আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

উচ্চশিক্ষা : পরিপ্রেক্ষিত উচ্চশিক্ষিত বেকার ও প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশন

শাওয়াল খান
| সম্পাদকীয়

উন্নত বিশ্বের দেশে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের সীমারেখা নির্দিষ্ট করা নেই। কোনো কোনো দেশে অবসরের আগের দিন পর্যন্ত চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ও রাজ্য সরকারের চাকরিতে প্রবেশের বয়স ২০ বছর, আর সর্বোচ্চ ৫৯ বছর। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে, তবে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে নয় এবং সিভিল সার্ভিসে সর্বনিম্ন ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায়

উচ্চশিক্ষার আওতা অনেক বড়, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুদূরপ্রসারী। এর মধ্যেও উচ্চশিক্ষার কয়েকটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একেবারেই নির্ধারিত, যা মোটাদাগে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ আমরা দেখতে পাই। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য হবে জ্ঞান সঞ্চারণ ও নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন এবং সেই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। কার্যকরভাবে বিশ্বমানের শিক্ষা দান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা জাগানো এবং মানবিক গুণ অর্জনে সহায়তা দান।
অবাধ বুদ্ধিচর্চা, মননশীলতা ও চিন্তার স্বাধীনতা বিকাশে সহায়তা দান করা। আমাদের বিদ্যমান উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা কি শিক্ষাক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম?
জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী থেকে জ্ঞানের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি উচ্চশিক্ষার আওতাভুক্ত। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যারা উচ্চশিক্ষার পাঠ সমাপন করেছেন তারা কি সত্যি সত্যি গবেষণা, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী থেকে জ্ঞানের নতুন নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টির বিষয়টি অনুধাবন করছেন বা রপ্ত করছেন? যদি তা-ই হয়, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে কেন? দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, নাকি অপরিকল্পিত উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, কোন অবস্থা কোন পরিপ্রেক্ষিত দায়ী? উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দিলে এমন প্রশ্ন আমাদের প্রতিনিয়ত পীড়িত করে।
দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবÑ এমন ধারণা বোধ হয় ঠিক নয়। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বলছে, এ দেশে এসে মোটা বেতনে চাকরি করছেন বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। সমস্যাটা আসলে শিক্ষাব্যবস্থার না শিক্ষা পরিকল্পনার অথবা সার্বিক কর্মপরিকল্পনার? ঘাটতিটা আসলে শিক্ষা ও কর্মপরিকল্পনার সমন্বয়ের।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক সাম্প্রতিক গবেষণায় বলেছে, দেশের ২৪ শতাংশ তৈরি পোশাক কারখানায় বিদেশি কর্মীরা কর্মরত আছেন। তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া, তৈরি পোশাক, পর্যটন, চা-শিল্প, শিপইয়ার্ড, কনস্ট্রাকশন, ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় দক্ষ জনশক্তির অভাবে বিদেশি শ্রমিক আমদানি করা হয়। ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত প্রথম আলোর এক সম্পাদকীয়তে সরকারি তথ্যের বরাতে বলা হয়, বৈধভাবে এ দেশে ১৬ হাজার বিদেশি নাগরিক কাজ করছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, বিদেশি চাকুরের সংখ্যা কয়েক লাখ।
জাতীয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও দেশের সার্বিক কর্মপরিকল্পনার একটা সমন্বয় সেল থাকা অপরিহার্য। অর্থাৎ জাতীয় পরিকল্পনাই বলে দেবে, আগামী ১০ বছরে বা ২০ বছরে দেশে কতজন পেশাজীবী শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রশাসক, প্রকৌশলী, গবেষক, গণমাধ্যম কর্মী, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, অনুবাদক, সৃজনশীল দক্ষ মানবসম্পদ দরকার তা। যে সেলের বার্ষিক পরিকল্পনা থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জানতে পারবেন, উচ্চশিক্ষা শেষে তাদের কর্মযোগের চাহিদা বা ক্ষেত্র কোথায় তৈরি হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা লক্ষ্যহীন উচ্চশিক্ষার চিন্তা বাদ দিয়ে লক্ষ্য স্থির করে শিক্ষা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবে। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের শিল্প মালিকরা স্কলারশিপ দিয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে পারে। উচ্চতর গবেষণায় আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিদেশি স্কলারশিপ নির্ভরতা কমাবে। বিদেশি স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে না আসার প্রবণতা কমবে। এতে শিক্ষার্থী এবং শিল্প মালিক উভয়েই লাভবান হবে। বিষয়ভিত্তিক তারুণ্যনির্ভর গবেষণার ফলে দেশীয় পণ্য এবং শিল্পকারখানার সুনাম, প্রচার ইত্যাদি যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি তারা উপকারভোগীও হতে পারেন। মেধাবীরা নিজেদের যোগ্যতা দেশের কাজে লাগাবেন। এতে অর্থ ব্যয়ও কমবে। এককথায় সার্বিকভাবে দেশ উপকৃত হবে। এ ধরনের মেধা লালন, মেধা বিকাশ দেশের শিল্প মালিকদেরও এক ধরনের দায়। এ দায় শিল্প মালিকরা এড়াতে পারেন না। 
