আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

তেহরান সম্মেলনের পর কী অপেক্ষা করছে

মহসীন হাবিব
| সম্পাদকীয়

ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত এবং ৮ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত তিন নেতার সম্মেলন শেষে ঘোষণায় জানা গেছে, সিরিয়ার শহর ইদলিবে বড় ধরনের অপারেশন বন্ধে কোনো আশ্বাস রাশিয়া ও ইরানের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান সমাপ্তি ঘোষণায় আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইদলিব শহরে একটি যুদ্ধবিরতি চেয়েছেন

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের দেশগুলোর আগুন নিভে গেছে। আইএস-আল কায়দার বড় ধরনের হামলা নেই, কথায় কথায় বিমান আক্রমণ নেই, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়া নেই, মৃত্যু নেই, শরণার্থী হয়ে ঘরছাড়া নেই, মিডিয়ায় উত্তেজনাকর শিরোনাম নেই, আমেরিকা-ইরানের হুমকি-পাল্টা হুমকি নেই, রাশিয়া-আমেরিকার রণতরীসজ্জা নেই। কিন্তু এসব নেই এর কারণে যদি আমরা ধরে নিই যে সবকিছু শান্ত হয়ে গেছে, তা হবে চরম বোকার ভাবনা। বাস্তবতা হলো, ছাইয়ের নিচে ভয়ানক আগুন লুকিয়ে আছে। আর সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রাশিয়া, ইরান এবং তুরস্কের শীর্ষ নেতাদের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার মধ্য দিয়ে। ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত এবং ৮ সেপ্টেম্বর সমাপ্ত তিন নেতার সম্মেলন শেষে ঘোষণায় জানা গেছে, সিরিয়ার শহর ইদলিবে বড় ধরনের অপারেশন বন্ধে কোনো আশ্বাস রাশিয়া ও ইরানের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান সমাপ্তি ঘোষণায় আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইদলিব শহরে একটি যুদ্ধবিরতি চেয়েছেন। অনুরোধ করেছেন, ইদলিবে বড় আকারের অপারেশন চালালে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তুরস্ক। কারণ সেখানকার শরণার্থীরা তুরস্ক সীমানার ভেতর ঢুকে পড়বে, যা বহন করা এখন তুরস্কের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি তাতে সম্মত হননি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইদলিব থেকে সন্ত্রাসীদের হটানোই হলো পূর্বশর্ত। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেছেন, জাতিসংঘ ঘোষিত সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কোনো প্রতিনিধি এ আলোচনায় নেই। সুতরাং যুদ্ধবিরতি কার সঙ্গে? 
সিরিয়ার ইদলিব শহরকেই প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদবিরোধী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে এখন ব্যবহার করছে। এই শহরে এখন ৩৫ লাখ সাধারণ মানুষ বাস করে। এত লোক এ এলাকায় কখনোই ছিল না। সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত আলেপ্পো, লাটাকিয়া, হামার মতো এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। এর প্রধান কারণ কাছেই তুরস্কের সীমান্ত রয়েছে। সিরিয়া যুদ্ধে তুরস্কের ভূমিকা অত্যন্ত জটিল। তুরস্ক প্রেসিডেন্ট আসাদবিরোধী। আবার আসাদবিরোধী তুর্কি বিদ্রোহীদেরও চরম বিরোধী প্রেসিডেন্ট এরদোগান। কারণ তারাও আবার এরদোগানবিরোধী। একসময় আসাদবিরোধী যুক্তরাষ্ট্র জোটের সঙ্গেই ছিলেন তিনি। সেই সময় সিরিয়ায় বিমান হামলাকারী একটি রাশিয়ান বিমানও ভূপাতিত করেছিল তুরস্ক। কিন্তু এরদোগানের বিরুদ্ধে তুরস্কে অভ্যুত্থান চেষ্টার পর তার স্ট্র্যাটেজি পরিবর্তন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিঠ ঘুরিয়ে এরদোগান রাশিয়ার পুতিনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থাৎ রাশিয়ার নেতৃত্বে অলিখিত যে বলয় গড়ে উঠেছে, তুরস্ক