আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১০-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

সাফল্যের ধারায় হাবিপ্রবি

কামরুল হুদা হেলাল
| শেষ পাতা

প্রফেসর ড. মু. আবুল কাসেম, ভিসি, হাবিপ্রবি

দিনাজপুরে ২০০০ সাল থেকে একাডেমিক কার্যক্রমের যাত্রা শুরু হয়েছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি)। প্রফেসর ড. মু. আবুল কাসেম ভিসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও সার্বিক উন্নয়নে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। আগামীদিনের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও একাডেমিক উৎকর্ষতা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন আলোকিত বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কামরুল হুদা হেলাল

আলোকিত বাংলাদেশ : ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কোন বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন?

প্রফেসর ড. মু. আবুল কাসেম : দেখুন, আমি একজন শিক্ষক ও গবেষক। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি করার বিষয়টি আমি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছিলাম। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কাজকেও এগিয়ে নিতে হয়েছে। কারণ প্রশাসনিক গতিশীলতা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

 দায়িত্ব নেওয়ার পর কোন ইস্যু আপনাকে কঠিনভাবে মুখোমুখি করেছিল?

 আমার যোগদানের আগে দীর্ঘ চার মাস ভিসি হিসেবে কেউ দায়িত্বে ছিলেন না। যার জন্য প্রশাসনিক অনেক কাজ জমেছিল, যা আমাকে অল্প সময় করতে হয়েছিল। একাডেমিক কাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষা ও ভর্তি। কাজটি সুন্দরভাবে সবার সহযোগিতায় সম্পন্ন করা হয়েছিল। এছাড়া প্রমোশন, চাকরি নিয়মিতকরণ প্রভৃতি বিষয়ের মতো কঠিন ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর সমাধান করা হয়েছিল।

 উত্তরবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে উচ্চশিক্ষার প্রসারে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন?

 হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞন ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি) অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি বিশ্ববিদ্যালয়। শুরু থেকেই যুগোপযোগী বিষয়ের ওপর শিক্ষা ও গবেষণা চালিয়ে আসছে। বর্তমানে এখানে স্নাতক পর্যায়ে ২২ ধরনের এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এমএস/এমবিএ ও পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধির জন্য আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি।

 বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গবেষণা ও গ্রন্থাগারের উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ আছে কি?

 শিক্ষাদান ও গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি অপরিহার্য দায়িত্ব। মানসম্মত গবেষণার জন্য দক্ষ শিক্ষকের পাশাপাশি প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের গবেষণা দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা থেকে প্রয়োজনীয় গবেষণা তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত আছে। ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের (আইআরটি) মাধ্যমে গবেষণার বাজেট প্রদান করা হয়। তবে গবেষণার জন্য বাজেট আরও বাড়ানো দরকার। সম্প্রসারিত লাইব্রেরিতে অনেক পুস্তক ক্রয় করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের জন্য সহায়ক হবে।
 শিক্ষার্থীদের আবাসন ও পরিবহন সুবিধা প্রদানে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন?
 বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এখানে বর্তমানে আটটি আবাসিক হল রয়েছে; যাতে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। যাতায়াতের জন্য ১৪টি বাস রয়েছে। আমরা সরকারের কাছে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছি। প্রকল্প পাস হলে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও নতুন হল তৈরি ও পর্যায়ক্রমে বাস ক্রয় করা হবে।
 নতুন কোনো বিভাগ খোলার পরিকল্পনা রয়েছে কি না?
হহ নতুন বিভাগ হিসেবে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। আশা করছি, সামনের সেশন থেকে স্নাতক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে। এছাড়া নতুন বিভাগ যেমনÑ পরিবেশ বিজ্ঞান, বায়োটেকনোলজি, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এবং ট্যুরিজম ও হোটেল ম্যানেজমেন্ট বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
 নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা করেছেন কি?
 পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়টি উপলব্ধি করে আমরা শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ব্যবস্থাপনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও প্রশাসনিক নানা বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছি। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান আছে এবং আগামীতে আরও জোরদার করা হবে।
 বিদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান প্রসঙ্গে কিছু বলবেন কী?
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক ছয়টি দেশের (দুই শতাধিক) বিদেশি শিক্ষার্থী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে। তাদের জন্য পৃথক ইন্টারন্যাশনাল হল তৈরি করার প্রকল্প প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কাজ করছে। এছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি নীতিমালা ও তাদের জন্য সেকশন তৈরির বিষয়টি একটি কমিটির সুপারিশের আলোকে আগামী একাডেমিক কাউন্সিল ও রিজেন্ট বোর্ড সভায় তোলা হবেÑ আশা করছি।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?
শিক্ষার্থীদের আমি সবসময় দক্ষ ও ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার পরামর্শ দেই। তাছাড়া শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক সমস্যার সমাধান করার জন্য আমরা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করি। তবে তাদেরও ধৈর্য সহকারে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের দাবিগুলো আমাদের জানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের কাজ ভালোভাবে পড়াশোনা করে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট হওয়া এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা।
 বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও উন্নত ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর ব্যাপারে আপনার কী পরিকল্পনা রয়েছে?
 আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারকে ধন্যবাদ দিতে চাই। কারণ তিনি দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের সহযোগিতা করে চলেছেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে উন্নয়নমূলক কাজগুলো চলছে, তা সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা আরও বৃদ্ধি পাবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাতে মানসম্পন্ন দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি হতে পারে, তার জন্য প্রথমে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়নÑ যার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নত একাডেমিক সিস্টেম গড়ে উঠবে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐঊছঊচ (ঐরমযবৎ ঊফঁপধঃরড়হ ছঁধষরঃু ঊহযধহপবসবহঃ চৎড়লবপঃ) এর মাধ্যমে ছয়টি অনুষদের জন্য ছয়টি সেলফ অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। সেলফ অ্যাসেসমেন্ট কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন ধরনের স্টেকহোল্ডারের মতামত নিয়ে আলাদা আলাদা রিপোর্ট প্রণয়ন করেছেন। আমার চেষ্টা থাকবেÑ রিপোর্টের সুপারিশগুলো যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক সিলেবাস কারিকুলাম প্রণয়ন করা। এছাড়া আমরা ক্যারিয়ার কাউন্সিল ও এন্ট্রাপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একজন শিক্ষার্থী যখন গ্র্যাজুয়েট হন, তখন তার ক্যারিয়ার কোনদিকে গেলে ভালো হবে বা ভালো সুযোগ রয়েছে, তা অনেক সময় তার পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব হয় না। এমনকি সবাই যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবেন, এমনটি নয়। ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে নবীন গ্র্যাজুয়েট যাতে তার মেধা ও দক্ষতার মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি অথবা দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান করতে পারে, তার দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। এ সেলের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা পৃথিবীর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রদত্ত স্কলারশিপ, ফেলোশিপ, অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ ইত্যাদি বিষয় অতি সহজে জানতে পারবে।
 বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করে বিভিন্নভাবে উত্তেজনা সৃষ্টির অশুভ প্রয়াসকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
নিয়মতান্ত্রিকভাবে সবার সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে চাই। প্রত্যাশা করি, সব বিভেদ ভুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের স্বার্থে সবাই ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করবেন এবং নিজ নিজ অবস্থানে থেকে কাজ করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আগামী দিনের সাফল্য ও সম্ভাবনার ব্যাপারে কিছু বলুন?
 বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি উচ্চমানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার প্রত্যয়ে দেশবাসীর বিশাল প্রত্যাশা ও অমিত সম্ভাবনা নিয়ে আজ থেকে ১৮ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু হয়েছিল। লক্ষ্য পূরণে এ প্রতিষ্ঠানের সবাই নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমাদের যেতে হবে আরও অনেক পথ। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য সমুন্নত রেখে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল শক্তির উন্মেষ ও বিকাশ ঘটিয়ে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে এ অঞ্চলের একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে উঠেছে। সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত রেখে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরলস প্রচেষ্টা ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সর্বশেষ উদ্ভাবিত জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং তথ্যভা-ার ব্যাপকভাবে আত্মীকরণ, চর্চা ও প্রয়োগের মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয় তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবেÑ আমাদের সবার প্রত্যাশা।
আলোকিত বাংলাদেশ : আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
প্রফেসর ড. মু. আবুল কাসেম : আলোকিত বাংলাদেশের প্রতিও রইল আমার কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।