আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৬-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

চলচ্চিত্র শিল্প : গল্প সমন্বয় ও অর্থ ব্যবস্থাপনা

সাদিকুর সাত্তার আকন্দ
| সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বললে অনেকেই নাক ছিটকান। যেন বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে মানা অথবা ভাবখানা এমন হয় যেন এ দেশের চলচ্চিত্র কোনো নিকৃষ্ট জিনিস। মোটাদাগে বললে, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ছোট করে দেখার অর্থ হলো এ দেশের সংস্কৃতি ও শিল্পকে শ্রদ্ধা না করা বা সম্মান না দেখানো। এ দেশের তরুণ সমাজের একটা অংশ বাংলা সিনেমার কথা শুনলেই কেমন যেন এড়িয়ে যান। মূলত তারা দেশীয় সংস্কৃতির গুরুত্ব ও পটভূমি সম্পর্কে একটু বেখেয়াল। এ দেশের চলচ্চিত্র শিল্প কখনোই অবহেলা কিংবা হাসির উপকরণ ছিল না। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ ছিল পার্শ্ববর্তী কয়েকটা দেশের জন্য সংস্কৃতির পথপ্রদর্শক। বাংলাদেশে যখন চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা হয়, তখন আশপাশের অনেক দেশেই এত বড় স্টুডিও ছিল না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এফডিসি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ দেশকে সংস্কৃতিচর্চার আঁতুড়ঘর হিসেবে পৃথিবীর বুকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এরপর থেকে অনেক কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে এ দেশে। অথচ সেই বাংলাদেশ আজ প্রায় সিনেমাশূন্য হয়ে যাচ্ছে। ভিনদেশি সিনেমা সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে। এটি এ দেশের মানুষ, এমনকি সংস্কৃতিমনাদের জন্য মোটেও সুখকর সংবাদ নয়। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে ভিনদেশি চলচ্চিত্র কিংবা নাটক অথবা ধারাবাহিক আমাদের দেশের সিনেমা কিংবা সংস্কৃতির জন্য খুব বেশি নেতিবাচক বা ঝুঁকি বলে মনে হয় না। কিন্তু একটু খেয়াল করলে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব আঁচ করতে পারা যায়। প্রথমে মানসিক দিকটি খেয়াল করি। আমরা যখন বিদেশি সিনেমা বা নাটক দেখি এবং ক্রমাগত এই দেখার হার বাড়তে থাকে, তখন মনের অজান্তেই আমরা ওই ভিনদেশি আচার-আচরণ, এমনকি শারীরিক অঙ্গভঙ্গিও নিজেদের মধ্যে নিয়ে আসি, যা পরবর্তী সময়ে স্বদেশি সংস্কৃতির প্রতি আমাদের আকর্ষণ কমিয়ে দেয়। আমাদের সংস্কৃতি আমাদের শেকড়Ñ এ কথাটা আমরা ভুলে যাই। যে কারণে নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্ববোধের কথা আমাদের মনে থাকে না। বর্তমানে দেশে যে-কোনোভাবে বিদেশি সিনেমা ও সিরিয়াল অহরহই চলছে এবং এগুলোর দর্শকও প্রচুর। এর কারণ কী? যেখানে আমাদের দেশে এত সুন্দর নাটক ও ধারাবাহিক তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর তেমন প্রত্যাশিত সাড়া নেই। কারণ খুঁজলে আমরা দেখতে পাই, দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি গুরুত্বহীনতার বিষয়টি, যা আমাদের দর্শককে ভিনদেশি সংস্কৃতির যে আধিপত্য, তা বুঝতে দিচ্ছে না। এভাবে এ দেশের দর্শক ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। যে কারণে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও ভারতীয় সিনেমা ও সিরিয়ালগুলো বড় পর্দা থেকে শুরু করে ছোট পর্দা সব জায়গা দাবিয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের দেশে।
ভিনদেশি সিনেমা ও সিরিয়ালের দৌরাত্ম্য যদি এ দেশে কমাতে হয় তাহলে কী করণীয় ও বর্জনীয়, তা বহুজন বহুবার আলোচনায় এনেছেন। আমাদের দেশের দর্শকদের যদি দেশি সিনেমাবিমুখ হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করা হয় তারা অহরহই বলেন, ‘গল্প ভালো না’, পরিচিত গল্প ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে তারা বাংলা সিনেমার সোনালি দিনের কথাগুলোও আফসোসের সুরে বলেন। বাংলাদেশের সিনেমা একটা সময় কলকাতা ও বলিউডে রিমেক হতো। আর এ দেশের গান, সংগীত ও চিত্রনাট্য তো অহরহই অনুসরণ করা হতো ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক সিনেমায়। সুতরাং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে হতাশার কিছু নেই। তবে হ্যাঁ, এ দেশের মানুষ কেন বিমুখ হলো?
