আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ৯-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

স্বপ্নের সলিল সমাধি এভাবে!

শফিক কলিম
| প্রথম পাতা

বিশ্বনাথের পায়ে বল, জোনাল মার্কিংয়ে তাকে বল ছাড়ার সুযোগ দিচ্ছেন না নেপালের তিন ডিফেন্ডার। এ যেন ম্যাচের প্রতীকী ছবি। শনিবার রাতে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে -বাফুফে

সেই নেপাল, সেই শহীদুল আলম সোহেল। দিল্লি-নীলফামারী থেকে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামÑ ৭ বছর পর ‘জঘন্য গোল’ ভূত ভর করেছিল গোলরক্ষক সোহেলের ওপর! প্রায় মাঝমাঠ থেকে বিমল ঘাত্রির বাম পায়ের ফ্রিকিকের বল আয়েশিভাবে ধরতে গেলেন গোললাইনে দাঁড়ানো সোহেল, আত্মবিশ্বাসের অভাবে পারলেন না, গোল! আসলে কী করতে চেয়েছিলেন, বোঝা গেল না। নির্দ্বিধায় দেশের জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে গোল, সাক্ষী থাকলেন ২৫ হাজার দর্শক। ২০১১ দিল্লি সাফেও নেপালকে এমন গোল উপহার দিয়েছিলেন তিনি, সেবার ঠিক এ পজিশন থেকে শট ছিল সাগর থাপার। নীলফামারীতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও তিনি বাজে গোল হজম করে ডুবিয়েছেন দেশকে। গেল দুটি ম্যাচেও এক-দুটি সেভ দিলেও কাল গোটা জাতির সর্বনাশ করেছেন, যেটি ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠেছিল। প্রভাব পড়েছে গোটা দলে। ফলে সেমিফাইনাল খেলার লক্ষ্য নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও থামতে হলো গ্রুপ পর্বে।
২-০ গোলে বাংলাদেশকে হারিয়ে ‘এ’ গ্রুপ সেরা হয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে নেপাল; গোলগড়ে সঙ্গী পাকিস্তান। দুই ম্যাচ জিতে ৬ পয়েন্ট পেলেও টানা চতুর্থ সাফে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিল বাংলাদেশ। অথচ শেষ চারে খেলার দারুণ সুযোগ ছিল। হার এড়ালেই চলত। সেখানে কিনা ২ গোলে হার! এখন অন্যরা সোনালি ট্রফির জন্য খেলবেন, বাদশা, সাদ, সুফিলরা থাকবেন দর্শক।
তবে সাফ ব্যর্থতা কাল রাতেই ভুলে যেতে চাইলেন ব্রিটিশ কোচ জেমি ডে; গণমাধ্যম পর্ব শেষে লিফটে ওঠার আগে বলেন, ‘সাফ অধ্যায় এখানেই শেষ। যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন আমাদের ভাবতে হবে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ নিয়ে।’ ১ অক্টোবর ঘরের মাঠে শুরু হতে যাওয়া টুর্নামেন্টে শেষ চারে খেলতে চান কোচ। যোগ করলেন, ‘দুর্ভাগ্য দুই ম্যাচ জিতে ৬ পয়েন্ট পেলেও গোলগড়ে শেষ চার খেলতে পারলাম না আমরা, আর অন্য গ্রুপে এক ম্যাচ জিতেই শেষ চারে খেলছে!’
এভাবে হার মানতে পারছিলেন না জামাল ভুইয়া, সতীর্থরা যখন নিজেদের হতাশা (নাকি ক্লান্তি?) বোঝাতে মাঠে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ঘাসে গা এলিয়ে দিয়েছিলেন অধিনায়ক তখন হনহন করে হাঁটা ধরেছেন ড্রেসিংরুমের দিকে। চোখ দিয়ে দরদর করে পানি ঝরছিল, দর্শকের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নিচু মাথা তুলতে পারছিলেন না কষ্টে। শেষ বাঁশির পর অন্তত ১০ মিনিট পোস্টের নিচে জগদ্দল পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার ভুলেই তো বাংলাদেশের সর্বনাশ।
