আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

চিকিৎসকের এ কেমন প্রতারণা

মো. মামুন চৌধুরী, হবিগঞ্জ
| প্রথম পাতা

শিশু ইসমত নাহার জিবা ও ডা. এএইচএম খায়রুল বাশার

বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই চিকিৎসকদের অবহেলা, ভুল চিকিৎসা ও অব্যবস্থাপনায় রোগীর চরম ক্ষতি এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হয়। এ নিয়ে শুরু হয় তোলপাড়। নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। কিন্তু তার পরও আর্তমানবতার সেবার মুখোশ পরে থাকা অর্থলোভীরা থেমে নেই। নানাভাবে রোগী জিম্মি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন অসাধু চিকিৎসকরা। এমনই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের আউশকান্দি বাজারের অরবিট প্রাইভেট হসপিটালের চিকিৎসক ডা. এএইচএম খায়রুল বাশার। তিনি জিবা নামের এক শিশু সুস্থ হওয়ার পরও অর্থের লোভে ‘উন্নত’ হসপিটালের আরেক চিকিৎসকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। দুই চিকিৎসকের মোবাইল ফোনে কথোপকথনের কল রেকর্ডে বিষয়টি ধরা পড়েছে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে একটি চক্র মরিয়া হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের ফুলতলী বাজার এলাকার বাসিন্দা প্রাণ কোম্পানির শ্রমিক রুবেল মিয়া ও শিরিনা আক্তারের ৪০ দিন বয়সি শিশু ইসমত নাহার জিবার ঘন ঘন হেঁচকি হচ্ছিল। শিশুটিকে মা শিরিন আক্তার ৩১ আগস্ট সকালে নিয়ে যান স্থানীয় আউশকান্দি বাজারের অরবিট হসপিটালের নবজাতক ও শিশু-কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এএইচএম খায়রুল বাশারের কাছে। ওই ডাক্তার ৫০০ টাকা ভিজিট রেখে কিছু ওষুধ লিখে দেন এবং পরদিন শিশুটিকে আবার নিয়ে দেখানোর পরামর্শ দেন। পরদিন শিশুটিকে নিয়ে গেলে তিনি (ডা. খায়রুল বাশার) শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক উল্লেখ করেন। টাকার দিকে না তাকিয়ে দ্রুত মৌলভীবাজারের মামুন হসপিটালে ভর্তি করে সেখানের ডা. বিশ্বজিতের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। তাকে ওই ডাক্তারের সঙ্গে ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়ার জন্যও বলেন তিনি। আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও শিশুর প্রাণ রক্ষার্থে দ্রুত মৌলভীবাজার ছুটে যান মা শিরিনা আক্তার। সেখানে যাওয়ার পর খুঁজে বের করেন ডা. বিশ্বজিতকে। মোবাইল ফোন দিয়ে তাকে কথা বলিয়ে দেন ডা. খায়রুল বাশারের সঙ্গে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডা. বিশ্বজিত মোবাইল ফোনে ডা. খায়রুল বাশারকে জানান, শিশু জিবা পুরো সুস্থ আছে। কিন্তু এ সময় জিবাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দেন ডা. খায়রুল। সে অনুযায়ী রাতে ওই হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করা হয়। শিরিনা আক্তারের মোবাইল ফোনে অটো কল রেকর্ড অ্যাপস ইনস্টল করা ছিল। পরে তিনি দুই ডাক্তারের বক্তব্য শোনেন। মোবাইল ফোনে তাদের কথোপকথনে তার মনে নানা সন্দেহ দানা বাঁধে।
মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডে দুই চিকিৎসকের কথোপকথন :
ডা. বিশ^জিত : ‘দুলাভাই তোমার রোগী তো খুবই ভালা আছে। কোনো সমস্যা নাই, মা কান্দতে কান্দতে শেষ’। ডা. খায়রুল বাশার : ‘আমি তো জানি রোগী ভালা, ভালা ভোলা কওয়ার দরকার নাই, ভালা জীবনেও কইছ্ না, ক রোগী খারাপ আছে, ভর্তি করে রাখ, ভালো করে চিকিৎসা দে। ইনজেকশন-টিনজেকশন মার। নাইলে শান্তি হইতো নায়।’ এসব কথা বলে হেসে হেসে ফোন রেখে দেন ডা. বিশ্বজিত। তাদের কথাবার্তায় সন্দেহ হওয়ায় পরদিন ক্লিনিক থেকে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু জীবন রক্ষা যাদের কাজ, তাদের একজনের এমন কাজে বিস্মিত হয়ে পড়েন তিনি। মোবাইল ফোনের এমন রেকর্ড শুনে চোখ কপালে উঠে যায় শিরিনার। তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চায় শুধু আতি (হেঁচকি) দিচ্ছিল। এজন্য আমি বাচ্চাকে নিয়ে আউশকান্দি অরবিটের ডা. খায়রুল বাশার স্যারের কাছে যাই। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু ওষুধ লিখে দেন। পরে উনার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর দিয়ে বলেন রাতে কল দিয়ে বাচ্চার অবস্থা জানানোর জন্য। রাতে ফোনে অবস্থা জানানোর পর তিনি মৌলভীবাজারের মামুন হসপিটালের ডা. বিশ্বজিতের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এ সময় তিনি শিরিনা আক্তারকে বলেন, সেখানে গিয়ে ডা. বিশ্বজিতকে বলবেন কল দেওয়ার জন্য। রাত ১২টার দিকে আদরের শিশুটিকে নিয়ে গিয়ে আমার মোবাইল দিয়ে কল দেই। তারা দুইজন কথা বলেন। এর আগেই বাচ্চাকে পরীক্ষা করেন ডা. বিশ্বজিত। পরে ওই প্রাইভেট হসপিটালের ভিআইপি রুমে ভর্তি করা হয়।’ ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়েন শিরিনা আক্তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ডাক্তারের কাছে মানুষ যায় শান্তির জন্য, কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে এমন প্রতারণা করছেন যা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমি গরিব মানুষ, এত টাকা ঋণ করে নিয়ে গিয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়ে পরে সিট কেটে বাড়ি ফিরছি।’ ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি জানিয়েছি, হাঁটতে হাঁটতে স্যান্ডেল ছিঁড়েছি, কিন্তু বিচার পাইনি।’ চিকিৎসার নামে এমন প্রতারণার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন শিরিনা।
সেবার নামে চিকিৎসকের এমন মুনাফালোভী দৃষ্টিভঙ্গিতে হতবাক এলাকাবাসীও। এ ঘটনায় সাধারণ রোগীদের মনেও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। তারা মনে করেন, চিকিৎসকদের এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ওই হসপিটালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মুশফিকা বেগম নামের এক নারী বলেন, ‘আমাদের শিশু-কিশোরের কোনো সমস্যা হলে চিকিৎসার জন্য আমরা ডাক্তারের কাছে আসি। কিন্তু টাকার লোভে চিকিৎসকরা যদি এমন প্রতারণা করেন, তাহলে চিকিৎসকের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস উঠে যাবে।’
শিফা বেগম নামের আরেক নারী বলেন, ‘আমি আমার শিশুকে নিয়ে এসেছি চিকিৎসা করাতে, কিন্তু এ চিকিৎসকের এমন কুকর্ম শুনে আমি অবাক। একটা জীবিত সুস্থ শিশুকে মৃত্যুর কোলে ঢেলে দিচ্ছেন। এটা তো কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র হতে পারে না, এটা পুরোই কসাইখানা।’
এ ব্যাপারে শুক্রবার সকালে অরবিট হসপিটালে গেলে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে চেম্বার রেখে অন্যত্র অবস্থান নেন ডা. এএইচএম খায়রুল বাশার। প্রথমে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি না হলেও মোবাইল ফোনে তার হসপিটালের পরিচালক ও স্থানীয় চেয়ারম্যান মহিবুর রহমান হারুনকে ডেকে আনেন চেম্বারে। এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন, ওই শিশুকে হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিয়েছেন মাত্র।
এ ব্যাপারে অরবিট হসপিটালের পরিচালক চেয়ারম্যান মহিবুর রহমান হারুন বলেন, ‘প্রায় ১২ বছর ধরে নবজাতক ও শিশু-কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এএইচএম খায়রুল বাশার অরবিটে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ৩১ আগস্ট জিবা নামের ওই শিশুকে তার মা এখানে নিয়ে এলে তাকে সিলেট প্রেরণ করেন। কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় মৌলভীবাজার নিয়ে যান। পরে এ ঘটনার পর তিনি শিশুর বাবার সঙ্গেও মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন বলেও জানান। এছাড়াও ওই চিকিৎসক গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কনসালটেন্ট।
তবে এ ঘটনাকে ধিক্কার জানিয়ে অন্য চিকিৎসকরা বলছেন, মোবাইল ফোনে যে আলাপ হয়েছে তা চিকিৎসার নৈতিকতা বিবর্জিত। 
এ প্রসঙ্গে সিলেট নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামাল আহমদ বলেন, কল রেকর্ডটি শুনে খুবই খারাপ লেগেছে। একজন চিকিৎসক এরকম মন্তব্য করতে পারেন না। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন নবীগঞ্জের সচেতন মহল। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। এসব অসাধু চিকিৎসকের কারণে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা উঠে যাচ্ছে। চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।