আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

সড়ক যেন ভোগান্তির নাম

আবু আফজাল মোহা. সালেহ
| সম্পাদকীয়

যানজট, ভাঙাচোরা, খানাখন্দÑ এই হচ্ছে বাংলাদেশের মহাসড়কের অবস্থা। কোনা কোনো ক্ষেত্রে অপ্রশস্ত। সারা দেশে মহাসড়ক এবং আঞ্চলিক সড়ক মিলিয়ে ২ হাজার ২০০ কিলোমিটারের মতো রাস্তা আছে। বৃষ্টির কারণে অনেক সড়কের নাজুক অবস্থা বা বেহাল দশা হয়েছে। রাস্তায় জলাবদ্ধতা এবং অতিমাত্রায় ওভারলোড ট্রাক চলার কারণে সড়কের ক্ষতি হচ্ছে। যেসব সড়ক সংস্কার করা হচ্ছে, বছর না পেরুতেই দেখা যাচ্ছে তার বেহাল দশা। সড়ক-মহাসড়কের দৈন্যদশা নতুন কিছু নয়। কারণ সরকার আন্তরিক হলেও বছরজুড়েই বেহাল অবস্থায় থাকে। শুধু ঈদ এলেই এ দুরবস্থার চিত্রটি জোরোশোরে উঠে আসে। তখন মেরামতের তোড়জোড় শুরু হয়।
মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) জরিপ মতে, সারা দেশে বিভিন্ন শ্রেণির সড়কের দৈর্ঘ্য ২১ হাজার ৩০২ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৮১৩ কিলোমিটার এবং ৪ হাজার ২৪৭ কিলোমিটার। জেলা সড়কের দৈর্ঘ্য ১৩ হাজার ২৪২ কিলোমিটার। জরিপ মতে, জাতীয় সড়কের শতকরা ২০ ভাগ, আঞ্চলিক সড়কের ৩১ ভাগ এবং জেলা শহরের ৪৭ ভাগ সড়কই ভাঙাচোরা। অনেক ক্ষেত্রে সড়ক-মহাসড়কগুলো ভাঙাচোরা, বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দে ভরে ওঠার কারণে প্রতিদিনই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়ে শ্রম, অর্থ ও জ্বালানির ক্ষতি হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছার বিষয়টি স্বপ্নের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
ঢাকা থেকে সিলেট, রংপুর, খুলনা ও বরিশালে যাওয়ার দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত দূরত্ব ১ হাজার ৬০ কিলোমিটার। এসব সড়কের অনেক স্থানে খারাপ অবস্থা, ভাঙাচোরা, খানাখন্দ। ঢাকা-চট্টগ্রাম পথের দূরত্ব ২৪২ কিলোমিটার এবং গেল বছর চার লেনে উন্নীত করার পর সড়কটি এখন ভালো। তবে মেঘনা-গোমতী সেতুতে অব্যবস্থাপনার কারণে যানজট নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা প্রতিবেদন ২০১৭ অনুযায়ী, এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিকৃষ্ট সড়কের দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। শুধু নেপাল বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ। সওজের হাইওয়ে ডিজাইন ম্যানুয়াল (এইচডিএম) বিভাগের ২০১৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক খারাপ। ৩৯ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক ভালো। আর সাড়ে ২৩ শতাংশ চলনসই। এখন খারাপের হার কিছুটা বাড়তে পারে। এর মধ্যে খুলনা অঞ্চলের (বিশেষ করে যশোর-খুলনা) অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের সড়কের অবস্থাও খারাপ। (তথ্যসূত্র : বিভিন্ন পত্রিকা)।
রাজধানী ও আশপাশের জেলার বেশিরভাগ ফুটপাত অবৈধ দখলে। রাস্তার অনেকাংশ এভাবেই দখল করে রেখেছেন অনেক ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী। রাস্তা প্রশস্তকরণ করতে হবে। বিশেষ করে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোয়। ট্রাফিক সিগন্যাল উন্নত করতে হবে। তবে উল্লেখিত ত্রিপক্ষের সচেতনতা সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এটিই নিরাপদ সড়কের মূলমন্ত্র। ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে হবে, ফ্লাইওভার ব্যবহার করতে হবে। ফুটপাত ও ফ্লাইওভার দখলমুক্ত করতে হবে। হাত তুলে গাড়ি থামিয়ে পথচারী চলাচল বন্ধ করতে হবে। এটাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। অনেক সময় আমরাও পাশের ফুট ওভারব্রিজ বা পাতালপথ ব্যবহার না করে এ অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা সৃষ্টি করি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, এখানে তিনটি পক্ষ জড়িত। পরিবহন কর্তৃপক্ষ (মালিক-শ্রমিক), সরকার (বিআরটিএ-প্রশাসনসহ) ও পথচারী (জনগণ)। তিন পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে নিরাপদ সড়কের জন্য। তাই বলা চলে, এ ত্রিপক্ষীয় পারস্পরিক সচেতনতা, সহযোগিতার মাধ্যমে নিরাপদ সড়কের চিন্তাভাবনাকে এগিয়ে নিতে হবেÑ এক কাতারে দাঁড়িয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। যে-কোনো একপক্ষ নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে পারে না। বলা চলে সরকার এ ব্যাপারে আন্তরিক। তবে টেকনিক্যাল বা অন্য কিছু কারণে ব্যয় করেও কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। দরকারের সময় তড়িঘড়ি করে প্রচুর ব্যয় করেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে কম। এজন্য দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা। আর দরকার দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা। 

কলামিস্ট, চুয়াডাঙ্গা