আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

গল্প

মশারাজ্যে

আমির খসরু সেলিম
| আলোকিত শিশু

দাঁড়াও!
খটাশ করে একটা শুঁড় বাগিয়ে ধরে প্রশ্ন করল প্রহরী, ‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’
‘আমি একজন দার্শনিক।’ পোঁ পোঁ শব্দ করে জবাব দিল আগন্তুক। ‘আমার কাছে পুরো দেশ ঘোরার অনুমতিপত্র আছে’, যোগ করে সে, ‘রাজার চিহ্ন দেওয়া।’
‘কোন চিহ্ন? ফলের রস না রক্ত?’ প্রহরী জিজ্ঞেস করে।
‘রক্ত’, বলেই দার্শনিক অনুমতিপত্র এগিয়ে দেয়।
‘হুম’, দেখে-শুনে প্রহরী বলে, ‘তা আপনি এদেশের নাগরিক তো? জানেনই তো ভিনদেশিদের জন্য আমাদের প্রকল্প দেখা নিষিদ্ধ। কারণ, মশকজাতি উন্নয়নে আমরাই শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চাই।’
পোঁওওও শব্দ করে দার্শনিক বলে, ‘না না আমি এখানকারই। তবে কিছুদিন বিদেশে থাকার জন্য চেহারাটা অমন দেখাচ্ছে।’
প্রহরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘ঠিক আছে, সঙ্গে গাইড দিচ্ছি। জানেনই তো ইদানীং শত্রুপক্ষের মশারা আমাদের এলাকায় ঢুকে আধুনিক পদ্ধতিগুলো জেনে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে, তাই একটু সাবধান থাকতে হয়।’
গাইড মশাটি খুবই ছটফটে। জিজ্ঞেস করার আগেই জানাল, তার নাম প্যাঁপো। গাইড প্যাঁপো বললে সবাই চেনে। তার মতো গাইড নাকি মশারাজ্যে একটাও নেই।
প্রথমেই ওরা গেল ‘পোলাপান অধিদপ্তর’-এ। দার্শনিক জানতে চাইল, এখানে কীভাবে কী করা হয়?
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জবাব দিলেন, ‘এটা আমাদের অসংখ্য প্রকল্পের একটি। এখানে মূলত মশার ডিম থেকে বাচ্চা বের করে লালন-পালন ও প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়। যেহেতু এটি একটি পচা ডোবা, তাই এটা তৈরিতে মানুষের অবদান অসামান্য। তারা এখানে আবর্জনা ফেলে নোংরা করেছে, কচুরিপানা পরিষ্কার করেনি। ফলে আমরা প্রকল্পের জন্য আদর্শ পরিবেশ পেয়েছি। এ জন্য আমরা মানুষদের কাছে কৃতজ্ঞ।’
ডোবার ভেতর অসংখ্য মশার বাচ্চা-কাচ্চা গুনগুন করে নামতার মতো ফলের রস আর রক্তের ক্যালরির তারতম্যের হিসাব মুখস্থ করছে।
একটা লম্বু চেহারার বাচ্চা মশা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘বলুন দেখি, ছাগলের রক্তে ভিটামিন বেশি, না মানুষের রক্তে?’
দার্শনিক জবাব দিলেন না। গাইড প্যাঁপো তাকে দ্রুত অন্য বিভাগে নিয়ে গেল।
‘এটা প্রশিক্ষণ বিভাগ। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর উন্নত এবং অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে মশাদের শিক্ষা দিয়ে দক্ষ করে তোলা হয় এখানে। যেমন, ঘরের অন্ধকারে এবং আনাচে-কানাচে ও খাটের নিচে কীভাবে ঘাপটি মেরে পজিশন নিতে হয়, কীভাবে রক্ত খাওয়ার সময় আক্রান্ত হলে চট করে পালানো যায় ইত্যাদি।’ একানকার কর্মকর্তা খুবই উৎফুল্ল হয়ে দার্শনিকের প্রশ্নের জবাব দিলেন। ‘এখানে আমরা নতুন নতুন গবেষণা করে আমাদের কাজের বৈচিত্র্য এবং নতুন পদ্ধতিও আবিষ্কার করছি।’
প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা তার চার নম্বর ঠ্যাং-টা নেড়ে আবার শুরু করলেন, ‘যেমন ধরুন, কীভাবে মশারির ফুটো টেনে বড় করা যায়, আর যখন মানুষ মশারির ভেতর ঢোকে সেই ফাঁকে সুড়–ৎ করে ভেতরে ঢুকে পড়ার পদ্ধতিও শেখানো হচ্ছে।’
কূটকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা বললেন, ‘আমাদের শিক্ষার প্রধান বিষয় হচ্ছে মানুষদের কানে পিন্ পিন্ পন্ পন্ শব্দ করে তাদের মনোযোগ ও অলসতার পরিমাপ বের করা। এর ফলে মশারা আক্রমণের সময় ও সুযোগ সম্পর্কে জেনে খুবই উপকৃত হয়। এছাড়া বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন রকমের ধোঁয়ার মধ্যেও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা মশাদের মধ্যে সৃষ্টি করতে পেরেছি। তবে কয়েলের উপাদানে ভেজাল থাকলে আমরা বেশি সুবিধা পাই।’
গাইড প্যাঁপো এরপর দার্শনিককে ‘হাতে-কলমে’ বিভাগে নিয়ে গেল। সেখানে ২ হাজার মশা দাঁড়িয়ে থেকে কী যেন একটা গান গাচ্ছিল।
দার্শনিক জিজ্ঞেস করল, ‘ এরা কী গান গাচ্ছে?’ বলতে বলতে সে একটা খড়ের টুকরোর ওপর বসে পড়ল।
গাইড প্যাঁপো শুঁড় চুলকিয়ে বলল, ‘এ গানটা আপনি চেনেন না?’
‘না তো’, দার্শনিককে অপ্রস্তুত দেখায়।
তখন হঠাৎ গাইড প্যাঁপো চিৎকার করে সৈনিক মশাদের ডেকে এনে দার্শনিককে বন্দি করল।
দার্শনিক কোঁ কোঁ করে বলল, ‘আমি আবার কী করলাম?’
প্যাঁপো লাফাতে লাফাতে বলল, ‘আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম, আপনি বিদেশি গুপ্তচর। দার্শনিকের ছদ্মবেশে আমাদের সব সিক্রেট জানতে এসেছেন। এই যে এরা দাঁড়িয়ে গান গাচ্ছে, এটা যে-সে গান নয়, এটা আমাদের জাতীয় সংগীত। আমাদের রাজ্যের নাগরিক হলে আপনি জাতীয় সংগীত চিনতেন এবং দাঁড়িয়ে পড়তেন। ওভাবে বসতেন না। বোধহয় ভুলে গেছেন যে, মশাদের একেকটি রাজ্যে একেকটি জাতীয় সংগীত।’
তারপর দার্শনিককে জেলে ঢোকানো হলো। আর পুরস্কার হিসেবে প্যাঁপো গাইড সরকারি চাকরি পাওয়ার সঙ্গে পেল তাজা ছয় ফোঁটা রক্ত। হ