আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

আবুল মনসুর আহমদের কথাসাহিত্য

বি শ্ব জি ৎ ঘো ষ
| আলোকিত সাময়িকী

আবুল মনসুর আহমদ : জন্ম ৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৮, মৃত্যু ১৮ মার্চ ১৯৭৯

বাংলাদেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, আইন এবং সমাজ-সংস্কৃতির ভুবনে এক বিশিষ্ট ও উজ্জ্বল নাম আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯)। অভিভক্ত বাংলায় তিনি ছিলেন সমধিক পরিচিত এক সাহিত্যিক-সাংবাদিক-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সুভাষ বসু, আতাউর রহমান খান, মওলানা আকরম খাঁ, মওলানা ভাসানী, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী মোতাহার হোসেনÑ সমকালীন এসব কৃতী মানুষের সঙ্গে তার ছিল গভীর সম্পর্ক। আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। সমাজের প্রচল নানা গলদ এবং কূপম-ূকতা রঙ্গ-ব্যঙ্গের আধারে তার সাহিত্য ও সাংবাদিক-রচনায় সত্যনিষ্ঠভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ভ- ধর্ম-ব্যবসায়ীর মুখোশ উন্মোচনে তার কথাশিল্প বাংলা সাহিত্যের ধারায় সঞ্চার করেছে এক স্বকীয় মাত্রা।
প্রগতিশীল সমাজচেতনা এবং সৃষ্টিশীল রাজনীতি-ভাবনা আবুল মনসুর আহমদের কেন্দ্রীয় মানসবৈশিষ্ট্য। সমকালীনদের মধ্যে এক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। অনেক পরিচয়ের মাঝেও তার লেখক পরিচয়টিই আমাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। লেখক ছিলেন বলেই মানুষের চিত্তলোকে তিনি সঞ্চার করতে চেয়েছেন প্রগতিশীল সমাজচেতনা এবং সৃষ্টিশীল রাজনীতিভাবনা। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই ভাষ্যÑ ‘সচেতনতাকে... সবসময় সজাগ রাখা, কখনও হারিয়ে না ফেলা এ আবুল মনসুর আহমদের মধ্যে যেমন দেখি তেমন দেখি না অন্য কারও মধ্যে। এর একটা কারণ তিনি জড়িত ছিলেন প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে। কিন্তু আবুল মনসুর আহমদ একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন একথা বললে তার সম্পর্কে সবটা বলা হয় না। এমনকি তার প্রধান পরিচয়ও দেওয়া হয় না। প্রধান পরিচয় এই যে, তিনি একজন লেখক, সাংবাদিক হয়েও লেখক। উকিল ও রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও লেখক। সেই পরিচয়ই কী স্থায়িত্বে, কী গুরুত্বে।’ (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ২০১৫ : ২৩)। অভিন্ন উচ্চারণ দেখি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের রচনায়Ñ ‘জীবদ্দশায় রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদ, সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদকে আড়াল করে দিলেন। ... মৃত্যুর পর রাজনীতিক ও সাহিত্যিক সমাজ-পাল্লায় দাঁড়িয়েছেন। ভবিষ্যতে তার সাহিত্যিক পরিচয়ই মুখ্য হবেÑ এই আমার বিশ্বাস।’ (মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, ২০১৫ : ২৯)।
