আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

অর্থ লোপাটের অভিযোগ

খুলনায় টিআর-কাবিখা প্রকল্পে গোঁজামিল

খুলনা ব্যুরো
| প্রথম পাতা

খুলনায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের (টিআর) অধিকাংশ কাজে গোঁজামিল দেখিয়ে লোপাট করা হয়েছে অর্থ। আবার অনেক প্রকল্পের কাজ বাকি থাকলেও কাগজে-কলমে শেষ দেখানো হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটেছে কাজের বিনিময়ে খাদ্য-কাবিখা ও কাজের বিনিময়ে টাকা-কাবিটায়। এমনকি টিআরের দ্বিতীয় পর্যায়ে সোলার প্যানেল স্থাপনে হয়েছে নয়ছয়। সব মিলে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে (২০১৬-১৭) খুলনা জেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। জেলায় নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক ও বিভিন্ন কোটায় জেলা সদর এবং ৯ উপজেলায় কাবিখা, কাবিটা ও টিআর প্রকল্পে ওই টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দকৃত অর্থে সোলার ক্রয় এবং বিভিন্ন রাস্তা সংস্কার ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হয়। 
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনপ্রতিনিধিরা অর্থ বণ্টন করে দেওয়ার পর কাজ দেখার দায়িত্বে থাকা কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অবহেলায় খুলনার বেশ কয়েকটি স্থানে ব্যাপক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) প্রকল্পের সভাপতির নিকট অর্থ প্রদানকালে নিজের অংশ কেটে রাখার অভিযোগও উঠেছে। ফলে এসব প্রকল্পে যেনতেনভাবে কাজ করা হয়েছে। তাছাড়া প্রদত্ত সোলারের অধিকাংশের অবস্থা নাজুক হওয়ায় কাক্সিক্ষত ফল পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো।
সূত্র মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক খুলনা জেলায় সাধারণ উন্নয়নে মোট ১৩ কোটি ৩৯ লাখ ১৫ হাজার ৩৫৫ টাকা এবং ১ হাজার ৩৭৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ অর্থে ১ হাজার ৭৫৬টি সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ দেখানো হয়েছে। সোলার ক্রয়ে ১৮ কোটি ৩৯ লাখ ৭২ হাজার ৭৪০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট সোলার ক্রয় দেখানো হয়েছে ৭৯৩টি। বরাদ্দকৃত অর্থ প্রায় শতভাগ ব্যয় দেখানো হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে এ অর্থ ব্যয় করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
কাজের বিনিময়ে খাদ্য-কাবিখার প্রথম পর্যায়ে সাধারণ উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩ কোটি ৭ লাখ ৭৮ হাজার  ২২২ টাকা এবং সোলার বাবদ ৩ কোটি ১ লাখ ৬২ হাজার ৬৫৮ টাকা। এ অর্থ ১১৩টি সাধারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ১২৮টি সোলার ক্রয়ে ব্যয় ধরা হয়। টিআর সাধারণ উন্নয়নে ৪০৯টি প্রকল্পে ২ কোটি ১৬ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯৯ টাকা এবং ১২২টি সোলার বাবদ ২ কোটি ১২ লাখ ২১ হাজার ৬০৫ টাকা ব্যয় ধার্য্য হয়। কাজের বিনিময় টাকা-কাবিটা নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক প্রথম পর্যায়ে ৯৬টি সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ কোটি ৩০ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৩ টাকা এবং ৬৮টি সোলার বাবদ ২ কোটি ২৫ লাখ ৯০ হাজার ৯৫৩ টাকা। টিআর (টেস্ট রিলিফ) প্রথম পর্যায়ে নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক ৫৯৫টি সাধারণ প্রকল্পে ২ কোটি ৯২ লাখ ১৫ হাজার ২১৯ টাকা এবং ২৯৭টি সোলার ক্রয়ে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৩০ হাজার ৯১৫ টাকা ব্যয় ধরা হয়। 
কাবিটা ও কাবিখা দ্বিতীয় পর্যায়ে ৮৭টি সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পে ৭৮৬.৬৭২১ মেট্রিক টন চাল এবং ৭১টি সোলার বাবদ ৩ কোটি ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে ৫৫৮.৭৬৪ মেট্রিক টন ও  সোলার বাবদ ২ কোটি ৭৫ লাখ ৩৩ হাজার ৪৯১ টাকা ব্যয় হয়। টিআর দ্বিতীয় সাধারণ পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ হয় ২ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৭ টাকা এবং সোলার বাবদ ২ কোটি ১২ লাখ ১০ হাজার ৯৩৬ টাকা। এছাড়া সাধারণ উন্নয়ন বাবদ ২ কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৬৭ টাকা ও সোলার ক্রয়ে ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ১২ লাখ ১০ হাজার ৯৩৬ টাকা। এ অর্থ দ্বারা ৩৪৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ১৩৫টি সোলার ক্রয় করা হয়। কাবিখা/কাবিটা নির্বাচনি এলাকা ভিত্তিক দ্বিতীয় পর্যায় উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ হয় ৫৮৯.৫৪৪ মেট্রিক টন চাল এবং সোলার বাবদ ২ কোটি ২৫ লাখ ৯০ হাজার ৯৫৩ টাকা। সাধারণ উন্নয়ন খাতের ৬৭টি প্রকল্পে ব্যয় হয় ৫১৭.৬৫৯ মেট্রিক টন চাল। ৬৪টি সোলার ক্রয়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৯৯ লাখ ৮৫ হাজার ৯০৬ টাকা। টিআর নির্বাচনি এলাকাভিত্তিক দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৮৯টি সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ কোটি ৯২ লাখ ১৫ হাজার ২১৯ টাকা। এতে ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৭১ লাখ ৭০ হাজার ১৫৪ টাকা। ৪৩টি সোলার বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ কোটি ৮৬ লাখ ৩০ হাজার ৯১৫ টাকা এবং একই টাকা ব্যয় দেখানো হয়।
এছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর-নগদ অর্থ) কর্মসূচির আওতায় বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কোটায় জেলায় মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭২ লাখ ১২ হাজার ৫৪৮ টাকা। বরাদ্দকৃত এ অর্থের মধ্যে রয়েছে বিভাগীয় কমিশনারের কোটায় ২৮টি প্রকল্পে সাধারণ উন্নয়ন বাবদ প্রথম পর্যায়ে ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা ও ১১টি সোলার বাবদ ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৫ টাকা। একই কোটায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৫টি প্রকল্পে সাধারণ উন্নয়ন বাবদ ১৩ লাখ ৭২ হাজার ৮৬ টাকা এবং ১৮টি সোলার ক্রয়ের জন্য ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। 
জেলা প্রশাসকের কোটায় প্রথম পর্যায়ে সাধারণ উন্নয়ন বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হয় ১০টি প্রকল্পের জন্য ৮ লাখ ১১ হাজার ৫৩৩ টাকা এবং ৪টি সোলার ক্রয়ের জন্য ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩০৩ টাকা। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮টি সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্পে ৮ লাখ ১১ হাজার ৫৩৩ টাকা এবং ৬টি সোলার বাবদ ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩০৩ টাকা। উভয় কোটায় ব্যয় দেখানো হয়েছে শতভাগ অর্থ। 
সূত্র জানায়, বটিয়াঘাটা উপজেলার হোগলবুনিয়া গ্রামে খোকন মল্লিকের বাড়ি থেকে বাছারীবাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় মাটি ভরাটের জন্য ৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের মতে, এ রাস্তায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ অসমাপ্ত কাজও সমাপ্ত দেখিয়ে প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তবে, প্রকল্পের সভাপতি খোকন মল্লিক বলেন, ওই প্রকল্পের শতভাগ কাজ ভালোভাবে করা হয়েছে। কাজের মানও ভালো হয়েছে। সুরখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে মাটি ভরাটের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং প্রকল্পের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন জানান, মাঠে মাটি ভরাটের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ভান্ডারকোট ইউনিয়নের পশ্চিম হালিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পূর্ব হালিয়া ওয়াপদা পর্যন্ত রাস্তায় মাটি উত্তোলনের জন্য ৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাস্তায় মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ করা হয়েছে। বাকি  অসমাপ্ত কাজও সমাপ্ত দেখিয়ে প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এ প্রকল্পের সভাপতি ইসমাইল হোসেন বাবু জানান, রাস্তার শতভাগ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
বটিয়াঘাটার পাথরীঘাটা ভূপাল বৈরাগীর বাড়ি থেকে বারুইআবাদ খোকন ম-লের বাড়ি অভিমুখে মাটির রাস্তা উন্নয়ন কাজের জন্য ২ লাখ ৭৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। রাস্তায় কাজের মান খুব একটা ভালো হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান। তবে প্রকল্পের চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ গোলদার বলেন, তার প্রকল্পের কাজ ভালোভাবে সমাপ্ত হয়েছে। 
কয়রা উপজেলা সংবাদদাতা হুমায়ুন কবির জানান, কয়রা উপজেলার ৭ ইউনিয়নে টিআর-কাবিখার অর্থের কাজ যেনতেনভাবে শেষ করেই প্রকল্পের টাকা তুলে নিয়েছেন প্রকল্প কমিটির সভাপতিরা। শুধু তাই-ই নয়, টিআরের মাধ্যমে সোলার প্যানেল স্থাপনে হয়েছে নয়ছয়। যেসব প্রতিষ্ঠানে সোলার স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেখানে গিয়ে তা দেখা যায়নি। এমনও চিত্র উঠে এসেছে কয়রা উপজেলার টিআর-কাবিখা প্রকল্পে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. রবিউল ইসলাম গোলখালী বায়তুল আকসা জামে মসজিদ থেকে মোড়লবাড়ি বায়তুল তোয়েবা জামে মসজিদ অভিমুখে রাস্তা পুনর্নির্মাণ প্রকল্প ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা এবং গোলখালী নওশের শেখের দোকান থেকে রহিম মোড়লের বাড়ি অভিমুখে মাটির রাস্তাটি আংশিক সংস্কার কাজ করে বিল ভাউচারের মাধ্যমে প্রকল্পের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের সমাজসেবক মিজানুর রহমান খোকা এ প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। 
এছাড়া আমাদী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য বিশ্বজিৎ সিনহা কাটাখালী কালীবাড়ি সংলগ্ন পানীয় জলের পুকুর সংস্কার প্রকল্পের বরাদ্দকৃত ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিল ভাউচার দেখিয়ে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রকল্পের  সভাপতি জানান বর্ষা মৌসুমে কাজ করা সম্ভব হয়নি। 
এ ব্যাপারে কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. জাফর রানা জানান, প্রকল্পগুলো যথাযথ তদারকি করা হয়েছে। তবে দু-একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তাদের বিল-ভাউচার আটকে দিয়ে কাজ আদায় করার ব্যবস্থা নিয়েছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিমুল কুমার সাহা জানান, সব প্রকল্প তিনি দেখতে পারেননি। অনেক প্রকল্প সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছেন। এসব অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বটিয়াঘাটা ও কয়রা উপজেলার মতো খুলনা জেলার বাকি সাতটি উপজেলাতেও কাবিখা, কাবিটা ও সোলার স্থাপন নিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজিজুল হক জোয়ার্দ্দার জানান, কোনো প্রকল্পের সভাপতির বিরুদ্ধে কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।