আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এক বছরের সাফল্য

ড. মো. আনোয়ার হোসেন
| সম্পাদকীয়

স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। এরই সফল বাস্তবায়ন করেছেন তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে মহান সংসদে একটি আইন পাস হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য বেছে নেন শাহজাদপুর রবীন্দ্রনাথের জমিদারি এলাকাকে। এটি শাহজাদপুরবাসীর জন্য আশীর্বাদও বটে। এই তো বছর খানেক আগে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সফল বাস্তবায়নের নিমিত্তে মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১৫ জুন ২০১৭ তিনি উপাচার্য হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশে শুভযাত্রা শুরু করেছিলেন। তারপর এক পা দু-পা করে এগুতে এগুতে এখন বিশ্ববিদ্যায়ের দৃশ্যমান অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। অনেকেরই নেগেটিভ ধারণা ছিল যে, খুব সহজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে পারবেন না নবনিযুক্ত উপাচার্য। তার কারণ যেখানে কোনো অবকাঠামোর ব্যবস্থা নেই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা ১৫ থেকে ২০ ফুট পানির নিচে থাকে বছরের প্রায় ৫ থেকে ৬ মাস, সেখানে কী করে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হবে। এছাড়া প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণপূর্বক উপাচার্য নিয়োগের নজির থাকলেও এক্ষেত্রে ঘটেছে তার উল্টোটা। কিন্তু সব বাধাবিপত্তি পেছনে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর বিশ্বজিৎ ঘোষ তার নিযুক্ত একদল কর্মঠ ও অভিজ্ঞ অফিস স্টাফ, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সুধীজনকে সঙ্গে নিয়ে মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই শাহজাদপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র অধ্যয়ন বিভাগ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগ এবং অর্থনীতি বিভাগসহ তিনটি বিভাগ খোলা হয়। উপাচার্য যোগদানের পরপরই রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এর প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ সুচারুরূপে সম্পন্নের জন্য রেজিস্ট্রার হিসেবে বাংলা একাডেমির সাবেক পরিচালক ড. আবদুল ওয়াহাবকে নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, নিয়োগের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেজিস্ট্রার দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যবরণ করেন। তিনিও বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে অনেক শ্রম, মেধা ও মনন ব্যয় করেছেন। পরবর্তীকালে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. সোহরাব আলীকে উপাচার্য রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। তিনিও বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে ট্রেজারার হিসেবে নিযুক্ত আছেন রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর মো. আবদুুল লতিফ। বর্তমানে বিভিন্ন শ্রেণির পদে মোট ৩০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করছেন। উপাচার্য এরই মধ্যে তিনটি বিভাগে তিনজন করে মোট ৯ জন শিক্ষকও নিয়োগ করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ পরিচালনার জন্য আরও জনবল শিগগিরই নিয়োগ করা উচিত। 
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এর প্রয়োজনীয় জনবল এবং নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকার কারণে উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ও সহযোগিতায় ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে রবীন্দ্র অধ্যয়ন বিভাগ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগ এবং অর্থনীতি বিভাগে প্রথমবর্ষে মোট ১১৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করেছেন। প্রতিটি নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ই পুরানো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এটিও একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শাহজাদপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের নতুন ভবন, মওলানা ছাইফ উদ্দীন এহিয়া ডিগ্রি কলেজের একটি ভবন ও বঙ্গবন্ধু মহিলা ডিগ্রি কলেজের নবনির্মিত ভবনের একটি ফ্লোর নেওয়া হয়েছে। শাহজাদপুরের জনসাধারণ কী পরিমাণ শিক্ষানুরাগী হলে নিজেদের অসুবিধার কথা ভেবেও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন। এ জন্য কলেজগুলোর কর্তৃপক্ষ ও আপামর জনসাধারণকে কৃতজ্ঞতা জানানোই যায়। এছাড়া অন্য একটি ভবন ভাড়া করে তিনি ছাত্রীদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য একটি পাঁচতলা ভবনও ভাড়া করা হয়েছে। পত্রিকায় দেখলাম, ১৭ এপ্রিল ২০১৮ তারিখ ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবসে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির প্রথম বর্ষের পাঠদান শুরু হয়েছে। জানতে পারলাম, বিশ্ববিদ্যায়ের অফিসিয়াল ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় পুরো টিমটি একযোগে কাজ করছে। এ জন্য অবশ্যই অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ এবং তার টিম সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এক বছরের মধ্যে নবনিযুক্ত উপাচার্য হিসেবে তিনি শাহজাদপুর তথা সিরাজগঞ্জের গণমানুষের প্রাথমিক আকাক্সক্ষা পূরণে সফল হয়েছেন। 
এর আগে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়কে ভবিষ্যতে আমরা কেমন দেখতে চাই, এ প্রসঙ্গে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ১৩ জুলাই, ২০১৭ ‘রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ও আমাদের প্রত্যাশা’ শীর্ষক শিরোনামে ‘সমকাল’ পত্রিকায়। বর্তমানে দেশের এ কনিষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে কী কী করণীয় এ বিষয়ে আমার কিছু মতামত তুলে ধরছি। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেহেতু নিজস্ব ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাস (ডরমিটরি) নেই এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কোনো ভালো মানের ছাত্রাবাস গড়ে ওঠেনি, সে জন্য ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের জন্য কমপক্ষে দুটি বাসের ব্যবস্থা করা যা শাহজাদপুর থেকে হাটিকুমরুল এবং শাহজাদপুর থেকে বেড়া-কাশিনাথপুরের মধ্যে চলাচল করবে। এতে ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াতের ভোগান্তিটা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। দ্বিতীয়ত, আগামী ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে সম্ভব হলে আরও দু-তিনটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা। যুগোপযোগী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমনÑ কম্পিউটার সায়েন্স, ব্যবসায় প্রশাসন (বিবিএ), বাংলা, ইংরেজি, সংগীত ও নৃত্যকলা বিষয়ে অনার্স খোলা যেতে পারে। তৃতীয়ত, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে, সেহেতু মূল ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার দিকে এখন নজর দেওয়া দরকার। প্রাথমিক কাজের মধ্যে আগামী শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করা যেতে পারে। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আগামী ১০০ বছরের রূপকল্প নিয়ে মূল পরিকল্পনা (মাস্টার প্ল্যান) করে তারপর কাজ শুরু করা দরকার। এতে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ করা অনেকটাই সহজ হবে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় যেমনÑ বিলাতের অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজ এবং আমেরিকার হার্ভার্ডকে অনুসরণ করা যেতে পারে। একটা আধুনিক ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশাসনের মেধা, সততা, নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার বিকল্প নেই। উপাচার্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষের প্রজ্ঞাশাসিত ও গতিশীল নেতৃত্বে নবনিযুক্ত টিম শাহজাদপুরের গণমানুষের আকাক্সক্ষা পূরণে কাজ শুরু করেছে এবং ভবিষ্যতে একটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সফল হবেনÑ এই প্রত্যাশায় আমরা শাহজাদপুরবাসী। 
 
ড. মো. আনোয়ার হোসেন 
অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়