আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ধারাবাহিক সাফল্যই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অর্জন

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান
| শেষ পাতা

প্রফেসর ড. মোহাম্মাদ ফায়েক উজ্জামান, ভিসি, খুবি

প্রফেসর ড. মোহাম্মাদ ফায়েক উজ্জামান ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চার বছরের মেয়াদ সফলভাবে সম্পন্ন করে দ্বিতীয় মেয়াদে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হন তিনি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন কী, জাতীয় অগ্রগতিতে প্রতিষ্ঠানটি কী ভূমিকা পালন করতে পারছেÑ এ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন আলোকিত বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মদ নূরুজ্জামান

আলোকিত বাংলাদেশ :  ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কোন বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন?

প্রফেসর ড. মোহাম্মাদ ফায়েক উজ্জামান : আপনি হয়তো জানেন, ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি আমি দ্বিতীয় মেয়াদে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে যোগদান করি। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর এর আগে গৃহীত অসমাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত এবং উচ্চশিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধির বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেই। 

 দায়িত্ব নেওয়ার পর কোন ইস্যুটিতে আপনি কঠিনভাবে মুখোমুখি হয়েছিলেন?

 তেমন কোনো অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়নি।

খুবির যে ঐতিহ্য ছিল বর্তমানে তা ধরে রাখতে কতটা সক্ষম হয়েছেন বলে আপনি মনে করেন?

 খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিক সাফল্য অক্ষুণœ আছে বলে আমি মনে করি। আমিসহ এখানে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থী সবাই মিলে তা সংহত রাখা এবং ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করতে সচেষ্ট।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা গবেষণা ও গ্রন্থাগারে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে এ দুটি খাতই অবহেলিত। এ বিষয়ে যদি কিছু বলেন।

হহ গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধি ও গ্রন্থাগার উন্নয়ন এ দুটি দিকেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। বিগত দিনের চেয়ে গবেষণা কার্যক্রম বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার এখন অনেক বেশি সমৃদ্ধ। গবেষণা কার্যক্রম বৃদ্ধির জন্য এখানে গবেষণা সেল রয়েছে। গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য নতুন একটি স্বতন্ত্র ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় সম্পন্ন। এখানে গবেষণার আধুনিক যন্ত্রপাতিও স্থাপিত হচ্ছে। গবেষণা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। তবে এ কথা ঠিক, সরকারিভাবে গবেষণা ও গ্রন্থাগারের  জন্য আরও বাজেট বৃদ্ধি করা প্রয়োজন । 

 ছাত্র সংসদ প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের পরিবেশ কেমন? টিএসসি ভিত্তিক সংগঠনগুলো কি ভূমিকা রাখতে পারে?

 প্রথমেই বলে রাখি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি নেই। শুরু থেকে এখানে ছাত্র রাজনীতি চালু নেই বা সংগঠনও নেই। তবে শিক্ষার্থীরা দেশের রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতন। তারা জাতীয় দিবসগুলোয় যথাযথভাবে অংশ নেয়। এখানে ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের তত্ত্বাবধানে ২০-২৫টি ছাত্র সংগঠন আছে যারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের অংশগ্রহণে ক্যাম্পাস প্রায় সারা বছর উৎসবমুখর থাকে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসির মতো সুবিধা এখনও সৃষ্টি হয়নি। তবে দু’এক বছরের মধ্যে টিএসসি ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হলে এ ক্ষেত্রে সুবিধা বাড়বে।   

বর্তমানে জাতীয় উন্নয়নে এ বিশ্ববিদ্যালয় কতটুকু অবদান রাখছে বলে আপনি মনে করেন?

হহ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষাকার্যক্রম চালু রয়েছে। এরই মধ্যে ১০ হাজারের বেশি গ্র্যাজুয়েট বের হয়েছে। তারা দেশ-বিদেশে সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে নানা পেশায় কর্মরত। স্থাপত্য, নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা, ব্যবসায় প্রশাসন, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিবেশ বিজ্ঞানসহ কয়েকটি সাবজেক্ট রয়েছে যা স্নাতক পর্যায়ে দেশে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম চালু হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। জাতীয় উন্নয়নে অবশ্যই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে আমি মনে করি। 

 বিভিন্ন বিভাগের সেশনজট নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা? 

