আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

প্রাণের উৎপত্তি কোরআন ও বিজ্ঞান

মাহফুজুর রহমান তানিম
| প্রকৃতি ও পরিবেশ

মহাগ্রন্থ আল কোরআন বিশ্ব মানবতার মুক্তির বার্তা। এই ঐশীগ্রন্থ তার শব্দ, ভাষাশৈলী, উপস্থাপনা ও বাচনভঙ্গির মাধ্যমে অন্যান্য সব ধর্মগ্রন্থকে পেছনে ফেলেছে। কোরআন শুধু ইহলৌকিক বা পারলৌকিক বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়নি; পাশাপাশি প্রাণের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ, চিকিৎসাসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ে দিয়েছে অনুপম  বৈজ্ঞানিক তথ্য। এ প্রবন্ধে আমরা কোরআনে আলোচিত পৃথিবীর সৃষ্টি ও প্রাণের উৎস নিয়ে আলোকপাত করব।

মহাবিশ্বের আদি অবস্থা 
বিজ্ঞানীরা বলেন, মহাবিশ্বে ছায়াপথ গঠনের আগে মহাকাশীয় বস্তু ছিল গ্যাসীয় পদার্থের আকারে। সংক্ষেপে বলা যায় যে, ছায়াপথ সৃষ্টির আগে বিপুল গ্যাসীয় পদার্থ বা মেঘমালা বিদ্যমান ছিল। আদি মহাকাশীয় বস্তুকে গ্যাসের চেয়ে ধুম শব্দের দ্বারা বর্ণনা করা অধিকতর শ্রেয়। কোরআন নিম্ন বর্ণিত আয়াতে বিশ্বজগতের অবস্থা বলতে গিয়ে দুখান শব্দের উল্লেখ করা হয়েছে, যার অর্থ ধোঁয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন, যা ছিল ধূম্রপুঞ্জবিশেষ। অতঃপর তিনি ওকে (আকাশকে) ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায় এসো। ওরা বলল, আমরা তো অনুগত হয়ে এলাম।’ (সূরা হামিম : ১১)। এটা মহাবিস্ফোরণ (ইরম ইধহম) এর স্বাভাবিক পরিণতি, যা রাসুল (সা.) এর যুগে আরবদের কাছে ছিল অজানা। তাহলে সে সময়ে এ জ্ঞানের উৎস কী হতে পারে? (কোরআন অ্যান্ড মডার্ন সায়েন্স কম্পিটেবল অর ইনকম্পিটেবল পৃ. ২০)। 

পৃথিবীর আকৃতি
আদিমকালে মানুষ বিশ্বাস করত যে, পৃথিবী চ্যাপ্টা। বহু শতাব্দীব্যাপী মানুষ বহুদূর গমনে ভয় পেত এ জন্য যে, যদি পৃথিবীর কিনার হতে পড়ে যায়! স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি ১৫৯৭ খ্রিষ্টাব্দে পৃথিবীর চারদিকের জলপথ ভ্রমণ করে প্রমাণ করেছিলেন যে পৃথিবী গোলাকার। কোরআন এ কথা দেড় হাজার বছর আগেই বলেছে। সূরা নাজিয়াতের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এরপর তিনি পৃথিবীকে করেছেন ডিম্বাকৃতি।’ এভাবেই কোরআন সঠিকভাবে পৃথিবীর আকৃতির বর্ণনা দিয়েছে। যদিও কোরআন যখন অবতীর্ণ হয় তখন মানুষের ধারণা ছিল পৃথিবী থালার মতো চ্যাপ্টা। (কোরআন, সায়েন্স ম্যাথমেটিক্যাল ফ্যাক্টস 
পৃ. ১১)।

