আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৭-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, শোডাউন; অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটাতে সব পক্ষকে নিয়ে বসছে কেন্দ্র

মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জট খুলতে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ

দীপক দেব
| প্রথম পাতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বহু আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। তৃণমূলের নেতাদের রাজধানী ঢাকায় ডেকে এনে নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফর শুরু হয়েছে বেশ আগেই। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক জেলা সফর করে নৌকায় ভোট চেয়েছেন। পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে জরিপ করাসহ তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে গোপনে। তৃণমূলের মতামত ও জনপ্রিয়তা দেখে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবেÑ আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অল্প কিছু আসন বাদে প্রায় সব জায়গায় একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের প্রত্যাশায় মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রায় প্রতিটি আসনে তিন থেকে চারজন প্রার্থী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ডজন খানেকেও ঠেকেছে। এ অবস্থায় এলাকায় পাল্টাপাল্টি শোডাউন দেওয়া থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে লবিং করা পর্যন্ত সবকিছুই করছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। 

কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্ত হতে দেখা গেছে। অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হচ্ছে দলীয় নেতাদের পক্ষ থেকে। বারবার চেষ্টা করেও বাগে আনা যাচ্ছে না এসব নেতাদের। এ অবস্থায় আবারও নতুন করে কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। মূলত এ কারণে বৃহস্পতিবার রাজশাহী জেলার নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। আত্মঘাতী প্রচারণা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন,  এ আত্মঘাতী প্রবণতা বন্ধ করতেই হবে।  