ইউনেস্কোর এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও কানাডায় পড়তে গেছেন ১৫ হাজার ৩৪ জন। সমীক্ষা অনুযায়ী, এ পাঁচটি দেশে তাদের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স করতে গড়ে ৬ বছরে খরচ হবে প্রায় ১৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা। যদি তাদের এক-তৃতীয়াংশের অভিভাবক সন্তানদের খোঁজখবর নিতে বিদেশে যান, তাহলে আরও ১ হাজার ২১০ কোটি টাকা খরচ যোগ হবে। এই পাঁচটি দেশ ছাড়াও চীন, জাপান, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশেও উল্লেযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রতি বছর পড়তে যান। অর্থাৎ এ খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার আকারে বিদেশে চলে যাচ্ছে। (৬/৯/১৮, প্রথম আলো)।
এখন সবচেয়ে নজরকাড়া বিষয়টা হচ্ছে মেধাবী শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণ উজ্জ্বলতা নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করছেন না, হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া। এতে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারদের বেকার সমস্যার সমাধান হচ্ছেÑ এ কথা বলা যাবে না। বরং বলা যায়, উচ্চশিক্ষিতদের দেশ ত্যাগের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। 
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত বিগত কয়েকটি লেবার ফোর্স সার্ভে শ্রমশক্তি জরিপ সাক্ষ্য দিচ্ছে, যুব শ্রমশক্তি, বিশেষ করে শিক্ষিত যুব বেকারত্বের হার বেড়েই চলেছে। বেকারত্বের হার নির্ধারণে বিবিএস আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুসরণ করে আসছে।
বিবিএসের সর্বশেষ লেবার ফোর্স সার্ভে প্রতিবেদনে (২০১৬-১৭) বলা হয়েছে, দেশে মোট কর্মোপযোগী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ। বাকি ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ কর্মক্ষম, তবে শ্রমশক্তির বাইরে। এর মধ্যে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও নিরক্ষর নারী-পুরুষ আছে।
২০১৬-১৭ সালের লেবার ফোর্স সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ হলেও শিক্ষিত যুব বেকারত্বের হার অনেক বেশি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা সম্পন্ন করেছে, এমন যুবশক্তির (১৫-২৯ বছর) বেকারত্বের হার যথাক্রমে ২৮ দশমিক শূন্য, ২২ দশমিক ৩ এবং ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১০ সালের সার্ভে রিপোর্টে জাতীয় পর্যায়ে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও শিক্ষিত যুব বেকারের হার ছিল বেশি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বেকারত্বের হার ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৩৩, ১৩ দশমিক ৭৪, ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ। ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেল ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ছিল সবচেয়ে বেশি। এ হার ছিল ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে যারা প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করছিল তাদের বেকারত্বের হার ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ১৮ শতাংশ।
বিবিএসের দুটি (২০১০ এবং ২০১৬-১৭) শ্রমশক্তি জরিপে শিক্ষিত যুব (১৫-২৯ বছর) বেকারত্বের হার জাতীয় পর্যায়ের বেকারত্বের হারের তুলনায় অনেক বেশি, যা গোটা সমাজব্যবস্থাকে নাড়া দিচ্ছে, উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থী অভিভাবক সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। বয়সের সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের তরুণদের কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
