উপনীত হব। আজ যদি আমরা তাদের প্রতি অবহেলা করি, তাহলে আমাদেরও অবহেলার শিকার হতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রবীণরা অবহেলিত, উপেক্ষিত, সমাজে ও পরিবারে অনেকের কাছে বোঝাস্বরূপ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের সবার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া অবশ্য কর্তব্যÑ

 

ি প্রথমেই মনে রাখতে হবে, প্রবীণরা আমাদের পরিবারেরই অংশ। পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতোই তার সঙ্গে আচার-আচরণ করতে হবে। আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত, প্রবীণদের আদর-যতœ দিয়ে শিশুদের মতো প্রতিপালন করা এবং তাদের প্রতি মায়া, মমতা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। তাদের মধ্যে এমন ধারণা না জন্মে যে, তারা আমাদের বোঝা।

ি পৃথিবীর অনেক দেশে প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধনিবাস বা ওল্ড হোমের ব্যবস্থা আছে। প্রয়োজনে সেরকম ব্যবস্থা আমাদের দেশেও করতে হবে। তাই বলে অযতœ আর অবহেলার দায় এড়ানোর জন্য বৃদ্ধদের বৃদ্ধনিবাসে যেন না দেয়া হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

ি আমাদের দেশে শুধু সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর সামান্য পরিমাণ পেনশন ভাতা দেয়া হয়। প্রবীণ কি শুধু তরাই হবেন? সরকারি চাকরির বাইরে যারা চাকরি করেন তারা কি বৃদ্ধ হবেন না? তাদের জন্যও এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা জরুরি। এ বিষয়ে সরকারের অবশ্যই ভেবে দেখা উচিত।

ি পেনশন বা বয়স্ক ভাতা হিসেবে যে অর্থ দেয়া হয়, তার পরিমাণটাও সম্মানজনক হওয়া উচিত। যাতে তারা খেয়েপরে চলতে পারেন এবং পরনির্ভলশীল হতে না হয়।

ি প্রবীণরা যাতে স্বল্প ব্যয়ে উন্নত চিকিৎসা লাভ করতে পারেন এর জন্য পর্যাপ্ত হাসপাতলের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে তাদের জন্য আলাদা বিছানা বরাদ্দ থাকা উচিত। বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষা ও ওষুধ তাদের বিনামূল্যে বা স্বল্পদামে দেয়া উচিত। এছাড়া প্রবীণদের চিকিৎসার জন্য বড় হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত বিভাগ খোলা উচিত।

ি পরিবারের সদস্যদের মনে রাখা উচিত, তারা যেন তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করেন।

ি বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যথাসম্ভব প্রবীণদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত, যাতে তারা নিজেদের অপ্রয়োজনীয় ও অবহেলিত মনে না করেন।

ি গণপরিবহন যেমনÑ বাস, ট্রেন, লঞ্চ ইত্যাদিতে বয়স্ক যাত্রীদের জন্য রিজার্ভ বা সংরক্ষিত আসন থাকা উচিত। বয়স্ক ব্যক্তিদের পক্ষে ভেতরে ধাক্কাধাক্কি করে পরিবহনে ওঠা এবং সিট না পেলে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। যেহেতু তারা আমাদের আপনজন, তাই তাদের কথা বিবেচনা করে গণপরিবহনে সংরক্ষতি আসনের ব্যবস্থা করা অতীব জরুরি।

ি অনেক বয়স্ককে দেখা যায় ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে তারা বেশিক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। কেউ লাইনেই মাটিতে বসে পড়ছেন আবার কেউ ঘন ঘন টয়লেটে যাচ্ছেন। এসব কষ্ট লাঘব করার জন্য বয়স্কদের জন্য আলাদা বিল কাউন্টার থাকা উচিত।

পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থারও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। একক পরিবার, জনসংখ্যা, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, দ্রুত শিল্পায়ন আর শহরমুখী প্রবণতা অনেক কিছুই আমাদের আদর্শ ও মূল্যবোধের মূলে আঘাত করে প্রবীণদের অবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে বা খারাপের দিকে নিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে প্রবীণরা অযতœ, অবহেলিত, একাকিত্ব, সমাজের এমনকি পরিবারের বোঝা হয়ে যাচ্ছেন। মনে রাখা উচিত, আমাদের তারা যেভাবে মায়া-মমতা, ভালোবাসা এমনকি নিজের সর্বস্ব দিয়ে লালন-পালন করেছেন, তারাও আমাদের কাছে সেটাই আশা করবেন। আমাদের প্রবীণদের জীবন যেন সাত্যিকার অর্থেই হয় আনন্দের, শান্তিময়, মধুর, স্মৃতিময়। তারা যেমন নিজেদের অবহেলিত, পরিবারের ও সমাজের বোঝা না মনে করেন।

 

অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

ডিন ও অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়