আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বর্তমান শিক্ষাপদ্ধতি কতটা বাস্তবসম্মত

আনোয়ার হোসেন
| সম্পাদকীয়

আমরা দিনের পর দিন আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি অর্থাৎ শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ এ দুটি বিষয় নিয়ে কোন দিকে এগোচ্ছি সত্যিই ভাববার বিষয়। শিক্ষা যদি প্রায়োগিক, কর্মমুখী ও জীবনমুখী না হয়, তাহলে শিক্ষা একটা পর্যায়ে অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমেই শিক্ষার উদ্দেশ্য, প্রয়োগ, তাৎপর্য ভালোভাবে বুঝতে হবে এবং সেটা নিজের মধ্যে তথা সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রয়োগ করতে হবে। 
খুব সহজ করে বলতে গেলে প্রথমেই বলা যায়, আমাদের পাঠ্যবইয়ের লেখা ও উপদেশগুলোর বাস্তব প্রয়োগ থাকতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা দিনরাত শুধু পাঠ্যবই মুখস্থ করে ভালো নম্বর বা জিপিএ পাওয়ার উদ্দেশ্যে পরীক্ষার হলে মুখস্থ বিদ্যা উগড়ে দিয়ে আসবে না; বরং তারা সেটার বাস্তব প্রয়োগ ঘটাবে। অর্থাৎ কোনো শিক্ষার্থী যদি তার পাঠ্যবই পড়ে বড়দের সম্মান করা ও ছোটদের স্নেহ করা শিখে, তখন সে তার ঘরে ও চারপাশে এ উপদেশ দুটির প্রয়োগ ঘটাবে। আবার বলা যায়, পাঠ্যবইয়ে যদি রাস্তা পার হওয়ার সঠিক পদ্ধতি হিসেবে জেব্রাক্রসিংয়ের ব্যবহার থাকে, তাহলে রাস্তা পার হওয়ার একটি পদ্ধতি হিসেবে জেব্রাক্রসিং পদ্ধতিটি শুধু মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখে এলেই হবে না, বাস্তবে রাস্তা পার হওয়ার সময় এটি ব্যবহার করতে হবে। এমন আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে, যা আামাদের শিক্ষা বা পাঠকে পরীক্ষার খাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলছে। 
মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা কখনোই একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানপিপাসা বাড়িয়ে তুলতে পারে না। জেএসসি, এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার বাংলা ও ইংরেজিতে যে পরিমাণ রচনা, আবেদনপত্র, চিঠিপত্র ও অনুচ্ছেদ মুখস্থ করা হয়, তা দিয়ে একজন পরীক্ষার্থী তার জীবনে কী বয়ে নিয়ে আসবে? তার চেয়ে ভালো হতো যদি একজন শিক্ষার্থীকে কীভাবে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর শুদ্ধ ইংরেজি বাক্য তৈরি করা যায়, সেটা ভালোভাবে শেখানো যেত। আমার মতে, গেল দুই দশক ধরে শিক্ষাকে চাকরি পাওয়ার একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সেজন্য ভালো জিপিএ বা সিজিপিএ পাওয়াই শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এরই অংশ হিসেবে রেজাল্টনির্ভর মুখস্থ পড়াশোনায় ছাত্রছাত্রীরা প্রায় মরিয়া হয়ে উঠছে। একবারও চিন্তা করছে না তারা কী পড়ছে, কেন পড়ছে এবং কীভাবে পড়ছে? এত গেল শিক্ষার্থীদের কথা, এবার আসা যাক শিক্ষকদের প্রসঙ্গে। একটু উপরের শ্রেণিতে তাকালেই দেখতে পাব সেটি আরও ভয়াবহ। ওঈঞ-এ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ঝষরফব-নির্ভর পড়াশোনাও বেড়ে যাচ্ছে। আমি ওঈঞ এর উন্নয়ন বা ঝষরফব এর বিপক্ষে নই। কিন্তু সেটা হওয়া চাই জায়গা বিশেষ ও প্রয়োজন মতো। আজকাল দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন সরকারি ও  বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা দুই-তিন বছর ধরে একই ঝষরফব দিয়ে পড়াচ্ছেন। তিনি নিজেও ওই বিষয়ের অগ্রগতি নিয়ে বাসায় পড়াশোনা করছেন না বা পড়ার সময়ও পাচ্ছেন না। রাত জেগে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য হ্যান্ডনোট তৈরি করার মানসকিতা বা সময়ই বা এখনকার কয়জন শিক্ষাকের রয়েছে। আমি সব শিক্ষককে এক পাল্লায় মাপছি না। আমি আমার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশকিছু পরিশ্রমী, উদ্যমী ও ছাত্রবৎসল শিক্ষক পেয়েছি। যাদের একমাত্র কাজই ছিল ছাত্রদের কোনো কঠিন জিনিস সহজ করে ক্লাসে বুঝিয়ে দেওয়া। কিন্তু এখনও এমন শিক্ষক রয়েছেন, তবে নিশ্চিত তারা সংখ্যাই খুবই কম। আরেকটি বিষয় আমাকে খুব পীড়া দেয়, যখন দেখি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ঠিকমতো ক্লাস হয় না। শিক্ষকমহলের দিকে আমি ছাত্র হিসেবে উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি, দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ, ঠিকমতো ক্লাস না হওয়া, আনঅথরাইজড ছুটি নিয়ে বিদেশ গমন বা বিদেশে অবস্থান, শিক্ষাছুটি নিয়ে ডিগ্রি শেষে দেশে না আসা প্রভৃতি কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য। সবাই যদি নিজ স্বার্থে বিদেশমুখী হই, তাহলে আমাদের এ সম্ভাবনাময় দেশটির কী হবে। আপনাদেরই তো জাতির বিবেক বলা হয়। আপনাদের হাতেই দেশের মানুষ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ভার তুলে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মনে প্রকৃত শিক্ষার ক্ষুধা-তৃষ্ণাকে জাগিয়ে তুলতে এবং পড়াশোনাকে জীবনমুখী করে তুলতে আপনারাই পারেন। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার স্বাদ বা আবেদনই দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ দেশ বছরের পর বছর লাখ লাখ জিপিএ-৫ দিয়ে কী করবে? এ শিক্ষা আমাদের কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে? যাহোক আলোচনা শুধুই দীর্ঘ হতে চাচ্ছে। আসলে আমার লেখার মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে আমরা যেন শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতি, উদ্দেশ্য এবং শিক্ষাবিষয়ক আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে একটু সচেতন হই। কারণ ইংরেজিতে বলা হয়Ñ ঊফঁপধঃরড়হ রং ঃযব নধপশনড়হব ড়ভ ধ হধঃরড়হ বা চবহ রং সরমযঃরবৎ ঃযধহ ঃযব ংড়িৎফ.
বাইরের দেশের মতো শিক্ষা হবে চাপমুক্ত প্রয়োগিক ও বাস্তবিক। তাহলেই আমরা একটি সুন্দর, সভ্য ও উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে পরিচিত হতে পারি। তাই আসুন শিক্ষিত বেকার তৈরি না করে কর্মমুখী দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে দেশকে সহায়তা করি। হ

শিক্ষার্থী, এমএসএস (অপরাধবিজ্ঞান বিভাগ)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়