কবিতা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, আবুল মনসুর আহমদ কথাকোবিদ হিসেবেই সমধিক পরিচিত। কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, আত্মজীবনীÑ তবে গল্প-উপন্যাস রচনাতেই তার সিদ্ধি শীর্ষবিন্দুস্পর্শী। তার কথাশিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ, কৌতুক ও পরিহাসপ্রিয়তা। নির্মল হাস্যরস সৃষ্টি নয়, আবুল মনসুর আহমদের ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ-কৌতুকের অন্তরালে ছিল তার তীক্ষè সমাজচেতনা ও উন্নত সমাজসংস্কার বাসনা। ‘...আমাদের সুখের জন্য না হোক, স্বাস্থ্যের জন্যও হাস্যরসের আলোক দেশময় ছড়িয়ে দেওয়া নিতান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে।’ (প্রমথ চৌধুরী, ১৩৮০ : ২৫)। হাস্যরস সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরীর এমন ভাবনার বিপ্রতীপে আবুল মনসুর আহমদের কণ্ঠে শোনা যায় তীক্ষè এই উচ্চারণÑ ‘আমি অন্যায় ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যা লিখব তা হবে আপসহীন।’ (নুরুল আমিন, ২০১১ : ৮৭)। আবুল মনসুর আহমদের এই উচ্চারণ থেকেই অনুধাবন করা যায় তার সব রচনার অন্তর্প্ররেণা হিসেবে সর্বদা সক্রিয় ছিল সামাজিক দায়িত্ব চেতনা। রঙ্গ-ব্যঙ্গের কশাঘাতে তিনি দূর করতে চেয়েছেন সামাজিক অসঙ্গতি দুরাচার ভ-ামি। ব্যঙ্গ-সাহিত্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মলিয়ের বলেছেন ‘...ঃড় পড়ৎৎবপঃ ঃযব ারপবং ড়ভ সবহ যিরষব ধসঁংরহম ঃযবস’Ñ একথা যেন আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্য সম্পর্কে সর্বাংশে সত্য।
ব্যঙ্গ-সাহিত্য রচনা এক দুরূহ কাজ। বাংলা সাহিত্যে যে ক’জন ব্যঙ্গ-সাহিত্য রচনা করে সার্থকতা অর্জন করেছেন, আবুল মনসুর আহমদ তাদের অন্যতম। ব্যঙ্গের কশাঘাতে তিনি পরিশুদ্ধ করতে চেয়েছেন অসংগতি-অসমতা-ধর্মান্ধতাপূর্ণ প্রচল সমাজকে। আবুল মনসুর আহমদের ব্যঙ্গ শুধু নির্মল হাস্যরচনা নয়, তার ব্যঙ্গের পশ্চাতে আছে সামাজিক দায়বদ্ধতার টান। প্রসঙ্গত প্রণিধানযোগ্য ‘আয়না’ গ্রন্থের উৎসর্গ-পত্র। বন্ধু আবুল কালাম শামসুদ্দীনকে উৎসর্গ-পত্রে আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন এইকথা : ‘বন্ধুরা বল্ছেন, এই বইয়ে আমি সবাইকে খুব হাসিয়েছি। কিন্তু এই হাসির পেছনে যে কতটা কান্না লুকানো আছে, তা তুমি যেমন জান, তেমন আর কেউ জানে না।’ (আবুল মনসুর আহমদ, ১৯৪৮ : উৎসর্গ-পত্র)। আমাদের সমাজে প্রচলিত নানামাত্রিক ভ-ামি তীব্র ভাষায় তুলে ধরাই আবুল মনসুর আহমদের কথাশিল্পের কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্য। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায়, ‘আয়না’র মুখবন্ধ হিসেবে সংযোজিত কাজী নজরুল ইসলামের এই বিশ্লেষণ :
এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়, কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরি করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যেসব মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে, আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ-মূর্তি বন্য ভীষণতা নিয়ে ফুটে উঠেছে। মানুষের মুখোশ পরা এই বহুরূপী বনমানুষগুলোর সবাইকে মন্দিরে, মসজিদে, বক্তৃতার মঞ্চে, পলিটিকসের আখড়ায়, সাহিত্য-সমাজে যেন বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের একটা অসাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে, সে ব্যঙ্গ যখন হাসায়, তখন হয় সে ব্যাঙ, কিন্তু কামড়ায় যখন, তখন হয় সে সাপ; আর সে কামড় গিয়ে যার গায়ে বাজে, তার মুখের ভাব হয় সাপের মুখের ব্যাঙের মতোই করুণ।
২.
