আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বাংলাদেশে প্রাইভেট সেক্টরগুলোর ঘরোয়া দাতা হওয়ার এখনই সময়

মুশফিকা মোশাররফ শিলু
| সম্পাদকীয়

প্রাইভেট সেক্টরের সিএসআর ফান্ড বা তহবিল সাধারণত ব্যবহৃত হয় মালিক পক্ষের নিজস্ব এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ক্লিনিক, অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট নির্মাণে। এছাড়াও এলাকার মানুষের চিকিৎসায় অনুদান প্রদান করে, শিক্ষা খাতে বৃত্তি প্রদান করে, মানুষের জীবন-জীবিকায়ও অনুদান দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে বৈদেশিক অনুদান ও নিজের দেশের প্রাইভেট সেক্টরের অনুদানÑ এ দুই অনুদানেই উন্নয়ন-উদ্যোগ চলছে

বাংলাদেশে প্রাইভেট সেক্টর বা বেসরকারি খাতের সক্রিয় উপস্থিতি স্পষ্টই অনুভব করা যাচ্ছে। বলা চলে প্রাইভেট সেক্টরই দেশটিকে উন্নয়নশীল করে তুলেছে। বেসরকারি খাতের সক্রিয় উদ্যোগেই বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবেও ঘোষিত। 

বেসরকারি খাত বলতে আমি মনে করি, যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মধ্যস্থতাকারী সংস্থা, বহুজাতিক সংস্থা, ক্ষুদ্র, বড়, মাঝারি প্রতিষ্ঠান, সমবায় সমিতি যারা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে লাভজনক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এক কথায় এই প্রাইভেট সেক্টরগুলোই এখন দেশের সম্পদ ও উদ্ভাবনী শক্তির আধার।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রধান নগরী ও প্রধান নগরের বাইরের বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশে প্রাইভেট সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ব্যাংকিং সেক্টর, লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, পাথর ভাঙা শিল্প, টেক্সটাইল, পর্যটন, প্লাস্টিক কোম্পানি, খাদ্য ও পানীয় সংস্থা, স্টিল ও আসবাবপত্র শিল্প এবং আরও অনেক সংস্থা প্রাইভেট সেক্টর হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেছে। দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগে ওইসব সংস্থা প্রতিষ্ঠান তাদের করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্স (সিএসআর) তহবিল থেকে অনুদান বরাদ্দ করে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি একটি ছোট্ট বিনিয়োগ দিয়ে ১৯৭০ সালে যাত্রা শুরু করেছিল। আজ এই খাত বাংলাদেশের জিডিপিÑ গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাকশন ও জিএসপিÑ গ্রস ন্যাশনাল প্রোডাকশনে ভূমিকা রাখে। এই সেক্টরে প্রায় ৮০ ভাগ কর্মীই নারী। গার্মেন্ট সেক্টর নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও পারিবারিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশে ওষুধ শিল্প খাত একটি অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তিগত খাত, যা এখন দেশের জিডিপিতে ১ শতাংশ ভূমিকা রাখছে আর দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশ মেটাতে সক্ষম এবং এই শিল্প এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজস্ব খাত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মাত্র ৩৩টি নিবন্ধিত ওষুধ কোম্পানি ছিল, বর্তমানে ২৪০টির মতো রয়েছে, আর বাংলাদেশে অর্থনীতির চাকা ঘোরাচ্ছে।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ২০১৬ সালের ভয়াবহ বন্যায় কিছুসংখক প্রাইভেট সেক্টর (ইউনিলিভার, ন্যাশনাল পলিমার, বেঙ্গল প্লাস্টিক, এসিআই, প্রাণ-আরএফএল, বিকাশ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া) এবং আরও অনেকে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে জরুরি সাড়াপ্রদান কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা তাদের পণ্যের গুণগতমান বজায় রাখা ও পর্যাপ্ত জোগান রাখা, সাপ্লাই চেইন অব্যাহত রাখা, সেবাগুলোর প্রাপ্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এই জরুরি সাড়াপ্রদান কার্যক্রমটি অন্য কোনো স্টেকহোল্ডারের ক্ষতির কারণ হয়নি, মানবিক সাড়াপ্রদানের ‘ডু নো হার্ম’ নীতি মেনে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এ কার্যক্রমে স্থানীয় বাজারগুলো বন্যা চলাকালীন প্রাইভেট সেক্টরের সহযোগিতায় পণ্য বিক্রি বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল, কারণ সেই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি এই জরুরি সাড়াপ্রদান কর্মকা-ে উল্লিখিত প্রাইভেট সেক্টরকে জড়িত করেছিল এবং স্থানীয় বাজারে ই-ক্যাশ ইংজেক্ট করেছিল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ নিজেদের পছন্দ ও প্রয়োজনমতো ওয়াশ ও খাদ্যসামগ্রী কিনতে পেরেছিল। তাদের কোনো লাইনে দাঁড়াতে হয়নি, যার ফলে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণœ থেকেছে। 