উন্নত বিশ্বের দেশে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের সীমারেখা নির্দিষ্ট করা নেই। কোনো কোনো দেশে অবসরের আগের দিন পর্যন্ত চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ আছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ও রাজ্য সরকারের চাকরিতে প্রবেশের বয়স ২০ বছর, আর সর্বোচ্চ ৫৯ বছর। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে, তবে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে নয় এবং সিভিল সার্ভিসে সর্বনিম্ন ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায়। আমাদের নিকটবর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০, বিভিন্ন রাজ্যে বয়সসীমা ৩৮ থেকে ৪০ বছর, শ্রীলংকায় ৪৫ বছর, ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫, ফ্রান্সে ৪০ বছর, ইতালিতে ৩৫ বছর, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৮ বছর। ফিলিপাইন, তুরস্ক ও সুইডেনে যথাক্রমে সর্বনিম্ন ১৮, ১৮ ও ১৬ সর্বোচ্চ অবসরের আগের দিন পর্যন্ত। দক্ষিণ আফ্রিকায় চাকরিপ্রার্থীদের বয়স সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চশিক্ষা তাদের জন্য আনন্দের উৎস। বেকারত্বের নয়। আমাদের দেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়স কিছুটা শিথিল করলে বা বয়স সীমাবদ্ধ না রাখলে যুব বেকার সমস্যা অনেকাংশে কমে যেত। বুঝতে হবে মানুষ তো চাকরি করে যোগ্যতা এবং শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য দিয়ে, বয়স দিয়ে নয়। বিষয়টা হওয়া উচিত প্রত্যেক কর্মোপযোগী মানুষ কর্মব্যস্ত থাকবে, সসম্মানে আয় উপার্জন করবে রাষ্ট্র সমর্থন জোগাবে এমনই। যখন দেখি বাংলাদেশে লাখ লাখ তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বেকার বসে আছেন; কিন্তু বয়সের কারণে দরখাস্ত করতে পারছেন না, তখন আমরা কাকে দায়ী করব, সমাজব্যবস্থাকে না শিক্ষাব্যবস্থাকে? 
সম্প্রতি উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চশিক্ষাকে আরও বেশি হারে প্রতিযোগিতামূলক ও আন্তর্জাতিক মানদ-ে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) ঢেলে সাজানো এবং যুগোপযোগী করতে সংস্থাটিকে উচ্চশিক্ষা কমিশনে (হায়ার এডুকেশন কমিশন বা হেক) রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দেড় শতাধিক সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য ক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘ আট বছর আগে ইউজিসি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ আট বছর ব্যয় করে ২৬ আগস্ট প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন আইন, ২০১৮’ অনুমোদন দেওয়া হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সংসদের চলতি অধিবেশনে তা আইন আকারে পাস হবে।
প্রস্তাবিত খসড়া আইনে যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে উচ্চশিক্ষা কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি দূরে থাক কার্যক্রম এবং ক্ষমতা আরও সংকুচিত করা হয়েছে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে। বিদ্যমান আইনে সরকারি বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ সৃষ্টি, বিষয়/বিভাগ/ ইনস্টিটিউট খোলা, অর্থ বরাদ্দসহ বিভিন্ন কাজ ইউজিসি করে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুমোদন, বিভাগ-বিষয় খোলা বা স্থগিত/বাতিল ইত্যাদিও করে ইউজিসি। কিন্তু প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা আইন ২০১৮ অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন লাগবে। ইউজিসি নিজস্ব পদ সৃষ্টি, যোগ্যতা নির্ধারণ ও নিয়োগের বিষয়েও পূর্বানুমোদন নিতে হবে। বর্তমানে এসব বিষয়ে ইউজিসিই সিদ্ধান্ত নেয়। উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম কমিশন সরাসরি নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবই চ্যান্সেলরের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রস্তাবিত আইনে বলা আছে, প্রস্তাবিত কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে; কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারবে না। এটা নেবে মন্ত্রণালয়। শুধু তা-ই নয়, মন্ত্রণালয় কমিশনের সুপারিশ মানতে বাধ্য নয়। পরিদর্শন ও তদন্ত বিষয়ে সরকার যেমন মনে করবে ব্যবস্থা করতে পারবে। অথচ আইনে কমিশনকে সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শর্তাবলি কমিশন নির্ধারণ করবে। কিন্তু বর্তমানে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় এটা নির্ধারণ করে। বিদ্যমান আইনে ইউজিসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হলেও স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা ভোগ করছে। কিন্তু হেক গঠিত হলে সেটাও থাকবে না। আবার প্রস্তাবিত খসড়া আইনে কিছু কঠিন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। যেমন এর মধ্যে আছে কমিশনের সুপারিশ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অনুসরণ ও প্রতিপালনে ব্যর্থ হলে (কমিশন) প্রোগ্রাম/বিভাগের অনুমোদন বাতিল, শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধসহ বিভিন্ন পদপক্ষেপ নিতে পারবে। প্রস্তাবিত আইন যদি হুবহু পাস হয়ে যায়, তাহলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের কী হবে? 
