আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

নির্বাচনী হাওয়াঃ শরীয়তপুর-১

কোন্দল বড় দুই দলেই

শরীয়তপুর প্রতিনিধি
| শেষ পাতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংসদীয় আসন ২২১Ñ শরীয়তপুর-১ (পালং-জাজিরা) আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগদানসহ গণযোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান এবং সভা-সমাবেশের মাধ্যমে সরকারের সফলতার গুণকীর্তন করে তাদের প্রার্থিতার কথা জানান দিচ্ছেন ভোটারদের কাছে। বিএনপির একাধিক নতুন মুখসহ সম্ভাব্য প্রত্যাশীরা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে মাঠে না নামলেও তারা সরকারের স্বৈরাচারিতা ও ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে ভোটারদের শোনাচ্ছেন প্রতিশ্রুতির কথা। তবে তারা ২০ দলীয় জোটের (বিএনপির) সঙ্গে সমন্বয় করেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এছাড়া ইসলামী আন্দোলনের একজন প্রার্থী রয়েছেন।

শরীয়তপুর-১ আসনটি শরীয়তপুর সদর ও জাজিরা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এখানে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৪২ জন ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮০৫ ও মহিলা ভোটার ১ লাখ ৪০ হাজার ৬৩৭ জন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচিত হন। ওই সময় এ আসনে আওয়ামী লীগের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাসদের অধ্যাপক আ. রাজ্জাক মিয়া। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালু আওয়ামী লীগের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম দানেশকে পরাজিত করে বিজয়ী হন। ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় জাতীয় পার্টি থেকে সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালু জাসদের প্রার্থী মাস্টার মজিবুর রহমানকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল তৃতীয়। ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালু নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক যুবলীগ নেতা কেএম হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গজেব বিএনপির প্রার্থী সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালুকে পরাজিত করে বিজয়ী হন। ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনের নির্বাচনি ফল স্থগিত করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রয়াত আবদুর রাজ্জাক বিএনপি প্রার্থী সাইফুল ইসলাম খানকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। আবদুর রাজ্জাকের ছেড়ে দেওয়ার পর উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাস্টার মজিবুর রহমান নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেএম হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গজেব কেন্দ্রীয় যুবলীগ থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মোবারক আলী সিকদারকে পরাজিত করে বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী মোবারক আলী সিকদারকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নিবাচিত হন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিএম মোজাম্মেল হক বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
আওয়ামী লীগ : শরীয়তপুর-১ আসনের জাজিরা উপজেলাকে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বলা হয়। তবে সদর উপজেলায় বিএনপির ভোট তুলনামূলক বেশি হলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীরাই জয়ী হয়ে আসছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মী জানান, বর্তমানে এ আসনে আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এরা হলো বর্তমান এমপি বিএম মোজাম্মেল হক ও ইকবাল হোসেন অপু গ্রুপ। তারা দুইজনই মনোনয়ন লাভের ব্যাপারে আশাবাদী। গেল উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। তবে বর্তমান এমপি মোজাম্মেল হক দাবি করেন, এখানে কোনো বিরোধ নেই। বড় দল হিসেবে যে কোনো নেতাই মনোনয়ন চাইতে পারেন। ইকবাল হোসেন অপুও একই দাবি করে বলেন, কোন্দল নয় প্রতিযোগিতা রয়েছে।
এ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হেভিওয়েট প্রার্থী বিএম মোজাম্মেল হক। ২০০৮ সালে তাকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে রংপুর বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। মোজাম্মেল হক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্দিনের বিশ^স্ত নেতা হওয়ায় এ আসনে তিনি এবারও আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাবেন বলে দলটির বড় একটি অংশের দাবি। এছাড়া বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন অপু এখন থেকেই মনোনয়ন পেতে আটঘাট বেঁধেই মাঠে নেমেছেন। তিনি এলাকায় বিভিন্ন দলীয় কার্যক্রম ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সফলতার কথা বলে নৌকা প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করছেন। তার পক্ষের নেতাকর্মীরা দাবি করেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ তার মনোনয়ন পেতে সহযোগিতা করবে এবং তিনিই মনোনয়ন পাবেন। এদিকে জাজিরা উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি মোবারক আলী সিকদার নৌকার মনোনয়ন পেতে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে শরীয়তপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক মাস্টার মজিবুর রহমান, শরীয়তপুর পৌর মেয়র ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম কোতোয়াল এবং শরীয়তপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম তপাদার এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী। এছাড়া ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক সভাপতি নুরজাহান আক্তার মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।
বিএনপি : এ আসনে বিএনপি দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পৃথকভাবে রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করছে। এ আসনে বিএনপির একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালু, জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আলতাফ মাহমুদ সিকদার, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব আলম তালুকদার, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শরীয়তপুর সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান খান দিপু, জেলা বিএনপির সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম মিন্টু সওদাগর, সাবেক ছাত্রনেতা, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ব্যক্তিগত সহকারী আমিনুল ইসলাম বাদল, ইডেন কলেজের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান ইতালি বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ফাহিমা আক্তার মুকুল। ফাহিমা আক্তার মুকুল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খালেদা জিয়ার কারামুক্তির আন্দোলনসহ নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছেন বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি মো. নুরুজ্জামান শিপন মনোনয়ন প্রত্যাশী। এদের মধ্যে সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালুকে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে একাধিক সভা-সমাবেশে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
ইসলামী আন্দোলন : দলটির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জেলা ইসলামী আন্দোলনের সহ-সভাপতি মুফতি তোফায়েল আহমেদ কাসেমী।
জাসদ (ইনু) : এ দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন শরীয়তপুর জেলা কমিটির সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা স ম আবদুল মালেক।
জাপা : জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদুর রহমান মাসুদ ও সাবেক সভাপতি জাফর খান কালাম।
আওয়ামী লীগের ইকবাল হোসেন অপু বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর অন্য কোনো সরকারের আমলেই হয়নি। সারা দেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতার সঙ্গে শরীয়তপুরেও অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিছু অনুপ্রবেশকারীর কারণে দলে কিছু সমস্যা থাকলেও দলীয় কোন্দল নেই। শুধুই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আছে। এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাকে মনোনয়ন দেবেন, তার পক্ষেই নির্বাচন করব। প্রধানমন্ত্রী আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি বিজয়ী হব, ইনশাআল্লাহ। আমি মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।
আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, আমি আমার নির্বাচনি এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। তাই শরীয়তপুর এখন আর অবহেলিত নয়। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে মসজিদ-মাদ্রাসাসহ রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। তবে দলীয় মনোনয়ন অনেকেই চাইতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী যাকে মনোনয়ন দেবেন, আমরা সম্মিলিতভাবে তার পক্ষেই কাজ করব। আমাকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হব, ইনশাআল্লাহ। মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।
বিএনপির সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালু বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। এ সরকারের আমলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে মনে হয় না। যদি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, তাহলে বিএনপির পক্ষে আমি একজন মনোনয়ন প্রত্যাশী। আমি দলের দুর্দিনে পাশে ছিলাম, বর্তমানেও আছি, ভবিষ্যতেও থাকব। সবদিক চিন্তা করে দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে বলে বিশ্বাস করি।