আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৮-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

কচুর লতিতে লাভবান চাষি

মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ
| সুসংবাদ প্রতিদিন

এক সময় খাল অথবা ডোবার পাড়ে আগাছার মতো কচু গাছ জন্মাতো। এ গাছ থেকে লতি সংগ্রহ করা যেত। তবে সে সময় এ কচুর লতির জনপ্রিয়তা তেমনটা ছিল না। বর্তমানে মানুষের কাছে এটি একটি অন্যতম সবজি। পুষ্টিগুণে ভরা এ সবজি হবিগঞ্জের সর্বত্র বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। কৃষক এ সবজি চাষ করে নিজেরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি ক্রেতারাও খেতে পারছেন কেমিক্যালমুক্ত সবজি। লতি চাষে কেমিক্যাল প্রয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে না। তবে গরুর গোবর দিতে হয়। এতে কচু গাছে লতি প্রচুর পরিমাণে আসে। 

জানা গেছে, প্রাচীনকাল থেকেই জেলার বানিয়াচং উপজেলাজুড়ে কচু ও লতি চাষ হয়ে আসছে। প্রসিদ্ধ এ কচু ও লতি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। এখনও উপজেলাজুড়ে চোখে পড়ে কচু ও লতি চাষ। উপজেলাটি কচুর এলাকা হিসেবেও পরিচিত হবিগঞ্জসহ আশপাশের জেলাবাসীর কাছে। শুধু বানিয়াচং উপজেলাজুড়েই কচু ও লতি চাষ হচ্ছে না। বর্তমানে জেলার স্থানে স্থানে কচুর লতি চাষ হচ্ছে। কৃষক সামান্য শ্রম দিয়ে এর চাষ করে ভালো ফল পাচ্ছেন। কচু গাছের কিছুই সেভাবে ফেলার নয়। এর ডাটা, পাতা, গোড়া এবং লতি সবই খাওয়া যায়। বিক্রিতে মুনাফা থাকায় জেলার বিভিন্ন স্থানে কচুর লতি আবাদ দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছে।  

কৃষক সাজন মিয়া জানান, আগে তাদের বাড়ির আশপাশে আগাছার মতো জন্মাতো কচু গাছ। সে কচুর লতি নিজেরা খাওয়ার পর বিক্রি করা যেত বাজারেও। বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে কচুর লতি চাষ করছেন তিনি। কচুর লতি চাষে তেমন পরিশ্রম নেই। প্রায় বিনা পরিশ্রমেই কচুর লতি বিক্রি করে আয় হয় তার।

গৃহিণী রাবিয়া খাতুন জানান, কচুর ডাঁটা, মোড়া এবং লতি শুঁটকিসহ বিভিন্ন মাছ দিয়ে রান্না করলে দারুণ স্বাদ হয়। তিনি জানান, অন্যান্য এলাকা থেকে তাদের বাড়িতে মেহমান এলে ফেরার সময় কচু শাক ও লতি নিয়ে যান। অনেক সময় শহরে বসবাসরত আত্মীয়-স্বজনদের জন্য পাঠাতে হয়।
ডা. এমএ মোতালিব বলেন, কচুর লতিতে প্রচুর আয়রন আছে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। গর্ভাবস্থা, খেলোয়াড়, বাড়ন্ত শিশু, কেমোথেরাপি নিচ্ছেÑ এমন রোগীর জন্য কচুর লতি উপকারী। এতে ক্যালসিয়াম আছে পর্যাপ্ত। ক্যালসিয়াম হাড় শক্ত করে ও চুলের ভঙ্গুরতা রোধ করে। এ সবজিতে ডায়াটারি ফাইবার বা আঁশের পরিমাণ বেশি। এ আঁশ খাবার হজমে সাহায্য করে, দীর্ঘ বছরের কোষ্টকাঠিন্য দূর করে। যে কোনো বড় অপারেশনের পর খাবার হজমে উপকারী পথ্য হিসেবে কাজ করে। ভিটামিন ‘সি’ও আছে কচুর লতিতে। তা সংক্রামক রোগ থেকে দূরে রাখে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা করে দ্বিগুণ শক্তিশালী। ভিটামিন ‘সি’ চর্মরোগের বিরুদ্ধে কাজ করে। কিছু পরিমাণ ভিটামিন ‘বি’ আছে। যা হাত-পা, মাথার উপরিভাগে গরম হয়ে যাওয়া এবং হাত-পায়ের ঝিঁঝিঁ বা অবশ ভাব দূর করে। মস্তিষ্কে সুষ্ঠুভাবে রক্ত চলাচলে ভিটামিন ‘বি’ জরুরি। এতে কোলেস্টেরল বা চর্বি নেই। তাই ওজন কমাতে কচুর লতি উপকারী। এটি খেলে অ্যাসিডিটি ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। আয়োডিনও আছে কচুর লতিতে। অনেকেই কচুর লতি খান চিংড়ি মাছ দিয়ে। চিংড়ি মাছেও রয়েছে প্রচুর কোলেস্টেরল। যারা হৃদরোগী, ডায়াবেটিস ও উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরলজনিত সমস্যায় আক্রান্ত বা উচ্চরক্তচাপে (হাই ব্লাডপ্রেসার) ভুগছেন, তারা চিংড়ি ও শুঁটকি মাছ বর্জন করুন। ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, হাই ব্লাডপ্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকলে অল্প চিংড়ি মাছ ও কচুর লতি খেতে পারেন মাসে একবার। ডায়াবেটিসের রোগীরা নিঃসংকোচে খেতে পারেন কচুর লতি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, জেলার স্থানে স্থানে কৃষক কচু লতির চাষ করছেন। এ সবজি চাষে কৃষক লাভবান হচ্ছেন। তিনি বলেন, এর চাষে কেমিক্যাল প্রয়োগ করতে হয় না। গরুর গোবর ব্যবহারেই লতির ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।