আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

খালেদার চিকিৎসায় হবে মেডিকেল বোর্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রথম পাতা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নেতাদের সাক্ষাৎ

বিএনপির পক্ষ থেকে ইউনাইটেড 
অথবা এ্যাপোলো হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করার জন্য আবেদন করা হয়েছে

প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ কামনা

কারাগারে এজলাস বসানো এবং ‘অসুস্থ থাকার পরও’ তার বিচার বিষয়ে আপত্তি জানাতে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেছেন তার জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা

চিকিৎসার নির্দেশনা চেয়ে রিট

ইউনাইটেড বা বিশেষায়িত হাসপাতালে খালেদাকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য শিগগিরই মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এ মেডিকেল বোর্ড যা সুপারিশ করবে, সে অনুযায়ী খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রোববার সচিবালয়ে বিএনপির প্রতিনিধি দল মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র সচিব ও কারা মহাপরিদর্শককে (আইজি প্রিজন) মেডিকেল বোর্ড গঠনের এ দায়িত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকের সময় বিএনপির নেতারা অসুস্থ খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান। এদিকে দেশের বিশেষায়িত কোনো হাসপাতালে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার নির্দেশ চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। একই দিন খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবীরা হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট আবেদন করেন। এছাড়া জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার কাজের জন্য কারাগারের ভেতরেই আদালত বসানো নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে নালিশ করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। একই দিন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির খাস কামরায় গিয়ে সাক্ষাৎ করে এ নালিশ করেন।

সচিবালয়ে বৈঠক শেষে আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপির পক্ষ থেকে একটি লিখিত আবেদন দেওয়া হয়েছে। এতে তারা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা উল্লেখ করে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতাল অথবা এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসার কথা বলেছেন।’ তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া আর্থ্রাইটিসসহ আরও কিছু রোগে আগে থেকেই ভুগছিলেন। আজকে (রোববার) বিএনপির এ প্রতিনিধি দল যাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজি প্রিজনকে দায়িত্ব দিয়েছি। তারা খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও সরকারি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করবেন। তারা খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার ব্যাপারে যে সুপারিশ করবেন, আমরা তাই করব।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কারাবিধি অনুযায়ী কারাবন্দিদের কোনো প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ নেই। তারপরও মেডিকেল বোর্ড যে সুপারিশ করবে আমরা তাই বিবেচনা করে দেখব। আমার জানা মতে, সরকারি হাসপাতালগুলোয় দেশের সর্বোচ্চ ও ভালো মানের চিকিৎসা হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সব এখানেই বসেন।’
এর আগে খালেদা জিয়াকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, তখন কারাবিধির লঙ্ঘন হয়েছিল কিনাÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘ওই সময় মির্জা ফখরুলসহ অন্যরা প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। সেটা হয়েছিল আদালতের নির্দেশে। আদালত যদি কারও চিকিৎসার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দেন, সরকার সেটাই পালন করে থাকে। খালেদা জিয়ার ব্যাপারেও এমন কোনো নির্দেশনা এলে আমরা সেটা বিবেচনা করে দেখব।’ সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মেডিকেল বোর্ড শিগগিরই গঠন করা হবে। তবে ঠিক কবে বোর্ড গঠন করা হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় অসুস্থ খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য দ্রুত ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান বিএনপির নেতারা। বৈঠকের পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ আছেন। তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এসেছিলাম।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে অনুরোধ করেছি, দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে যেন তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আমরা ইউনাইটেড হাসপাতাল যেটা তিনি পছন্দ করেন, সেই হাসপাতালে নেওয়ার জন্য তাকে (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) অনুরোধ করেছি।’
ফখরুল ইসলাম বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যারা দায়িত্বে আছেনÑ মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইজি প্রিজনসহ অন্যদের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কবে ব্যবস্থা নেবেন, এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বিএনপির মহাসচিব বলেন, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে তিনি কিছু বলেননি। বলেছেন যে আজই (রোববার) ওই সভাটা করবেন। বিকাল ৩টার সময় সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করে বিএনপির সাত সদস্যের প্রতিনিধি দল। ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপির এ প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়। বৈঠক শুরুর এক পর্যায়ে কারা মহাপরিদর্শক মেজর জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। 
হাইকোর্টে রিট : দেশের বিশেষায়িত কোনো হাসপাতালে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার নির্দেশ চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। রোববার খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবীরা হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট আবেদন করেন। কারাগারে বিশেষ আদালতে বসিয়ে খালেদা জিয়ার বিচার করতে গেল মঙ্গলবার প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়Ñ বকশীবাজার এলাকার সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার ও সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন মাঠে নির্মিত এলাকাটি জনাকীর্ণ থাকে। সেজন্য নিরাপত্তাজনিত কারণে বিশেষ জজ আদালত-৫ নাজিমউদ্দিন রোডের পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রশাসনিক ভবনের ৭ নম্বর কক্ষকে আদালত হিসেবে ঘোষণা করা হলো। পরের দিন শুনানিতে উপস্থিত হয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি অসুস্থ। পা ফুলে যায়। আপনারা যা ইচ্ছা রায় দেন। আমি আর আসতে পারব না।’ পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরাও তার সঙ্গে দেখা করে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো না দাবি করে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন এবং খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধান বিচারপতির কাছে নালিশ : খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিচার কাজের জন্য কারাগারের ভেতরেই আদালত বসানো নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে নালিশ করেছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। রোববার সকালে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির খাস কামরায় গিয়ে সাক্ষাৎ করে এ নালিশ করেন। আইনজীবীদের মধ্যে ছিলেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, ব্যারিস্টার বদরোদ্দোজা বাদল প্রমুখ। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা মনে করেছি, সংবিধানের অভিভাবক হচ্ছে সুপ্রিমকোর্ট। আর সুপ্রিমকোর্টের অভিভাবক হচ্ছেন প্রধান বিচারপতি। সুতরাং, কারাগারে আদালত বসানোর বিষয়ে গেজেট নোটিফিকেশন ১৯ (বি) চ্যাপ্টার ১ সুপ্রিমকোর্ট অব বাংলাদেশ হাইকোর্ট রুলস ১৯৭৩ অনুসারে সুপ্রিমকোর্টের এখতিয়ার। সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে আলোচনা না করে সরকার এ ধরনের কোর্ট স্থাপনের প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে না। এ কথাগুলো আমরা বলেছি। এও বলেছিÑ মাননীয় প্রধান বিচারপতি আপনি এ জুডিশিয়ারির অভিভাবক। আমরা মনে করি, আপনার সুপ্রিমেসি এবং সুপ্রিমকোর্টের সুপ্রিমেসি অবশ্যই থাকতে হবে। আপনার সঙ্গে আলোচনা না করে রাতের অন্ধকারে এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জারি বিচার বিভাগের জন্য খুবই দুঃখজনক। কোনো বিচারালয় এভাবে স্থানান্তর করতে পারে না। আমরা বিশ্বাস করি, রাতের অন্ধকারে এ রকম একটি আদালত গেজেট করার জন্য আপনি অনুমতি দেননি। প্রত্যেকটি পয়েন্ট অনুযায়ী, আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে বলতে সক্ষম হয়েছি। প্রধান বিচারপতি ধৈর্য্যরে সঙ্গে সেটি শুনেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধান বিচারপতি আমাদের বিষয়টি যেভাবে শুনেছেন তিনিও চান বিচার বিভাগের সুপ্রিমিসি থাকবে এবং প্রধান বিচারপতি আমাদের নালিশ গ্রহণ করেছেন। আমরা আশাবাদী, তিনি বিষয়টি বিবেচনা করবেন। প্রধান বিচারপতি আমাদের বলেছেন, আমি এটা দেখব। আমার ক্ষমতাবলে, মাসদার হোসেন মামলার আলোকে এবং ১৯ বি অনুযায়ী আমার যেটুকু ক্ষমতা আছে, সে অনুযায়ী আমি বিষয়টি বিবেচনা করব।’
খালেদার আইনজীবীরা আইন জানেন না : আইনমন্ত্রী : কারাগারের ভেতরে বিশেষ আদালত স্থাপন আইনের লঙ্ঘন বলে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা যে দাবি করেছেন, সে বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘উনারা (খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা) যদি এ রকম কথা বলে থাকেন তাহলে আমি বলব, উনারা আইন জানেন না।’ রোববার দুপুরে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে খাস কামরায় ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ঈদের পর সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলাম। পারিবারিক কারণে এতদিন (ঈদের পর) দেখা করতে পারিনি। আজকে মনে করলাম, ঈদের সাক্ষাৎ করা দরকার।’ খালেদা জিয়ার বিচারে কারাগারে আদালত বসানো নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে আইনজীবীদের নালিশ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘উনারা (খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা) যদি কারাগারে আদালত স্থাপনে আইনের লঙ্ঘনের কথা বলে থাকেন, তাহলে আমি বলবÑ উনারা আইন জানেন না।’
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদ- দেন বিচারিক আদালত। একই সঙ্গে তার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ পাঁচ আসামিকে ১০ বছরের কারাদ- এবং প্রত্যেকের ২ কোটি ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। রায়ের পর থেকে খালেদা জিয়া নাজিম উদ্দিন রোডের পুরানো কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি আছেন।