আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

সবজি চাষে বাজিমাত

মহাসিন আলী, মেহেরপুর
| সুসংবাদ প্রতিদিন

সবজি চাষে সফলতা পেয়ে ভাগ্য ফিরিয়েছেন এক সময়ের দরিদ্র কৃষক রফিকুল ইসলাম। সবজি বিক্রির লাভ থেকে দোতলা বাড়ি করেছেন। দুই ছেলেমেয়েকে কলেজ-ভার্সিটিতে পড়াচ্ছেন। কিনেছেন চাষের জমি, সঙ্গে লিজও নিয়েছেন অনেক জমি। সবজি উৎপাদনের জাদুকর রফিকুল ইসলাম মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি ইউনিয়নের হিজুলী গ্রামের কৃষক আজগর আলীর ছেলে।

ছয় ভাইয়ের মধ্যে রফিকুল ছোট। প্রায় দুই যুগ আগে বাবার সংসার থেকে পৃথক  হলেও নিজের জমি-জায়গা ছিল না তার। বেকারত্ব দূর করতে বেছে নেন বাবার পেশা। ১৯৯০ সালের পরে তিনি পাশের ভিটের মাঠে মাত্র ৭ কাঠা জমি ৩০০ টাকায় লিজ নিয়ে লালশাক চাষ করেন। উৎপাদিত লালশাক বাজারে এক হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করেন। কয়েক বছর সবজি চাষ করে তিনি ওই ৭ কাঠা জমি ৯ হাজার টাকায় নিজেই কিনে নেন।

হিজুলী গ্রামের ভিটের মাঠে গিয়ে দেখা যায় নিজ সবজি ক্ষেত পরিচর্যা করছেন রফিকুল। সবজি চাষের সফলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, লালশাক দিয়ে তিনি চাষাবাদ শুরু করলেও তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে বেগুন, গোল আলু, পুঁই শাক, লালশাক, কলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি চাষ করে থাকেন। মশলা হিসেবে তিনি পেঁয়াজ-রসুন, কাঁচামরিচ ইত্যাদির চাষও করেন। তিনি অল্প কিছু জমিতে ধান, পাট ও গম চাষ করে থাকেন। এমনকি তিনি কলমি, লালশাকসহ বিভিন্ন ফসলের বীজও তৈরি করেন। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে জমি লিজ নিয়ে সবজি, মশলা ও সবজি বীজ উৎপাদন করে তা থেকে প্রাপ্ত লাভ দিয়ে ৪ বিঘা জমি কিনেছেন। আর লিজ নিয়েছেন সাড়ে ৩ বিঘা জমি। 

দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময় সবজি চাষ তাকে সবজির জাদুকর বানিয়েছে। কোন চাষের পর কোন সবজি চাষ করতে হবে,

কখন কোন সবজির চাষ করলে জমিতে বছরে সবচেয়ে বেশিবার চাষ করা যাবে, কীভাবে চাষ করলে সবজি ফসলে কম পরিমাণ সার-বিষ লাগবে। ফসল হবে বিষমুক্ত। মাঠের অনেক সবজি চাষি এমন তথ্য দিয়ে আরও বলেন, সবজি, সবজি বীজসহ যে কোনো ফসল চাষে সবসময় আমরা তার সহযোগিতা পাই।

তিনি জানান, পোকামাকড় ও পশু-পাখির অত্যাচার থেকে যে কোনো ধরনের ফসল রক্ষায় তিনি বিষ ব্যবহারের বিপক্ষে। তিনি বেগুন পোকার হাত থেকে রক্ষা করতে জমি নেট দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বেগুন, মিষ্টিকুমড়াসহ সবজি ক্ষেতের পোকামাকড় দমনে ফেরোমন ফাঁদ, ব্যাগিং পদ্ধতি ও নেট ব্যবহারের পক্ষে। তিনি বলেন, এভাবে বেগুন, মিষ্টিকুমড়া চাষে একদিকে বিষ কম লাগে। অন্যদিকে পোকা-মাকড় ও পশু-পাখির অত্যাচার কম হয়। আবার বাজারে বেগুন ও মিষ্টি কুমড়াসহ বিষমুক্ত সবজির চাহিদা বেশি। তিনি ধান চাষে প্যাচিং পদ্ধতি ব্যবহারে তার এলাকার কৃষককে উদ্বুদ্ধ করেন।

সবজি কিংবা সবজি বীজ তৈরিতে লাভ কেমন জিজ্ঞাসা করতেই তিনি জানান, তার জমি-জায়গা ছিল না। বসতঘর ছিল না। সবজি চাষের লাভ দিয়ে তিনি দোতলা ঘর করেছেন। মাঠে ৪ বিঘা জমি কিনেছেন। আরও সাড়ে ৩ বিঘা জমি লিজ নিয়েছেন। একমাত্র ছেলে সাইফুল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদালয় থেকে উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগে পাস করে বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছে। এছাড়া মেয়ে প্যারা মেডিকেল পাস করে ঢাকায় বিএসসি ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। তিনি বলেন, ঢাকায় দুই ছেলেমেয়ের লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ার খরচ এবং নিজ সংসার চালিয়েও ২০ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে দোতলা ঘর করেছি। এছাড়া ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করে ৪ বিঘা জমি কিনেছি ও সাড়ে ৩ বিঘা জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করছি।

মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান, রফিকুল ইসলাম একজন সফল চাষি। তিনি চাষ বোঝেন ও পাশাপাশি কৃষককে চাষাবাদে নানা প্রকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

মেহেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একেএম কামরুজ্জামান বলেন, এলাকার সবজি ও সবজি বীজ চাষের জাদুকর কৃষক রফিকুল। তার সফলতা দেখে এলাকার অনেকে লাভজনক চাষ সবজি ও সবজি বীজ উৎপাদনে অগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তার এলাকার ভিটের মাঠ মেহেরপুর জেলায় একটি সবজি উৎপাদক খ্যাত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে উঠেছে।