ছোটগল্পের আবুল মনসুর আহমদ প্রধানত ব্যঙ্গ-রচয়িতা। তার ছোটগল্পে ব্যঙ্গ-রসের প্রাধান্য বিশেষভাবে লক্ষ করা যাবে। মুসলিম সমাজে প্রচল নানামাত্রিক কুসংস্কার, কূপম-ূকতা, ধর্ম-ব্যবসায়ীর ভ-ামি এবং পীরপ্রথার ভয়ঙ্করতা আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্পে পৌনঃপুনিকভাবে শিল্পিতা পেয়েছে। রঙ্গ-ব্যঙ্গ-কৌতুকের মাধ্যমে তিনি নির্দেশ করতে চেয়েছেন সামাজিক অসংগতি এবং একই সঙ্গে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন এসব অসংগতি থেকে মানুষের মুক্তি। তার রঙ্গ-ব্যঙ্গের সঙ্গে কখনও মিলেছে করুণ হাস্যরস, কখনও-বা বৈদগ্ধপূর্ণ পরিহাস। সামাজিক অসংগতি আর ভ-ামি প্রকাশে তিনি ভয় পাননি, বরং নিজের কথাটা বলেছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। কাজটা যে খুব সহজ ছিল না, তা সহজেই অনুমেয়। সামাজিক চাপটা তিনি সামলিয়েছেন, অন্যদিকে নজর দিয়েছেন শিল্পের প্রতিও। কথাটাকে শিল্প করে তুলতেও তিনি রেখেছেন নৈপুণ্যের স্বাক্ষর। দ্রোহী মানসতার আন্তরগরজে হাসির আয়ুধ দিয়ে তিনি ধমকে দিয়েছেন ভয়াল ভয়ংকর আর সামাজিক রক্তচক্ষুকে।
২.১
আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্প-সংকলনের সংখ্যা চার আয়না (১৯৩৫), ফুড কনফারেন্স (১৯৪৮), আসমানী পর্দা (১৯৫৬) এবং গালিভরের সফরনামা (১৯৫৬)। চারটি গ্রন্থে সংকলিত গল্পের সংখ্যা আটাশ। সূচনা-সূত্রে যেমনটা বলা হয়েছে, এসব গল্পের কেন্দ্রীয় শিল্প-উপাদান হিসেবে গৃহীত হয়েছে সামাজিক নানা অসংগতি এবং ধর্মের নামে বহুমাত্রিক ভ-ামি। ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে রচিত এসব গল্পে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের ছবিটা বিশ্বস্ততার সঙ্গে ধরা দিয়েছে। আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্পের আর একটি বড় বৈশিষ্ট্য অসাম্প্রদায়িক চেতনা। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন মিলিত বাঙালির, সেখানে স্থান পায়নি ক্ষুদ্র কোনো সম্প্রদায়ভাবনা। ‘হুজুর কেবলা’, ‘গো দেওতা-কা দেশ’, ‘ধর্মরাজ’, ‘ফুড কনফারেন্স’, ‘লঙ্গরখানা’, ‘রিলিফ ওয়ার্ক’, ‘আসমানী পর্দা’, ‘আহলে সুন্নত’, ‘আদু ভাই’, ‘নিমক হারাম’, ‘গালিভরের সফরনামা’Ñ এসব গল্প আবুল মনসুর আহমদের ছোটগাল্পিক শিল্প প্রতিভাকে নির্ভুলভাবে ধরে রেখেছে।
‘হুজুর কেবলা’ গল্পে বাংলাদেশের গ্রামজীবনে প্রবলভাবে জেঁকে-বসা পীর ব্যবসার বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। এক ভ- পীর, পীরের কতিপয় সাগরেদ, তাদের ভ-ামি ও মিথ্যাচার, পীরের রিরংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার শঠ-কৌশল এবং এক প্রতিবাদী যুবকের আখ্যান শিল্পিত হয়েছে এ গল্পে। ‘হুজুুর কেবলা’ গল্পে আবুল মনসুর আহমদের আত্মজৈবনিকতার সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে। দ্রোহী যুবক এমদাদের সঙ্গেও তার খানিকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তার মতোই এমদাদ দর্শনের শিক্ষার্থী, তার মতোই রাজনীতি-সচেতন ব্যক্তি। সমাজে প্রচলিত পীরপ্রথার ভয়ঙ্করতা যেভাবে এই গল্পে শিল্পিতা পেয়েছে, তা একটা ব্যাধি থেকে মুক্তির বাসনায় আকুল। মিথ্যাচার, ভ-ামি ও ধর্মব্যবসায়ীর অপকৌশল থেকে সমাজ এখনও মুক্ত হয়নি। তাই উত্তরকালে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্কে লিখতে হয়েছে বুঝি লালসালুর (১৯৪৮) মতো উপন্যাস। লালসালুর মজিদ ‘হুজুুর কেবলা’ গল্পের ভ- পীরেরই উত্তর-প্রতিনিধি যেন।