আপনি হয়তো অবগত আছেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শুরু থেকে সেশনজট নেই। তবে এর আগে দু’চার মাস কোনো কোনো স্কুল (অনুষদ) পিছিয়ে থাকলেও বর্তমানে সে অবস্থা নেই। দুই-তিন বছর থেকে একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের ১ জানুয়ারি ক্লাস শুরু হয় এবং ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই ফল প্রকাশিত হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এমন সুসংগঠিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণের নজির আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই।

হশিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কিনা? 

 শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি ছাত্র এবং দুটি ছাত্রী হল রয়েছে। এর মধ্যে একটি ছাত্র ও একটি ছাত্রী হলের সম্প্রসারণ কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলে আবাসন সংকট অনেকটা কমে যাবে।   
 নতুন বিভাগ খোলার যৌক্তিকতা কতটুকু?
নতুন বিভাগ আমরা খুলতে চাই। কিন্তু জায়গার সংকট রয়েছে। আমরা নতুন ১০তলা বিশিষ্ট একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। এটির কাজ শেষ হলে আমরা নতুন ডিসিপ্লিন খুলতে পারব। ডিসিপ্লিন খোলা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা হচ্ছে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের জায়গা দেওয়া এবং মানসম্মতভাবে শিক্ষা দেওয়া। সে কারণেই আমরা নতুন বিভাগ খোলার বিষয়টি আপাতত ভাবছি না। তবে দুই-এক বছরের মধ্যেই নতুন বিভাগ খোলা হবে।  নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কিনা?
হহ নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য সেন্টার অব এক্সিলেন্স ইন টিচিং অ্যান্ড লার্নিং (সিইটিএল) থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, তাছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়নসিংহে গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং ইনস্টিটিউটেও (জিটিআই) পাঠানো হয়। এছাড়াও ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) এবং বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, ওয়ার্কশপ, সেমিনারের মাধ্যমে তারা প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন।   
 পড়াশোনা এবং একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। তাদের মধ্যে দূরত্ব ঘোচাতে আপনার পরামর্শ কি হবে? 
 পড়াশোনা ও একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষাসহায়ক কার্যক্রম যত বেশি হবে তত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূরত্ব কমবে। শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে যদি পাঠে মনোযোগী হয়, গবেষণায় মনোযোগী হয়, গ্রন্থাগার যদি বেশি ব্যবহার করে, সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে এ দূরত্ব তৈরির সুযোগ হবে না।   
আমাদের সমাজে নৈতিক অধঃপতন এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা বিকাশ এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে আপনার পরামর্শ কী কী থাকবে? 
নৈতিকতার অধঃপতন বা মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিষয়টি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। এর মূলে অনেক বিষয় রয়েছে। তবে এটা ঠিক যে, এটা একদিনে যেমন হয়নি, তেমনি হঠাৎ করেই পরিবর্তন সম্ভব নয়। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, সামাজিক পরিবেশ সবক্ষেত্রেই এর চর্চার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার সম্ভব। তবে শিক্ষা ও রাজনীতিতে চর্চা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এবং তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আমি মনে করি।    
 ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি?
 শিক্ষার্থীরা ফেইসবুক, মোবাইলে যেন আসক্ত না হয়। জ্ঞানার্জনের জন্য তা যেন ব্যবহার করা হয় এবং অবশ্যই বই পাঠে/বইয়ের পিছনে সময় দিতে হবে। দেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা সবসময় মনে রাখা প্রয়োজন। 
আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নিয়ে কিছু বলুন।
 খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সাফল্য ২৭ বছর ধরে সুষ্ঠু একাডেমিক পরিবেশ ধরে রাখা। এখানে এ সময়ের মধ্যে কোনো রক্তপাত হয়নি, ছাত্র সংঘর্ষে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। সেশনজট নেই, সন্ত্রাস নেই, লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নেই। শিক্ষার মান দেশ-বিদেশে প্রশংসিত। সম্মানিত শিক্ষকদের অর্ধেকের বেশি পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। যুগের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার বিষয় এখানে চালু রয়েছে। শিক্ষার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রয়েছে।