আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

কী খেয়ে বাঁচবে দেশের মানুষ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
| সম্পাদকীয়

বিশুদ্ধ খাবার খুঁজে পাওয়া ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে। মাতৃদুগ্ধ ছাড়া বাজার থেকে কেনা কোনো খাদ্যই যেন আর বিশুদ্ধ নেই। জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য পানিও আজ দূষিত। জারের পানির মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশই জীবাণুপূর্ণ! এসব পানি পান করে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) এক রিপোর্টে জানা গেছে, বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত খাদ্যপণ্যে শতকরা ৪০ ভাগে ভেজালের সন্ধান মিলেছে, যার মধ্যে ১৩টি পণ্যে ভেজালের হার প্রায় ১০০ ভাগ। ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ৪৩ ধরনের খাদ্যপণ্যের মোট ৫ হাজার ৩৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে ২ হাজার ১৪৭টি নমুনাতেই মাত্রাতিরিক্ত ভেজালের উপস্থিতি ধরা পড়ে। এর মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত সয়াবিন তেলে ভেজালের হার শতকরা ৭৮ ভাগ, সরিষার তেলে ৫৬ ভাগ, পাম অয়েলে রয়েছে ৩২ ভাগ এবং নারিকেল তেলে সর্বনিম্ন ভেজালের পরিমাণ শতকরা ২৫ ভাগ। এছাড়া শতকরা ভেজালের পরিমাণ আটায় ১১ ভাগ, ময়দায় ৯ ভাগ, সুজিতে ২৭ ভাগ এবং বেসনে ৫২ ভাগ ও সেমাইয়ে সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ ভেজালের উপস্থিতি মিলেছে। চিনিতে ভেজালের পরিমাণ শতকরা ৫ ভাগ, আখের গুড়ে সর্বোচ্চ ৫৭ ভাগ, খেজুরের গুড়ে ২৫, লবণে ৩৬, চা পাতায় ১০ শতাংশ। কেকে শতকরা ৭০ ভাগ ও বিস্কুটে রয়েছে ৪৬ শতাংশ ভেজাল। 
মহাখালীর পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, দেশের শতকরা ৫৪ ভাগ খাদ্যপণ্যে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ভেজাল রয়েছে। ডিডিসির পরিসংখ্যান মতে, এ হার ৭৯ শতাংশ। ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধপত্র, নরমাল স্যালাইন সলিউশন বাজারে বিক্রি হওয়ার নজির রয়েছে। সম্প্রতি ইলেকট্রনিক সামগ্রীর আড়ালে চীন থেকে আমদানিকৃত ওষুধের মধ্যে রয়েছে মরণব্যাধি ক্যান্সারের নকল ওষুধও। পোলট্রিফার্মের ডিমে ট্যানারি বর্জ্যস্থিত বিষাক্ত ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। আটায় মেশানো হচ্ছে চক পাউডার বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট। কার্বাইডের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়ে কৃত্রিম উপায়ে পাকানো হচ্ছে কলা। আনারসে হরমোন প্রয়োগ করে অধিক মুনাফা লাভের প্রক্রিয়া চলে আসছে। আম গাছে মুকুল ধরা থেকে শুরু করে আম পাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে রাসায়নিক ব্যবহার এখন ওপেনসিক্রেট। মিষ্টিজাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হয় বিষাক্ত রং, সোডা, সেকারিন, মোম। মশলায় কাপড়ের বিষাক্ত রং, ইট ও কাঠের গুঁড়া মেশানো হয়। বিষাক্ত ফরমালিন দিয়ে মাছের পচনরোধ করা হচ্ছে। বাজারের নানা ফলেও কার্বাইড ও ফরমালিনের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের মতে, ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। একই কারণে দেশে প্রতি বছর ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ ও কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ। এমনকি বছরে প্রায় ১৫ লাখ মায়ের বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয় ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে হেপাটাইটিস, কিডনি, লিভার ও ফুসফুস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। ২০০৯ সালে ধামরাইয়ে ৩ এবং ২০১৩ সালে দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে বিষাক্ত খাবার গ্রহণের ফলে ১৪ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ২০১২ সালে দিনাজপুরের একটি বাগানের রাসায়নিক মিশ্রিত বিষাক্ত লিচু খেয়ে ১৪ শিশু মৃত্যুবরণ করে। ২০১৫ সালে একই জেলায় কীটনাশক মিশ্রিত লিচুর বিষক্রিয়ায় ৮ শিশুর প্রাণহানি ঘটে। বিষাক্ত প্যারাসিটামল খেয়ে শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
বাংলাদেশ পিওর ফুড অধ্যাদেশ ১৯৫৯ (সংশোধনী-২০০৫ আইনের ১৪বি) ধারায় সুস্পষ্ট বলা আছে, উৎপাদিত খাবার মানসম্মত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা জরিমানা ও ৬ মাসের কারাদ- বা উভয় দ- এবং সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ১ বছরের কারাদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হতে হবে। খাদ্যপণ্যে ভেজাল প্রতিরোধের মূল দায়িত্ব বিএসটিআইর। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, র‌্যাব, পুলিশসহ ছয়টি মন্ত্রণালয়ের ১০টি বিভাগ ভেজাল বন্ধের দায়িত্বে নিয়োজিত। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার স্বাস্থ্য বিভাগেরও এ ব্যাপারে ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অভাবে ভেজাল প্রতিরোধ কার্যক্রম সফল হচ্ছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামান্য জেল-জরিমানার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভেজাল পণ্য উদ্ধার ও পরীক্ষাসংক্রান্ত জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতায় ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা আজ থমকে গেছে। খাদ্যকে বিষমুক্ত রাখতে ‘ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ বিল-২০১৫’ নামে একটি বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়। এতে খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিনের ব্যবহার রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- এবং সর্বোচ্চ ২০ লাখ ও সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এ আইনে ফরমালিন বিক্রির দোকান সাময়িকভাবে বন্ধসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। আইন অনুসারে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়া ফরমালিন উৎপাদন, আমদানি, মজুত, বিক্রি, পরিবহন, এমনকি ব্যবহার বা দখলে না রাখার নির্দেশনা দেওয়া আছে। কিন্তু এসবের কার্যকারিতা খুবই সামান্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
খাদ্যপণ্যসহ যে কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যে ভেজালের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন ভোক্তারাই। অথচ ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯’ পুরোপুরি ভোক্তাবান্ধব নয়। ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষায় কী কী সুবিধা দেওয়া হয়েছে, এসব ভোক্তার অনেকেরই জানা নেই। ভেজালবিরোধী পদক্ষেপকে সফল করে তুলতে অভিযানকারী সংস্থাকে সর্বাত্মক আইনি ও আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ জনবল সংকট দূর করতে হবে। ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক ভেজাল শনাক্তকারী উপকরণ সরবরাহ করে অভিযান পরিচালনাকারীদের দিতে হবে সর্বোচ্চ লজিস্টিক সাপোর্ট। বাড়াতে হবে বাজার মনিটরিং। ভেজালের বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে জনসচেতনতা। খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোর অপসংস্কৃতিকে দেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সমাধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভেজাল প্রতিরোধে সরকারের ভেজালবিরোধী তৎপরতা জোরদার করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া ভেজালের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে অতি মুনাফালোভী, অসাধু খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার উদ্যোগ নিতে হবে। অবিলম্বে ভেজালের মূলোৎপাটন করতে না পারলে ভবিষ্যতে দেশবাসীকে পড়তে হবে মহাসংকটে। হ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
প্রাবন্ধিক ও গল্পকার