আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

প্রযুক্তি যেন আমাদের বইপাঠ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে

তুফান মাজহার খান
| সম্পাদকীয়

একটা সময় ছিল, যখন মানুষের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বই ছিল অপরিহার্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে তা আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে। উদ্ভাবিত হয়েছে নানা বিনোদন প্রযুক্তি। টেলিভিশন, কম্পিউটার, স্মার্টফোনসহ অনেক কিছু। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এবং আধুনিকতা তথা স্মার্টনেস বাড়াতে সবাই ঝুঁকে পড়ছে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর। ইন্টারনেটনির্ভর হয়ে উঠছে শিশু, যুবক, বৃদ্ধ সবাই। প্রযুক্তির সর্বশেষ ও সহজলভ্য আবিষ্কার হলো স্মার্টফোন। বর্তমানে যে-কোনো বয়সের মানুষের হাতেই থাকে এটি। পথে, ঘাটে, হাটে, মাঠে, অফিসে, গাড়িতে, কাজের ফাঁকে যে যখনই সুযোগ পাচ্ছে, সে তখনই ফোনের ডাটা চালু করে শুরু করে ফেইসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ইমো বা ইউটিউবের ব্যবহার। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে যেন এটিই একমাত্র অবলম্বন। 
প্রযুক্তির অপব্যবহার বা অবাধ ব্যবহারে আমাদের মস্তিষ্ক বিকৃত হচ্ছে। আমরা হয়ে যাচ্ছি সংকীর্ণমনা। ফোন বা কম্পিউটারের বাইরে আমরা তেমন কিছুই ভাবার সময় পাই না। আমাদের সব চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে ফোন বা কম্পিউটার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব বই বেঁধে দেওয়া হয়, সেগুলো অপাঠ্যপুস্তক। আর যেসব বই আমরা কিনে পড়ি অর্থাৎ বাইরের বই সেগুলোই পাঠ্যপুস্তক।
এ কথা বলার উদ্দেশ্য এরূপ, যেসব বই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় অথবা পড়তে বাধ্য করা হয়, সেসব বই তারা পড়ে ঠিকই; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা বা জানার আগ্রহ নিয়ে পড়ে না। শুধু পরীক্ষায় পাস করা অথবা ভালো ফলের জন্য পড়ে। বেশিরভাগই মুখস্থবিদ্যা। যার স্থায়িত্ব মস্তিষ্কে খুবই কম। কিন্তু যে বই কিনে পড়া হয়, তা অবশ্যই জানা ও শেখার জন্য অতি আগ্রহের সঙ্গে পড়া হয়। তাই বাইরের বই অবশ্যই বেশি বেশি পড়া উচিত।
রবীন্দ্র যুগে হয়তো এ কথাটি সত্যিই ফলপ্রসূ ছিল। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমরা আজ বইবিমুখ হয়ে গেছি। আশার কথা, এর মধ্যেও কিছু কিছু সাহিত্যপিপাসু মানুষ আছে, যারা বই পড়ে। তবে এ সময়ের বই পড়া ও আগের বই পড়ার মধ্যে একটা বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেছে। আগে মানুষ কাগজে মোড়ানো বই পড়ত। এখন পড়ে ই-বুক। অর্থাৎ সেই প্রযুক্তিনির্ভর বই। ফোন, ট্যাব বা কম্পিউটারে এ বই পড়া যায়। এমনকি ই-বুক পড়–য়া পাঠক বাড়ার বারণে ই-বুক নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও জোরেশোরেই মাঠে নেমেছে। তৈরি হচ্ছে জনপ্রিয় বইগুলোর ই-বুক। এমনকি স্মার্টফোন বা ট্যাবে পড়ার জন্য বড় বড় লেখকের বইগুলো দিয়ে তৈরি হচ্ছে অ্যাপও। সেসব অ্যাপে করা হচ্ছে চমকপ্রদ ডিজাইন এবং প্লে স্টোর বা অ্যাপ স্টোর থেকে সেসব অ্যাপ ফ্রিতে ডাউনলোড করে দিব্যি বিনামূল্যে পড়া যাচ্ছে হাজার হাজার টাকার বই। যার দরুন প্রকৃতপক্ষে যারা বইয়ের পাঠক তারাও পয়সা বাঁচানোর সুবিধার্থে ওই পথেই হাঁটছেন। ফলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন স্থবির হয়ে যাচ্ছে। বইয়ের বিক্রি কমেছে বহুলাংশে। আগে অমর একুশে বইমেলায় যে পরিমাণ বই বিক্রি হতো এখন সে পরিমাণ হচ্ছে না। আগে বইমেলা চলাকালীন প্রায় প্রতিটি নতুন বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এখনকার চিত্র যেন সম্পূর্ণ উল্টো। হাতেগোনা দুয়েকটা বই ছাড়া প্রায় সব বইয়ের প্রথম মুদ্রণই বিক্রি করা সম্ভব হয় না। বইমেলায় তুলনামূলক মানুষের আগমন বেড়েছে ঠিকই; কিন্তু বই বিক্রি বাড়েনি। এখন মেলায় ক্রেতার চেয়ে দর্শনার্থীর সংখ্যাই বেশি। আগে শুধু বইমেলাই নয়; মেলাপরবর্তী সময়গুলোয় হাটে-বাজারে, বইয়ের দোকানগুলোয় কবিতা, গল্প, উপন্যাসের বইয়ের চাহিদাই ছিল অন্যরকম। পাঠ্যপুস্তক বা গাইড বইয়ের তুলনায় সেসব বইয়ের বিক্রিই ছিল ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য। তাই বইয়ের দোকানগুলোয় পাঠ্যপুস্তক বা গাইডবইয়ের তুলনায় সেসব বই-ই থাকত বেশি। কিন্তু বর্তমানে বইয়ের ব্যবসা হয়ে উঠেছে সম্পূর্ণ পাঠ্যপুস্তক ও গাইডবইনির্ভর। হাতেগোনা কিছু গল্প, উপন্যাসের বই ছাড়া দোকান ভর্তি থাকে বিভিন্ন গাইডবইয়ে। সেসব কারণে আশাহত হচ্ছেন লেখক, প্রকাশক ও বই ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আধুনিক প্রযুক্তি ও ই-বুক বিষয়ে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যতই ই-বুক বা আধুনিক প্রযুক্তিই বের হোক না কেন কাগজে ছাপা বইয়ের যে একটা গন্ধ বা পড়ার যে আনন্দ এটা কিন্তু ই-বুক থেকে কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়।
যাহোক, প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা আধুনিক হবÑ এটাই স্বাভাবিক। তবে এ আধুনিকতা যেন আমাদের বই পড়তে না ভুলিয়ে দেয়, সে বিষয়টা অবশ্যই আমাদের খেয়াল রাখা উচিত। বইয়ের বাজারে আবার সুদিন ফিরে আসবে, মানুষ বই পড়বে, বইকে সঙ্গী বানাবে, কবি-লেখকরা সাহিত্যচর্চার সুযোগ পাবেন, প্রকাশকরা সাহিত্যকর্ম নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পাবেনÑ এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের। হ

প্রাবন্ধিক, ঢাকা