মুসলিম সমাজের পাশাপাশি হিন্দু সমাজের ধর্মান্ধতা নিয়েও ব্যঙ্গাত্মক গল্প লিখেছেন আবুল মনসুর আহমদ। এ প্রসঙ্গে তার ‘গো-দেওতা-কা দেশ’ গল্পের কথা স্মরণ করা যায়। গো হত্যা রোধ আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক ভেদ সৃষ্টির জন্য ইংরেজদের অপকৌশল, দাঙ্গাÑ ইত্যাদি বিষয় লেখক ব্যঙ্গের আধারে এ গল্পে তুলে ধরেছেন। ‘ধর্মরাজ্য’ গল্পে প্রকাশিত হয়েছে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে প্রচলিত নানামাত্রিক ধর্মান্ধতা প্রসঙ্গ। খেলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘নায়েবে নবী’ ছোটগল্প। ধর্ম-ব্যবসায়ী মোল্লা-মৌলভিদের ভ-ামির মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে এ গল্পে। ‘সায়েন্টিফিক বিজনেস’ গল্পে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ-কৌতুকের জোয়ার সৃষ্টি করা হলেও, এর প্রধান প্রেরণা সমাজসংস্কার বাসনা (মিজানুর রহমান, ২০০৮ : ৪২)।
তেতাল্লিশের মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে আবুল মনসুর আহমদ রচনা করেন তার বিখ্যাত ছোটগল্প ‘ফুড কনফারেন্স’। দুর্ভিক্ষের সময় বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের নানামাত্রিক স্বার্থচেতনা এ গল্পে ব্যঙ্গের আশ্রয়ে শিল্পিতা পেয়েছে। ‘লঙ্গরখানা’ কিংবা ‘রিলিফ ওয়ার্ক’ গল্পেও আছে নানাবিক বিপর্যয়ের সময় সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বার্থচেতনার ব্যঙ্গাত্মক চিত্র। এসব গল্পে সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন আবুল মনসুর আহমদ। পাঠক, এ প্রসঙ্গেই আমরা স্মরণ করতে পারি তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য গল্প ‘জনসেবা য়ুনিভার্সিটি’। ইয়াকুবের জনসেবার রূপকে লেখক এখানে তুলে ধরেছেন বাঙালির সামাজিক নেতৃত্বের স্বার্থচালিত জনসেবা-মানসতা। বাঙালির স্বার্থচেতনা, আত্মকলহ এবং অনৈক্যের কারণে স্বাধীনতা সুদূর পরাহত থাকছেÑ এ চেতনা লেখক ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছেন ‘ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি গল্পে।
‘আহলে সুন্নত’ এবং ‘আদু ভাই’ আবুল মনসুর আহমদের গল্পসাহিত্যে নির্মল হাস্যরস সৃষ্টির দৃষ্টান্ত হিসেবে দাবি করতে পারে স্বতন্ত্র আসন। যদিও দুটি স্বতন্ত্র বিষয় নিয়ে রচিত হয়েছে গল্পদ্বয়, তবু নির্মল এবং চমৎকার হাস্যরস সৃষ্টির সূত্রে গল্পদ্বয় যেন দাঁড়ায় একই বিন্দুতে। হুর-প্রত্যাশী হালিম চরিত্রের মাধ্যমে সুন্নত পালনের আতিশয্য এবং পরিণতিতে উচিত শিক্ষালাভ ও মানসপরিবর্তন লেখক চিত্তাকর্ষক ভাষায় নাটকীয় ঢং-এ পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন ‘আহলে সুন্নত’ গল্পে। এ গল্পেও আছে লেখকের আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার উত্তাপ। ‘আদু ভাই’ আবুল মনসুর আহমদের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গল্প। এ গল্পে সমন্বয় ঘটেছে হাস্য ও করুণ রসের। কোনো মহলকে খোঁচা দেওয়া বা আক্রমণ নয়, একান্তই নির্মল হাস্যরস সৃজন এ গল্পের মূল উদ্দেশ্য। আদু ভাইয়ের নির্মম পরিণতি বাঙালি পাঠকচিত্তকে গভীরভাবে সিক্ত করেছে, এর স্নিগ্ধ করুণ হাস্যরস বাঙালিচিত্তে সঞ্চার করেছে হৃদয় নিংড়ানো অকৃত্রিম সহানুভূতি। ‘গালিভারের সফরনামা’ গল্পেও আছে স্নিগ্ধ হাস্যরসের প্রস্রবণ। বাঙালি চরিত্রের নেতিবাচক নানা বৈশিষ্ট্য লেখক এখানে তুলে ধরেছেন। এ গল্প রচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে লেখকের মজাদার মন্তব্য আমরা স্মরণ করতে পারি। আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন : ‘গালিভর সাহেব দু’খানা সফরনামার মধ্যে ইংরেজিখানা প্রকাশের ভার দিয়া যান জনাথন সুইফটের ওপর। আর বাংলাখানা প্রচারের ভার দেন তিনি আমার ওপর।’ (আবুল মনসুর আহমদ, ১৯৭৮ : ৮)।
আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্প বাঙালি সমাজের নানামাত্রিক স্বার্থচেতনা ও ভ-ামির নির্ভুল ভাষাচিত্র। সমাজপতিদের তিনি যেভাবে আক্রমণ করেছেন, যেভাবে তিনি উন্মোচন করেছেন সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় নেতৃত্বের মুখোশ, তা রীতিমতো দুঃসাহসিক। আবুল মনসুর আহমদ সত্য প্রকাশে ভয় পাননি, হাসির মধ্য দিয়ে তিনি ধমকে দিয়েছেন ভয়ঙ্করকেÑ এবং এ কারণেই তার গল্প হয়ে উঠেছে সমাজের নিষ্ঠ ভাষাচিত্র।
৩.
ছোটগল্পের মতো উপন্যাস রচনায়ও আবুল মনসুর আহমদ শিল্প-উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন চোখে-দেখা সমকালীন মুসলিম সমাজ। আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার ছায়াপাত ঘটেছে আবুল মনুসর আহমদের উপন্যাস সাহিত্যে। বিভাগ-পূর্ব মুসলিম সমাজের অস্তিত্বসংকট, আদর্শবাদ, জাতিসত্তা সন্ধানবাসনা এবং সংস্কারচেতনা আবুল মনসুর আহমদের উপন্যাস সাহিত্যে শিল্পরূপ লাভ করেছে। তার সত্য-মিথ্যা (১৯৫৩), জীবন-ক্ষুধা (১৯৫৫) এবং আবেহায়াত (১৯৬৮) উপন্যাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে উপর্যুক্ত মন্তব্যের যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সত্য-মিথ্যার ওয়াজেদ, জীবন-ক্ষুধার হালিম এবং আবেহায়াত-এর হামিদÑ এই তিনটি চরিত্রের আধারে আবুল মনসুর আহমদ তুলে ধরেছেন সমকালীন মুসলিম সমাজের নানামাত্রিক মানস-চারিত্র্য।
৩.১
আবুল মনসুর আহমদের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস সত্য-মিথ্যা। এটি বাংলার গ্রাম-জীবনের বিশদ চালচিত্র। কিসমতপুরের আধারে এ উপন্যাসে যেন গোটা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন কথা বলেছে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং অসহায় দুঃখী মানুষÑ সফল স্তর থেকেই প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র নিয়ে আবুল মনসুর আহমদ নির্মাণ করেছেন তার উপন্যাসের অবয়ব। জোহান বোয়অরের ঞযব চড়বিৎ ড়ভ খরভব উপন্যাসের ছায়া অবলম্বনে রচিত