তার শরিক হয়ে উঠেছে। তুরস্ক ন্যাটো সদস্য হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যূহ বিষয় নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কুর্দিশ গেরিলাদের সরাসরি অস্ত্র দিয়ে এবং রসদ দিয়ে সহায়তা করে, যা আঙ্কারা কোনোক্রমেই মেনে নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ভীষণ উদ্বিগ্ন রাশিয়া থেকে এস-৪০০ মিসাইল সিস্টেম ক্রয় করার ব্যাপারে তুরস্ক-রাশিয়া চুক্তি নিয়ে। উত্তেজনা আলো বাড়িয়ে দিয়েছে আমেরিকান একজন পাস্তরকে তুরস্ক হাজতে ঢোকানোর পর। তুরস্কের অভিযোগ, এই পাস্তর নিষিদ্ধঘোষিত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। কিন্তু হলে কী হবে, তুরস্কের জাতীয় কিছু স্বার্থের ব্যাপারে তার সতর্ক থাকাটা স্বাভাবিক। তুরস্কের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। মুদ্রাস্ফীতি অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৬ লাখ সিরিয়ার শরণার্থী আঙ্কারায় আশ্রয় নিয়েছে। কিলিস নামক সিরীয় সীমান্তের এক শহরে তুর্কি নাগরিকের চেয়ে সিরিয়ান শরণার্থীর সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। এ অবস্থায় যদি ইদলিব শহরে হামলা শুরু হয় এবং ৩৫ লাখ শরণার্থী তুরস্কের দিকে রওনা দেয়, তাহলে বড় ধরনের সংকটে পড়বে দেশটি। এরদোগান সরাসরিই বলেছেন, তুরস্কের এখন আর ক্ষমতা নেই শরণার্থী কাঁধে নেওয়ার। 
জাতিসংঘের সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি স্টাফান মিসতুরা প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন সময়ক্ষেপণ করতে, যাতে সন্ত্রাসী এবং সাধারণ মানুষকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায়। অর্থাৎ জাতিসংঘ চাচ্ছে সাধারণ বেসামরিক নাগরিকরা যাতে হতাহতের শিকার না হয়। কিন্তু সেটা বাস্তবসম্মত চিন্তা নয় বলেই পুতিন মনে করেন। কারণ সন্ত্রাসীরা সেখানে সাধারণ মানুষকে শুরু থেকেই মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এ নিষ্ঠুর কাজটি বরাবরই সন্ত্রাসীদের করতে দেখা যায়। এটি তাদের কালচার। কখনও কখনও নিজের পরিবার, নিজের শিশুকে মানবঢাল হিসেবে তারা ব্যবহার করে। শহরটিতে প্রায় ১ লাখ সন্ত্রাসী আশ্রয় নিয়ে আছে। এর অধিকাংশই জাবাত আল নুসরাহ গ্রুপের সদস্য। হায়াত টাহরির আল শাম নামে একটি গ্রুপ আছে, যাদের জাতিসংঘ সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 
ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং পুতিনের ইদলিবে সময় না দেওয়ার অর্থ সিরিয়ার সরকার ওই শহরে ব্যাপক হামলা চালাবে, যাতে বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। সম্মেলন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি কূটনীতিকদের এক জরুরি সম্মেলনে পুতিনকে অভিযোগ করে বলেছেন, ‘পুতিন পেছন থেকে মৃত্যু নিয়ে খেলছেন।’ 
এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বাশার আল আসাদের ঘোর বিরোধী। কয়েকবার সরাসরি হামলার পরিকল্পনা করেও যুক্তরাষ্ট্রকে পিছিয়ে যেতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বরাবরই সন্ত্রাসীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এবারের তেহরান সম্মেলনেও হাসান রুহানি এবং এরদোগান যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আঙুল তুলেছেন। 
এ কাহিনি বড়ই জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেজাল করার এনার্জি কম নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে তার সিরিয়ার দিকে নজর দেওয়ার ফুরসত কম। ঘরের অভ্যন্তরে তার প্রশাসনে অসন্তোষ, খোদ রিপাবলিকান সিনেটররা তার সমালোচনায় মুখর। কয়েক দফা বিচার বিভাগের সঙ্গে ঝামেলা হয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী মেক্সিকো এবং কানাডার সঙ্গে মন কষাকষি চলছে। ওদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনের সঙ্গে বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে এতটাই অসন্তোষ চলছে যে, রীতিমতো পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে প্রভাব ফেলেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র খুব বড় করে ইদলিব নিয়ে নাক গলাতে পারছে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক টুইট বার্তায় বলেছেন, ‘যদি ইদলিবে বেসামরিক নাগরিকরা হত্যার সম্মুখীন হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র খুবই রাগান্বিত হবে।’ তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের প্রায় সবাই ইরানবিরোধী। তারা কেউ সিরিয়ায় ইরানের উপস্থিতি দেখতে চান না। 
শুক্রবার সম্মেলন শেষ হওয়ার পর শনিবারই রাশিয়া বিমান হামলা চালিয়েছে ইদলিবে। ১০ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত এত ভারী আক্রমণ করা হয়নি। সেখানে ছয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। যদি তাই হয়, তাহলে এক ভয়ানক পরিস্থিতি গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে দেখা দেবে। 
ইদলিবই হলো শেষ পরীক্ষাস্থল। সিরিয়ার অন্যান্য অঞ্চল মুক্ত হলেও ইদলিব এখনও সন্ত্রাসীদের দখলে রয়েছে। ভøাদিমির পুতিন অস্থির হয়ে আছেন এ শেষ আশ্রয়স্থল মুক্ত করতে। গোটা সিরিয়া থেকে আসাদবিরোধীদের সরাতে রাশিয়াকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এখন মানবঢালের কারণে ইদলিব মুক্ত হবে না, এটা মেনে নিতে পারছেন না পুতিন। 
এমন নয় যে, সিরিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে আসাদবিরোধী মানুষ নেই। আছে; কিন্তু সশন্ত্র বিরোধীদের হটানোর যে দায় পুতিন ঘাড়ে তুলে নিয়েছেন, তার পেছনে একটি কারণ বিদ্যমান রয়েছে। আরব বসন্তের সময় যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বিভিন্ন দেশে ক্ষমতার পালা বদল ঘটিয়েছে, সেটা রাশিয়া দেখেছে। প্রয়োজনের তাগিদে, গণতন্ত্রের নামে দীর্ঘদিনের বন্দুকে গুলির মুখে ঠেলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যখন সিরিয়া উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ রাশিয়ার শরণাপ্নœ হন। সেই থেকে রাশিয়া প্রেসিডেন্ট আসাদকে পাহারা দিয়ে, অর্থ দিয়ে, সামরিক শক্তি দিয়ে টিকিয়ে রেখেছেন। এমন পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া সামরিক শক্তি নিয়ে মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু রাশিয়া পিছপা হয়নি। রাশিয়ার পক্ষ থেকে এটি একটি প্রতিশোধ। সামিরক বাণিজ্য সংঘাত তো আছেই, সেই সঙ্গে জর্জিয়া, ক্রিমিয়া এবং ইউক্রেন প্রশ্নে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সাপে-নেউলেতে পরিণত হয়েছে। ইদলিবে একটি মানবিক বিপর্যয় আসন্ন হয়ে উঠেছে বলেই মনে হচ্ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এ সমস্যা বিশ্ববাসীর জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা হয়ে উঠবে বলেই মনে হচ্ছে। 
১৯৪৩ সালে তেহরানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাশিয়া, ব্রিটেন এবং আমেরিকার আলোচনা। এতে উপস্থিত ছিলেন জোসেফ স্ট্যালিন, ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এবং উইনস্টন চার্চিল। সেই আলোচনা ফলপ্রসূ হলেও তারপর দুই বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলেছে। তারা সম্মত হয়েছিলেন ইরানের স্বাধীনতার স্বীকৃতিতে। কিন্তু এবার তেহরানে তিন গুরুত্বপূর্ণ নেতার আলোচনা বিশ্ববাসীর জন্য কোনো ইতিবাচক খবর বয়ে অনতে পারল না।

মহসীন হাবিব
লেখক ও সাংবাদিক