এ প্রসঙ্গে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ১৯৭৩ সালে মাত্র ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ইউজিসির যাত্রা শুরু হয়। দেশে বর্তমানে ৪৮টি সরকারি এবং ১০৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এগুলোর অ্যাপেক্সবডি হিসেবে যে আইনি ক্ষমতা থাকার দরকার ছিল, তা বিদ্যমান অধ্যাদেশে অনুপস্থিত। এ কারণে নতুন আইনের অধীনে উচ্চশিক্ষা কমিশন (হেক) গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু চিন্তা করেছিলেন স্বায়ত্তশাসন না থাকলে উচ্চশিক্ষা থাকে না। তাই তিনি ১৯৭৩ সালেই ইউজিসিকে স্বায়ত্তশাসন দেন ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানরূপে এটিকে গঠন করেন। শুধু তা-ই নয়, ওই সময় যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন তৈরি হয়েছে, সব কয়টিকে তিনি (বঙ্গবন্ধু) স্বায়ত্তশাসন দিয়েছেন। কিন্তু আমি বিস্মিত যে, বঙ্গবন্ধুর হাতে তৈরি প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করার প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের হাত একটুও কাঁপল না। তবে আমার বিশ্বাসÑ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাচেতনা পরিপন্থি কিছু হবে না। (২/৯/১৮, যুগান্তর)। 
নব্বই এর দশকে এসে একের পর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে ইউজিসি অধ্যাদেশ সংশোধন করে সংস্থাটিকে আরও ক্ষমতায়িত করার প্রস্তাব আসে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সাল থেকে একাধিক খসড়া আইন তৈরি হয়। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, উৎকর্ষ সাধন এবং বিস্তৃতির লক্ষ্যে ইউজিসিকে উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তরের ঘোষণা দেন। এরপর ২০১৩ সালের ১০ জুলাই আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক সভায় আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। পরে নীতিগত অনুমোদনের জন্য ওই খসড়া মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপিত হলে তা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আবার পাঠানো হয়। সেটিই এখন জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে পাসের অপেক্ষায়।
বিদ্যমান সমাজ বাস্তবতায় দেশে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন সংস্থা স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অনেকাংশে ব্যর্থ। বর্তমানে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা থেকেও ইউজিসির ভূমিকা অসহায়ের কোটায়। তাই জনমনে প্রত্যাশা, সংসদে পাস হওয়ার আগেই প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশনকে দুর্বল করার ধারাগুলো সরিয়ে সেসঙ্গে কমিশনসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হোকÑ এমনটা প্রত্যাশিত। মানসম্পন্ন উচ্চশিক্ষা যেমন আমাদের দরকার, তেমনি দরকার উন্নততর সমাজব্যবস্থা। সেই লক্ষ্যে উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজের বেকারত্ব দূর করা এখন সময়ের দাবি। উচ্চশিক্ষাকে সমাজের প্রয়োজনে ব্যবহার করা না গেলে, শুধু যে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যয় করা অর্থই গচ্ছা যাচ্ছে শুধু তা-ই নয়, যুবসমাজ হতাশাগ্রস্ত হয়ে কুপথে পা বাড়ালে দেশের জন্য সমূহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। নীতিনির্ধারকদের তা নতুন করে ভাবতে হবে। 

শাওয়াল খান
লেখক ও শিক্ষাকর্মী