সত্য-মিথ্যায় নিপুণ পর্যবেক্ষণে উপস্থাপিত হয়েছে বাংলার গ্রাম্য-রজনীতির অভ্রান্ত ছবি। বাংলার গ্রাম-জীবনকে চিনতে এ উপন্যাস পাঠকের সামনে বিস্তার করে সহযোগ। গ্রামীণ মানুষের সরলতা, সংকীর্ণ গ্রাম্য-রাজনীতি, আদালতে মিথ্যার বেসাতি, ঘুষ-প্রবণতা, ধর্মজীবীর প্রতারণা, পণপ্রথার অভিশাপ, অন্ধ সংস্কারÑ এসব অনুষঙ্গ সত্য-মিথ্যার শব্দস্রোতে যেভাবে শিল্পিত হয়েছে, তাতে আবুল মনসুর আহমদকে সাহিত্যিকের পাশাপাশি একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবেও চিনে নেওয়া যায়। তার কালের এসব প্রবণতা একালেও সমান মাত্রায় ক্রিয়াশীলÑ সেই সূত্রে সত্য-মিথ্যা এখনও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক এক রচনা।
বিশ শতকের চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকের মুসলিম সমাজ-জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে আবুল মনসুর আহমদের জীবন-ক্ষুধা উপন্যাস। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অন্তিমলগ্নে মুসলিম সমাজের জীবন বিশ্বাস, সংস্কারবাসনা, আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ এবং কঠিন স্বাতন্ত্র্য চেতনা জীবন-ক্ষুধা উপন্যাসের শব্দস্রোতে রূপলাভ করেছে। আদর্শবাদী বাঙালি মুসলিম যুবক হালিমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জীবন ক্ষুধার-র আখ্যান। একটি চরিত্রের আধারে লেখক এখানে তুলে ধরেছেন গোটা মুসলিম সমাজের অখ- সত্তা, সামূহিক পরিচয়। উপন্যাসে হালিম পালন করেছে কেন্দ্রানুগ শক্তির ভূমিকা। নানা বিষয় এলেও কেন্দ্রানুগ শক্তি হালিমের টানে ঘটনা এলিয়ে পড়েনি, বরং পরিণতির দিকে গতিশীল থেকেছে। কৃষক-প্রজা আন্দোলনের চিত্র দিয়ে শুরু এ উপন্যাস শেষ হয়েছে পাকিস্তান আন্দোলনের উত্তেজনা ও উল্লাস নিয়ে। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায়, আবুল মনসুর আহমদের এই ভাষ্য : ‘জীবন ক্ষুধা নামক আমার যে নভেল কৃষক-প্রজা আন্দোলন রূপায়ণের উদ্দেশ্যে শুরু হইয়াছিল, তা পর্যবসিত হইল পাকিস্তান আন্দোলনের বাস্তবতা চিত্রায়ণে।’ (আবুল মনসুর আহমদ, ১৯৭৮ : ২২২)।
আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার আলোকে আবুল মনসুর আহমদ রচনা করেছেন তার তৃতীয় এবং শেষ উপন্যাস ‘আবেহায়াত’। বাংলার গ্রামজীবনে পীরপ্রথা, পীরদের প্রভাব-প্রতিপত্তি, গ্রামীণ মানুষের সরল ধর্মবিশ্বাস, ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি, আধুনিক শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহÑ এসব বিষয় নিয়ে গড়ে উঠেছে আবেহায়াত উপন্যাস। সে হিসেবে এ উপন্যাসের সঙ্গে ‘হুজুর কেবলা’ গল্পের ভাবগত সাদৃশ্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে ধর্মান্ধতা ও গোঁড়ামি অতিক্রম করে হামিদ কীভাবে উদার মানুষ হয়ে উঠল এবং নায়িকা রাবিয়ার সঙ্গে তার প্রেমসাধনাকে সার্থক করে তুললÑ এ উপন্যাসের শব্দস্রোতে তা বিবৃত হয়েছে। উপন্যাসের গঠনকাঠামোতে লেখক একাধিক রোমান্স-উপাদান ব্যবহার করেছেন, যা উপন্যাসটির সিদ্ধির প্রশ্নে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই বিবেচনা করি।
৪.