একটি স্বনামধন্য প্রাইভেট সেক্টর সংস্থা অ্যাডোলেসেন্ট গার্ল (কিশোরী) ও নারী দলের সঙ্গে আলোচনা করে পণ্যের গুণগতমান ও মূল্য বিবেচনা করে তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করেছে এবং প্রতিটি ঘরে এ পণ্য পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করেছে। এটি নারী উন্নয়নের একটি টেকসই অংশ। এছাড়াও বাংলাদেশে কিছু সোশ্যাল ওয়ার্কার গ্রুপ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন স্কুলের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ও কোনো স্থানীয় এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনায় অনুদান করছে, তবে সেই অনুদান প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।

প্রাইভেট সেক্টরের সিএসআর ফান্ড বা তহবিল সাধারণত ব্যবহৃত হয় মালিক পক্ষের নিজস্ব এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ক্লিনিক, অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট নির্মাণে। এছাড়াও এলাকার মানুষের চিকিৎসায় অনুদান প্রদান করে, শিক্ষা খাতে বৃত্তি প্রদান করে, মানুষের জীবন-জীবিকায়ও অনুদান দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে বৈদেশিক অনুদান ও নিজের দেশের প্রাইভেট সেক্টরের অনুদানÑ এ দুই অনুদানেই উন্নয়ন-উদ্যোগ চলছে। কিন্তু নিজেদের অনুদান দেখা যায় না, আর প্রাইভেট সেক্টর এখন পর্যন্ত সরকারি, বেসরকারি, বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে শামিল হতে পছন্দ করে; কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পে বা কার্যক্রমে সরাসরি আর্থিক অনুদান করতে খুব আগ্রহ পায় না।

বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রাইভেট সেক্টর আরও সক্রিয়ভাবে অবস্থান করার অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বাংলাদেশ সপ্তম পঞ্চম বার্ষিক পরিকল্পনায় কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিল, যেমনÑ জিডিপির প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং দ্রুত দারিদ্র্যবিমোচন, প্রতিটি নাগরিকের ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়ন উদ্যোগ থেকে উপকৃত হওয়া এবং দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য টেকসই উন্নয়নের জন্য টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনার ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার এবং নগরায়ণের যথাযথ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচি। এই বিষয়গুলোয় প্রাইভেট সেক্টরের সিএসআর তহবিল ব্যবহারের সুযোগ ছিল এবং যারা অনুদান দিয়েছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। এই প্রাইভেট সেক্টরগুলো কিছু বিশেষ উপায়ে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে নিজেদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে পারে। যেমনÑ তাদের পণ্যের সরবরাহ টেকসই অবস্থায় উন্নীত করা, ভোক্তা ব্যবস্থাপনা করার মাধ্যমে এবং তাদের পণ্যের গুণগতমান যে-কোনো অবস্থায় বৃদ্ধি এবং বজায় রাখার মাধ্যমে নিজেদের সম্পৃক্ততাকে জাহির করতে পারে। এছাড়াও প্রাইভেট সেক্টর যদি দেশের কাছে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে তাদের অনুদানের মূল্যায়ন না হয়ে যাবে না।

তবে টেকসই উন্নয়নের ফলাফলে, ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ে, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এবং সুশীল সমাজে প্রাইভেট সেক্টরের ভূমিকায় রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে। প্রাইভেট সেক্টরগুলোকে তাদের ব্যবসার পরিবেশকে আরও উন্নত করা দরকার। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ও দুর্গম এলাকায় অর্থ সংস্থান বাড়ানোর জন্য এবং অবকাঠামোগত বিষয়ের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। 

বেসরকারি, আন্তর্জাতিক ও দাতা সংস্থার অনুদানের বিশেষ কিছু নিয়মনীতি রয়েছে। তাদের অনুদানের অর্থ খরচ করার জন্য নির্দেশনাপত্র রয়েছে; একটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা পুরো অনুদানের ১০ শতাংশ নিজের অফিস ব্যবস্থাপনার জন্য রাখতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে এ শতকরা হার আরও বেশি বা কমও হতে পারে। অব্যয়িত অর্থ, এক্সচেঞ্জ মানি কীভাবে খরচ করবে তার স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে দেয় দাতা গোষ্ঠী। অথচ আমাদের দেশের প্রাইভেট সেক্টর, দাতা সংস্থার এসব নিয়মের এত ধার ধারে না, তবে এক্ষেত্রে তাদেরও নিজস্ব কিছু নিয়মনীতি রয়েছে। বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, যদি বেসরকারি, আন্তর্জাতিক ও দাতা সংস্থা উন্নয়ন-উদ্যোগগুলোকে স্থানীয় বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নেয়, তাহলে প্রাইভেট সেক্টরগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়বে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

যেমন একটি সনাতন পদ্ধতির জরুরি সাড়াপ্রদান কর্মসূচিতে ত্রাণের পণ্য জাতীয় পর্যায়ের বাজার থেকে ক্রয় করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে বণ্টন করে থাকে। তাতে স্থানীয় বাজারব্যবস্থায় স্থবির অবস্থা বিরাজ করে, তাদের বিক্রি কমে যায়, বসে বসে ত্রাণ বিতরণ দেখতে হয়। অন্যপক্ষে ত্রাণ গ্রহীতার অত্মমর্যাদাও ক্ষুণœ হয়, কারণ এ ব্যবস্থায় তাকে দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণসামগ্রী নিতে হয়। স্থানীয় বাজারব্যবস্থাকে জড়িয়ে ত্রাণ কার্যক্রম করলে বাজারে ব্যবসায়ীদের বিক্রি যেমন বাড়বে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত জনসমষ্টি নিজের পছন্দ ও প্রয়োজনমতো পণ্য ক্রয় করতে পারবে। এক্ষেত্রে পণ্য কেনার জন্য জনগোষ্ঠীতে ও বাজারব্যবস্থায় ক্যাশ ইংজেক্ট করা হবে। এ কার্যক্রমে প্রাইভেট সেক্টরের সক্রিয় অবস্থান তৈরি হবে এবং তাদের অনুদানের সঠিক মূল্যায়ন হবে।

এখন থেকে বাংলাদেশে বৈদেশিক অনুদান ধীরে ধীরে কমতে থাকবে, যদিও এ মুহূর্তে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য প্রচুর বৈদেশিক অনুদান আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়ন-উদ্যোগগুলোয় আর আগের মতো বৈদেশিক অনুদান থাকবে না, যেহেতু বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সংস্থাগুলোও তাদের নিয়মিত উন্নয়ন-উদ্যোগের চেয়ে আয়মূলক কার্যক্রমে বেশি মনোযোগী হয়েছে, তারা আঁচ করতে পারছে বৈদেশিক অনুদান কমে যাওয়ার বিষয়টি।

তাই এখনই সময় বাংলাদেশের নিজের উন্নয়নে নিজেই দাতা হওয়ার। তাহলেই বহির্বিশ্বের বিপুল পরিমাণ সাহায্য ছাড়াই বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে। হ

 

মুশফিকা মোশাররফ শিলু

একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কর্মরত