আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

বাকৃবি গবেষকদের সাফল্য

এবার উন্মোচিত হলো ইলিশের জীবন রহস্য

মো. ইউসুফ আলী, বাকৃবি
| প্রথম পাতা

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের জীবন রহস্য উন্মোচন (পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং) করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। পাট ও মহিষের পর তৃতীয় গবেষণা সাফল্য হিসেবে ইলিশের জীবন রহস্য উন্মোচন করলেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। এ গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের মৎস্য সেক্টর পূর্ণাঙ্গ জিনোম গবেষণার যুগে প্রবেশ করল এবং তা ইলিশের সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে দাবি করেন প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলম। দীর্ঘ তিন বছর গবেষণা শেষে তারা এ সফলতা পান। শনিবার সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় গবেষক দলটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলমের নেতৃত্বে গবেষক দলের অন্য সদস্যরা হলেনÑ পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্লা, বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম ও ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহা. গোলাম কাদের খান।

গবেষক দল জানায়, আমরা ২০১৫ সালে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের (এনসিবিআই) তথ্যভা-ারে গত বছরের ২৫ আগস্ট স্বীকৃতি পাই। এছাড়া দুটি আন্তর্জাতিক জৈব প্রযুক্তি সম্মেলনে তারা জীবন রহস্য উন্মোচনের প্রাথমিক তথ্য উপস্থাপন করেছেন।

প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. সামছুল আলম বলেন, জিনোম হচ্ছে কোনো জীব প্রজাতির সব বৈশিষ্ট্যের নিয়ন্ত্রক। অন্য কথায়, জিনোম হচ্ছে কোনো জীবের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। জীবের অঙ্গসংস্থান, জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াসহ সব জৈবিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় জিনোমে সংরক্ষিত নির্দেশনা দ্বারা। পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং হচ্ছে কোনো জীবের জিনোমে সব নিউক্লিওটাইড কীভাবে বিন্যস্ত রয়েছে তা নিরূপণ করা। একটি জীবের জিনোমে সর্বমোট জিনের সংখ্যা, বৈশিষ্ট্য এবং তাদের কাজ পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স থেকেই জানা যায়। ইলিশের জিনোম বিশ্লেষণ করে আমরা ৭৬ লাখ ৮০ হাজার নিউক্লিওটাইড পেয়েছি, যা মানুষের জিনোমের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এছাড়াও জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে ২১ হাজার ৩২৫টি মাইক্রোস্যাটেলইট (এসএসআর) ও ১২ লাখ ৩ হাজার ৪০০টি (এসএনপি) পাওয়া গেছে। বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করলেই ইলিশ জিনোমে মোট জিনের সংখ্যা জানা যাবে।
গবেষণা সহযোগী ড. মোল্লা বলেন, গবেষকরা জীবন রহস্য উন্মোচন করতে মেঘনা ও বঙ্গোপসাগর থেকে জীবন্ত পূর্ণবয়স্ক ইলিশ সংগ্রহ করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে উচ্চ গুণগত মানের জিনোমিক ডিএনএ প্রস্তুত করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জিনোম সিকোয়েন্সিং সেন্টারে সংগৃহীত ইলিশের পৃথকভাবে প্রাথমিক ডেটা সংগ্রহ করেন। এরপর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার কম্পিউটারে বিভিন্ন বায়োইনফরম্যাটিক্স প্রোগ্রাম ব্যবহার করে সংগৃহীত প্রাথমিক ডেটা থেকে ইলিশের পূর্ণাঙ্গ নতুন জিনোম বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা হয়।
ইলিশ মাছের জীবন রহস্য উন্মোচনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ড. আলম বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। পৃথিবীর মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৪.৯৬ লাখ মেট্রিক টন, যা দেশের মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ। এদেশের প্রায় ৪ লাখ মানুষ জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষভাবে ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত। এই জাতীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও টেকসই আহরণ নিশ্চিত করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ইলিশ একটি ভ্রমণশীল মাছ। এরা সারা বছর সাগরে বাস করে, কিন্তু প্রজননের জন্য সাগর থেকে বিভিন্ন নদীতে চলে আসে এবং ডিম ছাড়ার পর মা ইলিশ সাগরে ফিরে যায়। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং টেকসই রাখার জন্য গৃহীত কর্মসূচি ফলপ্রসূ করতে মাছের জৈবিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যবস্থাপনা কার্যকলাপের মধ্যে সমন্বয় সাধন দরকার।