প্রাণের উৎপত্তি 
বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার পরে আমরা জানতে পেরেছি, জীব কোষের মৌলিক উপাদান সাইটোপ্লাজম (ঈুঃড়ঢ়ষধংস) ৮০ শতাংশ পানি দিয়ে তৈরি। আধুনিক গবেষণা আরও প্রকাশ করেছে যে, অধিকাংশ জীবেই ৫০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পানি আছে। প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকার জন্য পানি আবশ্যকীয় উপাদান। পবিত্র কোরআন এ তথ্যটি আমাদের দেড় হাজার বছর আগে জানিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ সব জীব সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে, ওদের কতেক পেটে ভর দিয়ে চলে (সাপ), কতেক দুই পায়ে চলে (মানুষ) এবং কতেক চলে চার পায়ে (জন্তু-জানোয়ার), আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান।’ (সূরা নূর : ৪৫)। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘অবিশ্বাসীরা কী ভেবে দেখে না যে, আকাশম-লী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবস্তু সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না।’ (সূরা আম্বিয়া : ৩০)।
তিনি আরও বলেন, ‘এবং তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে; অতঃপর তিনি তার বংশগত ও বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন। তোমার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান।’ (সূরা ফুরকান ৫৪; বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান, মরিস বুকাইলি পৃ. ২১৩)। 

মহাবিশ্বের প্রসারণ
১৪০০ বছর আগে যখন জ্যোতির্বিদ্যা ছিল আদিম অবস্থায়, তখনই আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নাজিলকৃত কোরআনে বিশ্বব্রহ্মা-ের প্রসারণের বিষয়টি এমনভাবে বর্ণিত হয়Ñ ‘আর আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে আসমানকে সৃষ্টি করেছি আর আমি অবশ্যই তা সম্প্রসারণকারী।’ (সূরা জারিয়াত : ৪৭)।
বিংশ শতাব্দীর উষালগ্ন পর্যন্ত বিজ্ঞান জগতে এই একটিমাত্র ধারণা প্রচলিত ছিল যে, মহাবিশ্বের রয়েছে একটি স্থির বা অপরিবর্তনীয় প্রকৃতি বা অবস্থা এবং অনন্তকাল ধরেই এর অস্তিত্ব রয়েছে। অর্থাৎ এর কোনো শুরু নেই, পরিবর্তনও নেই। যাই হোক প্রকৃতপক্ষেই মহাবিশ্বেরও যে একটি সূচনা বা আরম্ভ ছিল আর এটি ক্রমাগতই প্রসারিত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তিগুলো দ্বারা গবেষণা, পর্যবেক্ষণ আর গণনা চালিয়ে এ তথ্যটি পাওয়া গেছে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রাশিয়ান পদার্থবিদ অষবীধহফবৎ ঋৎরবফসধহ এবং বেলজিয়ামের মহাবিশ্ববিষয়ক বিজ্ঞানী এবড়ৎমবং খবসধরঃৎব থিওরি দিয়ে বা তত্ত্বগতভাবে গণনা করে দেখেন যে, বিশ্বব্রহ্মা- বিরামহীনভাবে গতিশীল রয়েছে আর এটি প্রসারিতও হচ্ছে। ১৯২৯ সালে পর্যবেক্ষণমূলক ডাটার মাধ্যমেও এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়। আমেরিকান জ্যোতির্বিদ ঊফরিহ ঐঁননষব একটি টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন যে, নক্ষত্রপুঞ্জ আর গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে ক্রমাগতই দূরে সরে যাচ্ছে। বিশ্ব ব্রহ্মা-ে সবকিছু পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এতেই প্রমাণিত হয় যে, এই মহাবিশ্ব নিয়ত প্রসারিত মহাবিশ্ব। (কোরআন অ্যান্ড মডার্ন সায়েন্স কম্পিটেবল অর ইনকম্পিটেবল পৃ. ২৭)।
পবিত্র কোরআনের অসমকক্ষ আর অতুলনীয় রচনাশৈলী এবং এর মাঝে বিদ্যমান প্রকৃষ্ট, গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞানই সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, এটি মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী।