আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ইসলামে সৎ ব্যবসায়ীর মর্যাদা

মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
| ইসলাম ও অর্থনীতি

সম্পদ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো ব্যবসা-বাণিজ্য। মানব সম্প্রদায় প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে একে অপরের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণ করে আসছে। কিন্তু এ ব্যবসা-বাণিজ্যে নীতি-নৈতিকতার অভাবে সবসময় একটি শ্রেণি প্রতারিত হচ্ছে, অপরদিকে যারা অনৈতিক পন্থায় সম্পদের পাহাড় গড়ছে তারা সাময়িক সফলতা পেলেও হারাচ্ছে সম্মান ও মান-মর্যাদা। যার কারণে সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে ও সমাজে দেখা দিচ্ছে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা । আর এসব অরাজকতা ও বিশৃঙ্খল অবস্থা দূর করার জন্য ইসলাম সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে কোরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘আর হে আমার জাতি, ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে ঠিকভাবে পরিমাপ কর ও আর ওজন দাও এবং লোকদের জিনিসপত্রে কোনোরূপ ক্ষতি করো না, আর পৃথিবীতে ফ্যাসাদ করে সীমা অতিক্রম করো না।’ (সূরা হুদ : ৮৫)। 

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হওয়ায় প্রত্যেকের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ সব বিভাগের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। এ বিধান যারা পালন করবে তাদের  দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মান ও কল্যাণের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ইসলামী শরিয়তে ইবাদত কবুলের পূর্ব শর্ত হিসেবে পবিত্র রিজিক গ্রহণ আবশ্যক করা হয়েছে। আর পবিত্র রিজিক অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো ব্যবসা-বাণিজ্য। ইসলামী শরিয়া অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনার জন্য কোরআন ও হাদিসে বিভিন্ন বিধিবিধান উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবল তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি দয়ালু।’ (সূরা নিসা : ২৯)। 

ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পৃথিবী পরিভ্রমণের উল্লেখ করে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে যে, ‘তিনিই তো তোমাদের জন্য ভূমিকে সুগম করে দিয়েছেন, অতএব তোমরা দিকদিগন্তে বিচরণ কর এবং তাঁর প্রদত্ত জীবনোপকরণ হতে আহর্য গ্রহণ কর; পুরত্থান তো তাঁরই নিকট।’ (সূরা মুলক-১৫)। 

যারা সততার সঙ্গে ইসলামী বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা করে তাদের বিশেষ মর্যাদা ও পুরস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনে সৎ ব্যবসায়ীর বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে এরশাদ করা হয়েছে যে, “অতএব তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ কর এবং মানুষকে তাদের দ্রব্যাদি কম দিও না এবং ভূপৃষ্ঠে সংস্কার সাধন করার পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না। এ  হলো তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।” (সূরা আরাফ : ৮৫)।  

আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সূরা জুমআ : ১০)। 

ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হচ্ছে জীবনেরই প্রয়োজনে কাজ, পরিশ্রম, প্রচেষ্টা ও উপার্জন এবং মাঝে মাঝে মন ও আত্মাকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে আল্লাহর স্মরণ ও মহব্বতে নিমগ্ন করে দেওয়া। অন্তর ও আত্মাকে জীবিত রাখার জন্য এ পদ্ধতি অত্যন্ত জরুরি। এ পদ্ধতি ব্যতীত আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও তাঁর দেওয়া আমানতের বোঝা বহন করা সম্ভব নয়। রোজগারের জন্য আল্লাহ তায়ালার স্মরণ অতীব জরুরি। এই স্মরণের কারণে যা কিছু কর্ম করা হয় এবং আয়-রোজগারের যে চেষ্টা চালানো হয়, তা সব কিছুই ইবাদতে পরিণত হয়। যেসব ব্যবসায়ী ইসলামী বিধিবিধান পালন করে থাকে, আল্লাহ তাদের জীবিকা বৃদ্ধি করেন এবং প্রাপ্যের অধিক সফলতা প্রদান করে থাকেন। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, “সেই সব লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ হতে এবং নামাজ কায়েম ও জাকাত প্রদান থেকে বিরত রাখে না, তারা ভয় করে সেই দিনকে যেই দিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। যাতে তারা যে কর্ম করে তজ্জন্য আল্লাহ তাদের উত্তম পুরস্কার দেন এবং নিজ অনুগ্রহে তাদের প্রাপ্যের অধিক দেন; আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করেন।” (সূরা নূর : ৩৭)

আল্লাহ তায়ালা নিজেকে তাদের অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেছেন যারা ব্যবসা পরিচালনায় বিশ্বাসঘাতকতা না করে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেছেন, যতক্ষণ দুজন শরিক ব্যবসায়ে একে অপরের সঙ্গে খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) না করে ততক্ষণ আমি তাদের তৃতীয় শরিক হিসেবে (তাদের সহযোগিতা করতে) থাকি। অতঃপর যখন  খেয়ানত করে, তখন আমি তাদের মধ্য থেকে বেরিয়ে যাই (তারা আমার সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়।’ (আবু দাউদ)।

সৎ ব্যবসায়ীর বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, তারা পণ্যের যদি কোনো দোষ-ত্রুটি থাকে তবে তা উল্লেখ করবে এবং এ সততার কারণে তারা বরকতপ্রাপ্ত হবে। এ প্রসঙ্গে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ক্রেতা ও বিক্রেতার জন্য পরস্পর পৃথক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত খেয়ার থাকবে। উভয়ে যদি সত্য কথা বলে এবং দোষত্রুটি বলে দেয় তবে তাদের ক্রয়বিক্রয়ের বরকত হবে। আর যদি তারা ক্রয়বিক্রয়ের মধ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং দোষত্রুটি গোপন রাখে, তবে তাতে বরকত থাকবে না।’ (মুসলিম)।

পণ্যের দোষত্রুটি প্রকাশ প্রসঙ্গে আকু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস : রাসুলুল্লাহ (সা.) একটা খাদ্যস্তূপের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর হাত তাতে প্রবেশ করালেন। ফলে তাঁর আঙুলে কিছু ভেজা অনুভূত হলো। তারপর তিনি বললেন, হে খাদ্য বিক্রেতা এ আবার কী? লোকটি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, ওতে বৃষ্টি পেয়েছে। তিনি বললেন, কেন তুমি ওই ভেজা অংশটাকে উপরে রাখলে না, তাহলে লোকে তা দেখতে পেত। যে ধোঁকাবাজি করে (কেনাবেচা করে) সে আমাদের নীতিতে নয়।’ (মুসলিম)।

ইসলামে সৎ ব্যবসায়ীদের মুজাহিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘বিধবা ও মিসকিনদের জন্য উপার্জনকারী ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদরত ব্যক্তির মতো। আর যারা রাত্রিতে নফল ইবাদত করে ও দিনে রোজা রাখে তাদের সমতুল্য। (ইবনে মাজাহ)

সৎ ব্যবসায়ী নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সততা অলম্বন করে থাকে। যারা নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করে হাদিসে তাদের মুজাহিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তি পরিপূর্ণ মুজাহিদ, যে আল্লাহর অনুগত হয়ে আপন প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করে থাকে।’ (আল জামিউল কাবীর, হাদিস ১২৪৭)। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এ ওয়াদার মাধ্যমে সৎ ব্যবসায়ীরা আল্লাহর কাছে মুজাহিদের উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং পরকালে তাদের জন্য হবে এই বিশেষ পুরস্কার। কেননা, ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রায়ই লোভ ও লালসার দাসত্বে পরিণত হতে দেখা যায়। আর এ ব্যবসা যে কোনো উপায়ে মুনাফা লুণ্ঠনের প্রবণতা প্রকট করে থাকে। আর ধন সৃষ্টি করে, মুনাফা আরও মুনাফা লাভের জন্য মানুষকে প্ররোচিত করে। কিন্তু যে ব্যবসায়ী সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততা রক্ষা করে তার ব্যবসা পরিচালনা করে, সে তো অবশ্যই জিহাদকারী ব্যক্তি। কেননা সে প্রতিনিয়ত লোভ-লালসার মোকাবিলা করে চলছে। অতএব মুজাহিদের মর্যাদা তার জন্য খুবই শোভনীয় এবং বাঞ্ছনীয়। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় ব্যবসায়ে সততা প্রতিষ্ঠার জন্য সৎ ব্যবসায়ীর মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করছে। দুনিয়াতে সৎ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন মর্যাদা ও সফলতা প্রাপ্তির পর কেয়ামতের ময়দানে তাদের অসৎ ব্যবসায়ীদের থেকে পৃথক করে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হবে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, রিফাআ (রা.) বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে বের হলাম। তিনি দেখতে পেলেন, লোকেরা সকালবেলা বেচাকেনা করছে। তখন তিনি তাদের এই বলে ডাকলেন, হে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়! তারা যখন চোখ তোলে ও ঘাড় উঁচু করে দেখল, তখন তিনি বললেন, ব্যবসায়ীদের কেয়ামতের দিন পাপীদের সঙ্গে উঠান হবে। তবে তারা ছাড়া, যারা আল্লাহকে ভয় করে, সততার সঙ্গে ব্যবসা করে ও সত্য কথা বলে। (ইবনে মাজাহ)। 

শেষ বিচারের দিন সৎ ব্যবসায়ীরা আরশের নিচে স্থান পাবে এবং নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের কাতারে থাকবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বিশ্বস্ত সত্যবাদী মুসলিম ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন শহীদের সঙ্গে থাকবে। (ইবনে মাজাহ)। ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যে সরলতা প্রদর্শনে নিদের্শনা দিয়েছে এবং যারা সরলতা প্রদর্শন করে তাদের জান্নাতবাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বেচাকেনার সময় যে সরলতা প্রকাশ করে, আল্লাহ তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।’ (ইবনে মাজাহ)। 

ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা আনয়নে সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে এবং সৎ ব্যবসায়ীদের তাদের প্রতিদানস্বরূপ উভয় জগতে বিশেষ মর্যাদার ঘোষণা দিয়েছে। এসব বিধিবিধান পালনের মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা হবে এবং ব্যবসায়ীরা উচ্চ মর্যাদার আসনে সমাসীন হবেন ইনশাআল্লাহ।

 

লেখক : সিনিয়র লেকচারার, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি