আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

ড্রিমলাইনার : বিমানের তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক বিজনেস পরিকল্পনা ও কিছু প্রস্তাবনা

ওমর ফারুক মুত্তাকিন
| সম্পাদকীয়

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রাষ্ট্রীয় পতাকার গর্বিত বাহক। এ পতাকা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ড্রিমলাইনারও এখন বয়ে নিয়ে বেড়াবে বিশ্বের নানা দেশে। ব্যবসায়িক সুফল বয়ে নিয়ে আসতে এ ড্রিমলাইনার উড়ে বেড়াবে দেশ থেকে দেশান্তরে। 
আপনাদের এরই মধ্যে জানা হয়ে গেছে যে, ড্রিমলাইনার বিমান বহরে যুক্ত হয়েছে। ‘স্বপ্ন রেখা’ (উৎবধস খরহব) এঁকে দিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এ বিমান সুদূর আমেরিকা থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে। 
আপনারা আরও জেনেছেন যে, ড্রিমলাইনার বিমান বহরে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিমানযাত্রীরা এখন থেকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে আকাশে বসেই প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন।
এ সময়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এয়ারক্রাফট বিমান বহরে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বেশকিছু জিনিস প্রকাশ পেয়েছেÑ
১. উন্নত ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিমানযাত্রী পরিষেবা দিতে চায়।
২. প্রযুক্তিগত নীতি আগের মতো উন্নত ও আধুনিক।
৩. ব্যবসা ও যাত্রীসেবা উভয় প্রেক্ষাপটেই ড্রিমলাইনার ক্রয় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। 
বিশ্বজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তির এ জয়জয়কার সময়ে বিমান বহরে ড্রিমলাইনার যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিমানের যাত্রীসেবার মান অনেক উচ্চতায় পৌঁছে যাবে।
যে প্রযুক্তিগত নীতির প্রেক্ষাপটে বিমান ২০০৮ সালে এ ড্রিমলাইনার অর্ডার করেছিল, তা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী। যার প্রযুক্তিগত সুফল আজ বিমানের যাত্রীরা পাবেন। 
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দুনিয়াময় প্রথম যখন উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটে সবার আগে তার প্রভাব পড়ে এয়ারলাইন্স ইন্ডাস্ট্রিতে। সিস্টেমেটিক রিজার্ভেশন, অটোমেটেড চেকইনসহ নানা সুবিধাসংবলিত তথ্যপ্রযুক্তি আগে দিয়েছে এয়ারলাইন্স ইন্ডাস্ট্রিকে। বিমানও যথা তাড়াতাড়ি সেসব প্রযুক্তি তার সুন্দর ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে। আজও করে আসছে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এ ড্রিমলাইনার।
কিন্তু প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন এ বিমান কতটা উন্নত সেবা দিতে পারল আর কতটা মাশুল বাবদ খরচ করল, তার আনুপাতিক হিসাব এখন খুবই প্রশ্নবিদ্ধ। এ প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়টির উপলব্ধিতা বিমান নিয়ে পরিকল্পনাকারীদের বোধকে নাড়া দিতে পারেনি দীর্ঘ সময়েও। বিশ্বের জায়ান্ট এয়ারলাইন্সগুলো আগেই উপলব্ধি করে এক্সপেন্সিভ আইটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে গেছে একে একে। আজ তারা নিজস্ব সিস্টেমে রিজার্ভেশন, অনলাইন চেকইন, ব্যাগেজ হ্যান্ডেলারসহ সবধরনের কাজই করে। আমার জানা মতে, সর্বশেষ বের হয়ে গেছে থাই এয়ারওয়েজ ও মালায়েশিয়ান এয়ারলাইন্স। বাকিরা তো কত আগেই বের হয়ে গেছে। বিমান রয়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে এক্সপেন্সিভ ঝওঞঅ নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। 
ঝওঞঅ সম্পর্কে বলি। সারা বিশ্বে এয়ারলাইন্স ইন্ডাস্ট্রির তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক সুবিধার অধিকাংশই দিয়ে আসছে ঝওঞঅ নামক প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বজুড়ে যার রয়েছে শত শত কাস্টমার এয়ারলাইন্স। প্রতিবার ক্লিক হিসাব করে বিল করে দেয় এ প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বজুড়ে বিনাপয়সার যোগাযোগ ‘ই-মেইল’ এর ব্যবহার যখন তুঙ্গে, তখনও ঝওঞঅ ট্যালেক্সকে এখনও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ধরে পরিষেবা দিয়ে আসছে। যাতে ইচ্ছেমতো চার্জ করা যায়। বিমানও তার একচ্ছত্র বিজনেসের শিকার। আমার দেখা মতে, সিতার টখউ গধহধমবসবহঃ ঝুংঃবস একটি বস্তাপচা সফটওয়্যার। এ যুগে কেউ ফ্রি দিলেও ব্যবহার করবে না। কারণ তারা ডাটা ইনসার্ট ভুল পদ্ধতিতে করছে, ট্যালেক্স রিড করে ডাটা ইনসার্ট করছে। এর টেকনিক্যাল সার্ভিসও মারাত্মক বাজে। আর তার জন্য সিতাকে দিতে হচ্ছে প্রায় অর্ধ লাখ টাকারও বেশি প্রতি মাসে। 
আপনারা শুনে অবাক হবেন যে, বিমান প্রতি মাসে সিতাকে সব সেবার জন্য গড়ে প্রায় ৩৭ হাজার ডলার পেমেন্ট করে শুধু প্রযুক্তিগত সেবার মাশুল হিসেবে। এ সেবা প্রযুক্তির পণ্যসহ নয়; কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সরবরাহসহ নয়। সহজ করে বলা যায়, বিমান কম্পিউটার কিনে দিয়েছে, আর সিতা তা শুধু ব্যবহার উপযোগী করে দিচ্ছে, ব্যবহারের লোকবল দিচ্ছে না, তাতেই এ উচ্চহার মাশুল।
সিতার একরোখা ব্যবসায়িক চার্জ সম্পর্কে বলে শেষ করা যাবে না। এ চার্জ মিনিমাইজ করে ব্যবসায় লাভ করাই হলো বিমানের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। 
বিমানকে শুধু দরকার কৌশল বদলানো। উচ্চহারের মাশুল কমাতেই কৌশল পরিবর্তন করা অতি জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, চিটিং পলিসি করে যারা বিমান থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত। শুধু পিএনআর তৈরি করে টিকিট ইস্যু না করেই এ প্রতিষ্ঠান কিছুদিন আগেও বিমান থেকে নিয়ে গেছে অমূল্য সম্পদ। এটা মারাত্মক নৈতিকতাবিরোধী কাজ। আর যাই হোক, এদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকতে পারে না। থাকা উচিত নয়।
অথচ অন্যান্য এয়ারলাইন্সের মতো বিমানও কৌশল পরিবর্তন করে বের হয়ে যেতে পারে সিতার এ করালগ্রাস থেকে। লাভবান হতে পারে প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ কমিয়ে এনে।
কীভাবে?
সহজ ভাষায় বলা যায়, অন্যান্য এয়ারলাইন্সের মতো করে। নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে, কৌশলগত কিছু পরিকল্পনা নিয়ে। হ্যাঁ, লোভী আর ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে প্রশ্ন আসবেই সেবার মান নিয়ে। কিন্তু সিতা থেকে সম্প্রতি বের হয়ে কি থাই এয়ার কিংবা মালায়েশিয়ান এয়ারলাইন্স সেবার মান খারাপ করেছে? মোটেও না। তথ্যপ্রযুক্তির সেবাদানকারী পরিবর্তন মানেই সেবার মান খারাপ হয়ে যাওয়া নয়। আর দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোই কি নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তিসেবা নিয়ে মান খারাপ করছে? কোনোভাবেই না।
আমি এত কিছু বুঝতাম না যদি ব্যাগেজ রিকন্সিলিয়েশন সিস্টেম নিয়ে কাজ না করতাম। চেকইন ব্যাগ প্রযুক্তির সহায়তায় সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর একটি সফটওয়্যার এটি। এটির এনালাইসিস ও ডিজাইন আমি করেছি। সফটওয়্যারটি যে দিন একজন বড় কর্মকর্তা আমাকে তৈরি করতে বলেন, সেদিন মূলত আমি জানতে পারি এমাডাস আর সিতা খুবই হাইরেটে দর দিয়েছে। যে দেশে ২ টাকার পণ্যও বার কোড স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে, সে দেশে একটা ব্যাগ স্ক্যান করতে সিতাকে দিতে হবে এত টাকা? এ-ও কি সম্ভব? 
এ দেশেই তৈরি হয় বিশ্বের বড় বড় সফটওয়্যার। এ দেশের প্রযুক্তিবিদরাই তৈরি করে সারা বিশ্বের ওপেন মার্কেটের উল্লেখযোগ্য সফটওয়্যার। তাহলে কেন বিমানের এসব সফটওয়্যার তৈরি সম্ভব নয়। এ দেশেই অনেক কিছু সম্ভব।
শুধু দরকার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ। ২০০৮ সালের পদক্ষেপের ফলে আজকের ড্রিমলাইনার এসেছে। তৎকালীন চিন্তা আর পদক্ষেপের চূড়ান্ত রূপ এই ড্রিমলাইনার। আর আজও যদি বিমান কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারে, তাহলে বিমানকে অনেক পিছে পড়তে হবে। বিমানের নিজস্ব আইটি বিভাগ আছে। সেখানেই বসে কাজ করতে পারে এভিয়েশন এক্সপার্ট সিস্টেম এনালিস্ট। কয়েকজন সফটওয়্যার ডেভেলপার। ইরসধহ-এর ব্যবসায়িক সুফল পাবে অনেক কাল।
আজও যদি বিমান পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আর কবে এ এয়ারলাইন্সের যাত্রীরা বাসায় বসেই অনলাইন চেকইন করবে? নিজস্ব অ্যাপসে বিমানযাত্রীরা কবে দেখবে তার বিমানের অবস্থান? আর কতদিন পর বিমানযাত্রীরা টাইম টু টাইম ফ্লাইট নোটিফিকেশন পাবে? ওয়েলকাম মেসেজ কিংবা ডিলে মেসেজ? আর কতকাল?
কিছুদিন আগেই বিমান চালু করেছে ঘরে বসে টিকিট ক্রয়ের সুবিধা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, এই ২০১৮ সালে এসে বিমান আবার কেন আরেকটা ম্যানুয়াল সিস্টেম চালু করল? তাহলে বিমানযাত্রীরা নিজেরাই অ্যাপস দিয়ে কবে ফ্লাইট এ বুকিং করবে? সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে পেমেন্টও করবে। আর মেইলে টিকিট চলে আসবে। এখনও কি বিমানযাত্রীরা এটা আশা করতে পারেন না? আবশ্যই পারেন। শুধু দরকার পরিকল্পনার। 
আমি বিমানের ট্রেইনিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়ে কাজ করেছি। কাজ করেছি পোস্ট ফ্লাইট এনালাইসিস নিয়ে। ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম আর ইউএলডি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়েও। এসব করতে গিয়ে আমি খুবই অসহায় বোধ করেছি তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে বিমানে পরিকল্পনাকারীর বড়ই অভাব দেখে। তথ্যপ্রযুক্তির শুভাকাক্সক্ষীর অভাব দেখে।
আর যাই হোক, আস্তে আস্তে বিমানের নিজস্ব সফটওয়্যার এ কাজ শুরু করা উচিত। সামনে অনেক কাজ বাকি। ডিজিটাল রোস্টারিং, ঐজগ, ঋওউঝ, অনলাইন চেকইন, স্পেশাল হ্যান্ডেলিং সিস্টেমসহ আরও কত কী। 
আশা করছি, বিমানে এই দিন থাকবে না। আজ ড্রিমলাইনার এসেছে একসময়ের সঠিক পদক্ষেপের ফলস্বরূপ। তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক সঠিক পদক্ষেপ আজ অতীব জরুরি। আজকের তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্রিক পরিকল্পনাই আগামী দিনের ব্যবসায়িক সফলতার মূল চাবিকাঠি। এটির অনুধাবন এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। হ

 ওমর ফারুক মুত্তাকিন

System Analyst & Microsoft Certified Professional-MCP-2007
G S Supervisor. Biman Bangladesh Airlines
[email protected]