বিষয়ের পাশাপাশি ছোটগল্প ও উপন্যাসের ভাষা-নির্মাণ ও উপস্থাপন-কৌশলেও আবুল মনসুর আহমদ নিজস্বতার পরিচয় প্রদানে সক্ষম হয়েছেন। প্রকরণ-সংগঠনে সূক্ষ্ম কারুকাজ তার ছোটগল্প ও উপন্যাসকে শিল্প-সার্থকতায় বিম-িত করেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘হুজুুর কেবলা’ গল্পটি স্মরণ করা যাক। শব্দ-ব্যবহারে তিনি এখানে সচেতন ও পরীক্ষাপ্রিয়। গল্পে দেখা যায়, হুজুর কেবলার সংলাপে ব্যবহৃত হয়েছে প্রচুর অপ্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দ, যা মুরিদদের বিভ্রান্ত করতে ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে আঞ্চলিক শব্দ-ব্যবহারেও লেখক দেখিয়েছেন মুনশিয়ানার পরিচয়। প্রসঙ্গত স্মরণীয় অসহযোগ আন্দোলনে এমদাদের যোগদান প্রসঙ্গটি। লেখক জানাচ্ছেন, এমদাদ ‘...ফ্লেক্সের ব্রাউন রঙের পম্পশুগুলো বাবুর্চিখানার বঁটি দিয়া কোপাইয়া ইলশা-কাটা করিল...।’ এখানে ইলশাকাটা শব্দের নিপুণ ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো।
নাটকীয় পরিচর্যা, ঘটনার সংহতি এবং সূক্ষ্ম-কৌতুকাশ্রিত বাকরীতি আবুল মনসুর আহমদের কথাশিল্পের বিশেষ লক্ষণ। ‘সত্য-মিথ্যা’ উপন্যাস থেকে কৌতুক আর অলংকার-সৃজনে আবুল মনসুর আহমদের নিজস্বতা উপলব্ধির জন্য উদ্ধৃত করা যাক দুটো অংশ :
ক্স কৌতুক
সবেমাত্র জরিনা চুলায় আগুন ধরাইয়া ভাতের হাঁড়ি বসাইয়াছে, অমনি আমির আলি ‘পাইছি জরিনা, পাইছি’ বলিতে বলিতে রান্নাঘরে ঢুকিয়া পড়িল এবং এমন আতেক্কাভাবে জরিনাকে জাপটাইয়া ধরিল যে, আরেকটু হইলে সে চুলার উপর পড়িয়া গিয়াছিল আর কি।
 (আবুল মনসুর আহমদ, ১৯৫৩ : ২৪২)
ক্স উপমা
আজই হঠাৎ বাঁশঝাড়ের আগুনের মতো কথাটা পাড়াশুদ্ধ ছড়াইয়া পড়িয়াছে।
 (আবুল মনসুর আহমদ, ১৯৫৩ : ৪৬)
৫.
আবুল মনসুর আহমদ রাজনীতি-সতর্ক ও সমাজ-সচেতন লেখক। রঙ্গ-ব্যঙ্গ ও হাস্যরসের মাধ্যমে তিনি সমাজের নানামাত্রিক গলদ ও অসংগতি ও ভ-ামি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। যেসব অপ-প্রথার বিরুদ্ধে তিনি লেখনী চালনা করেছেন, সে-সব অপপ্রথা এখনও আমাদের সমাজে বিদ্যমান, বরং কোনো-কোনো ক্ষেত্রে তা বেড়েছে বলেই মনে হয়। সে-সূত্রে আবুল মনসুর আহমদের ছোটগল্প এবং উপন্যাস এখন আমাদের কাছে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। অব্যাহত এই প্রসঙ্গিকতাই আবুল মনসুর আহমদের রচনার প্রধান শিল্প-সার্থকতা। প্রসঙ্গত কাজী নজরুল ইসলামের অভিমত দিয়েই শেষ করি এই রচনা :
...হাসির পিছনে যে অশ্রু আছে, ...কামড়ের পিছনে যে দরদ আছে, তা যারা ধরতে পারবেন, আবুল মনসুরের ব্যঙ্গের সত্যিকার রসোপলব্ধি করতে পারবেন তারাই। বন্ধুবরের এ রসাঘাত কশাঘাতেরই মতো তীব্র ও ঝাঁঝালো। কাজেই এ-রসাঘাতের উদ্দেশ্য সফল হবে, এটা নিশ্চয়ই আশা করা যেতে পারে।