আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১১-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

নির্বাচনকালীন সরকার এখন আলোচনায়

দাবি আদায়ে মাঠে বাম দলগুলো : জাতীয় ঐক্য গড়ে যুগপৎ আন্দোলনের কথা ভাবছে বিএনপি

দীপক দেব
| প্রথম পাতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি ততই জমে উঠছে। দশম জাতীয় সংসদের মতো এবারও নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’। রাজনীতি সচেতন অনেকেই মনে করেন, এ প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে রাজনীতির অনেক কিছুই জড়িয়ে রয়েছে। এর ওপরই নির্ভর করছে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, নাকি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই দেশে আরেকটি নির্বাচন হবে। এজন্য সচেতন মহলেও আলোচনায় এখন নির্বাচনকালীন সরকার।

অতীতের মতো এবারও এ ইস্যুতে পুরোপুরি বিপরীতমুখীতে অবস্থান করছে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট তথা জাতীয় পার্টিসহ এ মেরুর সবাই বলছে, বর্তমান সরকারের প্রধান শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ছোট পরিসরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে এবং সেই সরকার শুধু রুটিন ওয়ার্ক করবে। নির্বাচন করবে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু বিএনপিসহ সরকারবিরোধীরা এ পদ্ধতিতে নির্বাচনে যেতে রাজি নয়। তারা তফসিল ঘোষণার আগে সরকারের পদত্যাগ চান। একই সঙ্গে সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে। এরই মধ্যে রাজপথের কর্মসূচিতেও এ ইস্যুটি জোরালোভাবে তুলে ধরছে সরকারবিরোধী পক্ষ।

জানা গেছে, সোমবার পৃথকভাবে কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। দাবি ভিন্ন হলেও নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে নেতাদের বক্তব্যে। তারা তফসিলের আগেই সরকার ভেঙে দিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছেন। সামনের দিনেও এ ইস্যুতে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। অনেকেই মনে করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট যুক্তফ্রন্টসহ বেশকিছু দলের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া চালিয়ে 

যাচ্ছে। সেখানেও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের কথা ভাবা হচ্ছে।
কারাগারে আদালত বসানোর প্রতিবাদ ও চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সোমবার বিএনপির মানববন্ধন থেকে তফসিল ঘোষণার আগে সরকারকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা আবারও বলেছেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। জনগণ ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন দেখতে চায় না।
এদিকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ, সব দলের মতামতের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদারকি সরকার গঠন ও জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করাসহ চার দফা দাবিতে সারা দেশে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। একই দাবিতে তারা ২০ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ঘেরাওসহ সারা দেশে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, সব দলের মতামতের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদারকি সরকার গঠন করার একটি ফর্মুলা বলেছি। যেন সরকার কোনোভাবেই সুযোগ নিতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে সাংবিধানিকভাবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অক্টোবরে উনারা নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবেন। পুনর্গঠনের কথা কিন্তু বলেননি। তাছাড়া এটা যে ভিন্ন চরিত্রের সরকার, সেটা তিনি মুখে বলছেন। এ সরকার রুটিন ওয়ার্ক ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে পারবে নাÑ এ কথাটাই সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তাছাড়া আওয়ামী লীগের নেতারা যে বলছেন শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে, নির্বাচন তো করবে নির্বাচন কমিশন। সুতরাং আওয়ামী লীগ নেতাদের এসব বলা বন্ধ করতে হবে। সিপিবি সভাপতি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের আলোচনা করার ইচ্ছা থাকলে, নিরপেক্ষ নির্বাচন করার ইচ্ছা থাকলে সব সমস্যার সমাধানই সম্ভব। কিন্তু আওয়ামী লীগের সে ইচ্ছা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
এদিকে সরকারের উচ্চপর্যায় অক্টোবরের শেষ দিকে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের জোট শরিক ও ১৪ দলের নেতাদের অনেককেই এ সরকারে দেখা যাবে, এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে টেকনোক্র্যাট কোটা থেকেও দেখা যেতে পারে কাউকে কাউকে। তবে গতবারের মতো এবার আর বিএনপিকে এ সরকারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে না বলে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সরকার ও আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলেছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হয়েছিল; এবারও একইভাবে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে। এ সরকারে গ্রহণযোগ্যদের রাখার পাশাপাশি টেকনোক্র্যাট কোটা থেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বানানোর মধ্য দিয়ে একটা চমক দেখানো হতে পারে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে ছয়জন এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দুইজন শপথ নিয়েছিলেন। ২৯ সদস্যের ওই মন্ত্রিসভায় ২১ মন্ত্রী ও সাত প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়–য়া ও ব্যরিস্টার শফিক আহমেদ।
বিএনপিসহ সরকারবিরোধী পক্ষের কাছ থেকে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের দাবি জানিয়ে আসা হচ্ছিল। কয়েক মাস বিভিন্ন সভা-সেমিনার থেকে তারা এ দাবি জানাতে থাকে। এ অবস্থায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নেপাল সফর শেষে দেশে ফেরার পর নির্বাচনকেন্দ্রিক সরকার নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতবারের মতো এবারও একইভাবে সরকার গঠনের কথা জানান। এর কয়েক দিন পরই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ মাসের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা বলেন। যদিও পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, একমাত্র শেখ হাসিনাই জানেন কবে সরকার গঠন করা হবে; অন্য কেউ জানেন না। তিনি এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের কথা না বলার পরামর্শও দেন।
এদিকে নাগরিক ঐক্যের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার হবে এমনÑ যারা নির্বাচন করবে না, করাবে। তারা কোনো পক্ষপাতিত্ব করবে না। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হলে তখন প্রস্তাব দেব। কাদের বা সমাজের কোনো শ্রেণির লোকদের দেখতে চানÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সময় হলে তখনই বলব। এখন যদি কারও নাম বলি তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের ওপর নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করা হবে। তাছাড়া নামগুলো বিতর্কিত করারও চেষ্টা করা হবে। এজন্য এখন কিছু বলতে চাই না।