শহীদুলের ভুল প্রসঙ্গে ব্রিটিশ কোচ জেমি ডে বলেন ‘এটা সাধারণ একটা ক্যাচ ছিল। সে ধরতে পারত, ধরা উচিত ছিল; কিন্তু এটাই ফুটবল।’ ম্যাচে এর প্রভাব পড়েছে কিনাÑ প্রসঙ্গে জেমির কথা, ‘এখানে এ ধরনের বিষয় হতে পারে। আমার কাছে মনে হয়, এটাই ফুটবল। সবাই শুধু নেতিবাচক কথা বলছে, ম্যাচে সুফিল-জামালরা যে চেষ্টা করেছে, কেউ বলছে না।’ তার অনুযোগ, ‘পাঁচ দিনে তিন ম্যাচ খেলেছে ছেলেরা। কিছুটা প্রভাব হয়ত পড়েছে।’
শহীদুলের ভুলে কাজ সহজ হয়েছেÑ ম্যাচ শেষে স্বীকার করেছেন নেপালের সহকারী কোচ কিরন শ্রেষ্ঠা, ‘প্রথম গোলই টার্নিং পয়েন্ট। এমন গোল প্রত্যাশা করিনি। তখনই আমাদের জন্য কাজ সহজ হয়ে যায়।’ অথচ বিকালে ভুটানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে তাদের চাপে ফেলেছিল পাকিস্তান, স্বাগতিকদের বিপক্ষে ম্যাচ হয়ে ওঠে ‘বাঁচা-মরার’। ২৫ হাজার দর্শকের সামনে চাপমুক্ত খেলেন নেপালিরা। সহকারী কোচের কথা, ‘স্বাগতিকদের বিপক্ষে তাদের মাঠে খেলা কঠিন ছিল কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী সফল হয়েছি।’
শুরু থেকে বেশ গোছানো ফুটবল খেলেছে তারা; পাসিংগুলো প্রায় নির্ভুলই ছিল বলা চলে। বল পেলে ধরে রাখতে চেয়েছে, ছোট ছোট পাসে বিল্ডআপ গেম খেলার চেষ্টা করেছে। উল্টো চিত্র ছিল স্বাগতিকদের। রানিং-পাসিং কিছুই পেশাদার ফুটবলারদের মতো ছিল না, স্নায়ুর চাপে থেকে সবার মধ্যে ছটফটেভাব ছিল লাল-সবুজ ফুটবলারদের মধ্যে; বল পেলেই লং শট নিয়ে নিজেদের খেলাটা অগোছালো প্রমাণ করেছে, কখনও প্রতিপক্ষের পায়ে বল জমা পড়েছে।
তবে প্রথমার্ধে মিনিট বিশেক প্রেসিং ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বার কয়েক সফলও হয়েছে। কিন্ত কাক্সিক্ষত গোল পায়নি, বরং প্রতিপক্ষকে একটি গোল উপহার দিয়েছে। তাতেই পাকিস্তানকে সঙ্গী বানিয়ে শেষ চারে নেপাল।
ইউরোপিয়ান রণকৌশলে ১-০ ব্যবধানকে ২-০ করতে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে প্রতিপক্ষ চাপে রাখতে চেয়েছে নেপালি কোচ বালগোপাল মহারজন। তাই বিমল, ভারত, সুনীলকে সামনে রেখে আক্রমণাত্মক খেলা শুরু করে। তবে জনি, বিপলু, সাদকে তুলে ইমন, সোহেল রানা ও শাখাওয়াত রনিকে নামানোর পর ছক পাল্টে ফেলেন নেপালি কোচ, মিডফিল্ড দখলে রাখতে ৪-৪-২ করেন; শেষ ১৫ মিনিট তো ৫-৪-১ ছকে ঢুকে যায় হিমালয়ের ফুটবলাররা। পাঁচ ডিফেন্ডারের দুর্ভেদ্য দেয়াল ভাঙতে পারেননি স্বাগতিক ছেলেরা। প্রতিপক্ষের গোলে ভালো একটি শটও নিতে পারেননি সুফিল, সোহেল, রনিরা।
ফরোয়ার্ডদের ব্যর্থতার মানতে নারাজ কোচ জেমি ডে, ম্যাচ হারের পর সবাই ব্যর্থতা দেখছে, আমরা যে দুই ম্যাচে ৩ গোল করেছি, সেটা কেউ বলছে না।’ ভুটানের বিপক্ষে গোল করেছিলেন তপু ও সুফিল; পাকিস্তান ম্যাচে তপু। ২ গোল করা তপু ডিফেন্ডার, তার ওপর এতটা নির্ভরতা তৈরি হয়েছিল কোচের, যে শেষ ৫ মিনিট তাকে স্ট্রাইকার পজিশনে রাখেন!
কিন্তু শুধু ভালো খেলা না, ম্যাচ জিততে যে ভাগ্য লাগে সেটা শেষ মিনিটে দেখালেন নেপালের নবযুগ শ্রেষ্ঠা; প্রতি আক্রমণে ওয়ালী ও বাদশাকে ছিটকে বক্সে ঢুকে প্লেস করেন, সাইডপোস্টে লেগে বল জালে। ২০১৬ সালে থিম্পুতে হওয়া ভুটান বিপর্যয় ভুলে দেশের ফুটবলে নতুন দিনের আলো দেখা গেলেও ২৩ মাস পর আবার হোচট! দেশের ফুটবল, ফুটবলারদের মান যে এ পর্যন্তÑ আরেকবার বোঝালেন নেপাল ম্যাচে!
বাংলাদেশ : সোহেল, তপু, বাদশা, ওয়ালী, বিশ্বনাথ, জামাল, মামুনুল, জনি (ইমন), বিপলু (সোহেল রানা), সাদ (রনি) ও সুফিল।