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি আসনে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছে না আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ একটি দলে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবেÑ এটাই স্বাভাবিক। এর মধ্য দিয়ে একটি দলের জনপ্রিয়তারও প্রমাণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতারা যেটাকে সমস্যা হিসেবে দেখছেন, তা হচ্ছে এক অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে গিয়ে নৌকার ক্ষতি করছেন; আওয়ামী লীগের ক্ষতি করছেন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন, কেউ কারও বিরোধিতা করতে গিয়ে নৌকার বা দলের ক্ষতি করা যাবে না। তিনি সবাইকে নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়ার পরামর্শ দিয়ে মনোনয়ন যাকে দেওয়া হবে তার পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। কিন্তু মাঠের চিত্র এর উল্টোটা দেখা যাচ্ছে। 
জানা যায়, রাজশাহী জেলার ছয়টি আসনের প্রতিটিতে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নের জন্য মাঠে কাজ করছেন। তাদের কেউ কেউ বর্তমান এমপির বিরোধিতা করতে গিয়ে দলের ক্ষতি করছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি বেশ বেগতিক হওয়ায় জেলার নেতাদের নিয়ে বসার কার্যক্রম চলছে। সবাইকে দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের দু’জন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুধু রাজশাহী নয়, দেশের অধিকাংশ জেলার চিত্রই এমন; কিছু কিছু জায়গার অবস্থা বেশ খারাপ। দিনাজপুর, বরগুনায় তো অবাঞ্ছিত ঘোষণা পর্যন্ত করা হয়েছে। মনোনয়ন নিয়ে বেশ বাড়াবাড়ি চলছে। এগুলো ঠিক করার জন্যই কাজ শুরু করা হয়েছে। রাজশাহীকে ডাকা হয়েছে। সামনে এমন আরও বেশ কিছু জেলার নেতাদের নিয়েও বসা হবে। 
রাজশাহী-১ আসনের এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। এবার সেখানে আরও সাতজন মনোনয়ন প্রত্যাশী। এলাকায় তারা সেভেন স্টার নামে পরিচিত। এ সাত নেতার দাবি বর্তমান এমপির পরিবর্তে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হোক, তারা সেই প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন। রাজশাহী-২ সদর আসনের এমপি ১৪ দলের অন্যতম নেতা ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। এবার এখান থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইতে কাজ করছেন নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও রাসিক মেয়রপতœী শাহীন আক্তার রেনী, মুক্তিযোদ্ধা মীর ইকবাল এবং সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার। রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের বর্তমান এমপি আয়েন উদ্দীন ছাড়াও এ আসনে মনোনয়ন চান আরও ৯ জন। এদের মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী জিনাতুন নেছা তালুকদার, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বেগম আখতার জাহান, সাবেক এমপি মেরাজ উদ্দীন মোল্লা, জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ অন্যতম। 
রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের বিরুদ্ধে মাঠে রয়েছেন তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ এবং বাগমারা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিরুল ইসলাম সান্টু। সান্টু এর আগে এমপির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে বিভিন্ন অভিযোগ করেছিলেন। রাজশাহী-৫ আসনটিতে বর্তমান এমপি কাজী আবদুল ওয়াদুদ দারার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মাঠে আছেন সাতজন মনোনয়নপ্রত্যাশী। এদের মধ্যেÑ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবদুল মজিদ সরদার, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. মুনসুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহসান উল হক মাসুদ অন্যতম। 
আহসান উল হক মাসুদ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, কেন্দ্রীয় নেতারা আমাদের জেলার সাংগঠনিক সমস্যা সমাধানে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে নৌকার জয়ের জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিশেষ করে, আমরা যারা মনোনয়ন প্রত্যাশী তাদের কাছে জানতে চেয়েছেন দল থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তার পক্ষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব কিনা। এক বাক্যে আমরা হ্যাঁ বলেছি।
পাবনা-৩ আসনের বর্তমান এমপি মকবুল হোসেন। এ আসনে আরও ১২ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী কাজ করছেন। তারা প্রত্যেকেই মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে বিশ্বাস করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেনÑ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হামিদ মাস্টার, কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক আতিকুর রহমান আতিক, চাটমোহর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন সাকু অন্যতম। শুধু পাবনা-৩ নয়, জেলার ৫টা আসনের অবস্থাও রাজশাহীর মতোই।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন,  প্রতিযোগিতা থাকা ভালো। প্রতিযোগিতা আছে; কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা অসুস্থতা ও অস্থিরতার দিকে যাচ্ছে। এটা ভালো নয়। নির্বাচন করার জন্য দলের মনোনয়ন পাওয়ার আকাক্সক্ষা থাকতেই পারে, কিন্তু চায়ের দোকানে বসে গ্রুপিং-মিটিং করে একজনের বিরুদ্ধে আরেকজনের বক্তব্য দেওয়া আত্মঘাতী। এ আত্মঘাতী প্রচার বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, অসুস্থ প্রতিযোগিতা করে কেউ যদি মনে করেন এমপি হওয়ার পথ সুগম হবে, তাহলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন। জরিপ রিপোর্ট আছে, আমলনামা, এসিআর আছে, ছয় মাস পরপর আপডেট হচ্ছে। সর্বশেষটাও যোগ হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞ টিম যাচাই বাছাই করছে। আমাদের জনমতের ভিত্তিতেই মনোনয়ন দিতে হবে। যিনি বেশি গ্রহণযোগ্য তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে যতই প্রভাবশালী নেতা হোন না কেন মনোনয়ন দেওয়া হবে না। নির্বাচন আর দল এক কথা নয়। কর্মী যদি জনমতে প্রভাবশালী নেতার চেয়েও গ্রহণযোগ্য হয়, দল তাকে মূল্যায়ন করবে। 
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, একটি নির্বাচন শেষ করার পর থেকেই পরবর্তী নির্বাচনের জন্য আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। বর্তমানে আমরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সবাই যেন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি সেটা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। একইসঙ্গে নৌকার বিজয়ের জন্য স্থানীয় নেতাদের যা ভূমিকা সেটা স্মরণ করিয়ে যেন যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। 
নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রের বর্তমান এমপি ও মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে এক ধরনের শক্তি প্রদর্শনের মনোভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। কে কার চেয়ে বেশি লোক নিয়ে জনসংযোগ করতে পারে তার প্রতিযোগিতাও চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি জয়পুরহাট-১ আসনে এমন চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তৌফিদুল ইসলাম বুলবুল ঈদুল আজহার পর কয়েকদিন মোটরসাইকেল বহর নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট চাইতে দেখা গেছে। এ অবস্থা দেখে গত দুই দিন আগে এ আসনের সংসদ সদস্য সামছুল আলম দুদু বিশাল শোডাউন দিয়ে নৌকার পক্ষে ভোট চান। সামছুল আলম দুদুর বিশাল শোডাউন জয়পুরহাটের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহকে পরাজিত করেন ভাঙ্গা আসনের স্বতন্ত্র এমপি মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। শেখ পরিবারের আত্মীয় হিসেবে পরিচিত নিক্সন চৌধুরীর সঙ্গে কাজী জাফরউল্লাহ গ্রুপের দ্বন্দ্ব চলমান। এরপর থেকেই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ১ সেপ্টেম্বর ভোরবেলা সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের জের ধরে ভাঙ্গায় কাজী জাফরউল্লাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। 
মঙ্গলবার সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, মাদক বাণিজ্য ও অপরাজনীতির অভিযোগ এনে বরগুনা-১ আসনের এমপি, সাবেক উপমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষকলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সব অঙ্গ-সংগঠনের নেতারা। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর কবীর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এর আগে দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালকেও একইভাবে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে সংবাদ সম্মেলন করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা। এ বিষয়গুলো নিয়েও ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও এসব ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এদিকে, ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকেও এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এবং এমপিদের যারা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন, তাদের আজকের মধ্যে শোকজ নোটিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া না গেলে তাদের বহিষ্কার করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও বৈঠকে বলা হয়।