এ প্রশ্ন চলচ্চিত্র নির্মাতারাও এড়াতে পারেন না। কারণ ভালো গল্পের সিনেমা তৈরি হলে দর্শক এখনও হলে যাচ্ছে। অতএব ভালো গল্প তৈরি করতে হবে। পরিচালকসহ যারা সিনেমার গল্প তৈরির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট তাদের ভাবতে হবে নতুন করে। এমন কিছু ঘটনা বা চিন্তাকে গল্পে রূপ দিতে হবে, যা আসলেই মানুষকে ভাবায় বা চিন্তার খোরাক দেয়। গতানুগতিক লতুপুতু মার্কা গল্প দর্শক নিজেই জানে। সুতরাং গল্প তৈরির বেলায় প্রান্তিক পর্যায় থেকে ভাবতে হবে সিনেমাওয়ালাদের। প্রত্যেক চরিত্রই যেন একটি লক্ষ্যের দিকে এগোয়। তবে প্রত্যেকটা চরিত্র থেকেই দর্শকের কিছু চাওয়ার থাকে সেটা যেন তারা পায়, তা-ও খেয়াল রাখা জরুরি। একটি ভালো সিনেমার পূর্বশর্ত একটি ভালো গল্প। এক্ষেত্রে কমিটমেন্ট থাকাটা সবচেয়ে জরুরি।
ভালো গল্প হলে একটি ভালো সিনেমা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু সেই সিনেমাকে দর্শক পর্যন্ত পৌঁছাতে গেলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেটের। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে অনেক সিনেমা তৈরি হয়েছে, যেগুলো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। কিন্তু ওই সিনেমাগুলো কাক্সিক্ষত দর্শকপ্রিয়তা পায়নি। দেশের অধিকাংশ দর্শকই ওই চলচ্চিত্রগুলোর কাহিনি কিংবা পটভূমি কিছুই জানে না। এর পেছনে কি এমন কারণ রয়েছে যে, চলচ্চিত্রগুলো পুরস্কৃত হলো অথচ সিনেমা হল পায়নি কাক্সিক্ষত সংখ্যায়। ওই চলচ্চিত্রগুলোর গল্প, চরিত্রের সমন্বয় সবই ঠিক ছিল, হয়তোবা বাজেট পর্যাপ্ত ছিল না। যে কারণে ছবিগুলোর প্রচার ঠিকঠাকভাবে হয়নি অথবা অভিনয় শিল্পীদের আর্থিক দাবি পূরণ করা সম্ভব হয়নি সেজন্য যেসব শিল্পী কম সম্মানী নিয়ে কাজ করেন তাদের দিয়ে চলচ্চিত্রগুলোর চরিত্রায়ন করা হয়েছে। আর যারা কাজ করেছেন তারা হয়তোবা দর্শক মহলে এতটা জনপ্রিয় নন, যে কারণে ছবিগুলো কম সময়ে হল থেকে নেমে গেছে অথবা গ্রামাঞ্চলে তেমন হলই পায়নি। যে সিনেমাগুলোর এত সীমাবদ্ধতা থাকার পরও বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়, সেগুলো অবশ্যই মৌলিক গল্পনির্ভর সিনেমা। ওই মৌলিক গল্পগুলোকে যদি প্রয়োজনীয় বাজেট দিয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা কিংবা গ্রাম বা শহর সব শ্রেণির দর্শকের জন্য ষোলকলাপূর্ণ একটি সিনেমা হিসেবে উপস্থাপন ও প্রদর্শন করা যেত তাহলে? অবশ্যই তখন বিষয়টি সোনায় সোহাগা হতো। কারণ দর্শক তখন বিনোদিত হতেন, নির্মাণকারী লগ্নিকারী অর্থ তুলে নিতেন আর সিনেমাটিও পুরস্কৃৃত হতো। এতে দর্শক সিনেমাপ্রেমী হয়ে উঠত আরও বেশি। যে সিনেমাটি দর্শক কয়েকদিন আগে পর্দায় দেখছে, সেটি যখন পরবর্তী সময়ে যদি পুরস্কৃত হতো দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে, তখন দর্শকের ভালো লাগার জায়গা আরও প্রসারিত হতো নিঃসন্দেহে। কিন্তু হাল আমলের পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেক সিনেমার নামই দর্শক জানে নাÑ এটা মোটেও সুখকর নয়।
বর্তমানে সিনেমাতে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা নিম্নগামী। একটি কথা হামেশাই প্রচারিত ও উচ্চারিত হয় যে, সিনেমায় প্রযোজকরা আসেন গাড়ি দিয়ে আর যান হেঁটে। অর্থাৎ বিনিয়োগ করার পর আর অর্থ ফেরত না পেয়ে প্রযোজকরা পথে বসে যাচ্ছেন। যে কারণে দিনকে দিন চলচ্চিত্রে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। তাছাড়া বাংলাদেশে শুধু চলচ্চিত্র ব্যবসার সঙ্গেই জড়িত থাকবে, এমন প্রযোজকের সংখ্যা হাতেগোনা। নতুন যারা চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করতে আসেন তারা এই প্রজেক্টকে পোর্টফোলিও হিসেবে গ্রহণ করেন। যে কারণে একবার লোকসান হলে দ্বিতীয়বার বিনিয়োগ করার মানসিকতা তৈরি করেন না। সেজন্য ধারাবাহিক বিনিয়োগকারী চলচ্চিত্রে খুবই কম। চলচ্চিত্রকে কাক্সিক্ষত জায়গায় নিয়ে যেতে হলে দরকার ধারাবাহিক কিছুু বিনিয়োগকারী, এ খাতে প্রয়োজন যারা অর্থলগ্নি করে লোকসানে পড়লেও পরবর্তী সময়ে ফের বিনিয়োগ করতে সাহস দেখাবেন। এ রকম বিনিয়োগকারী তৈরি করতে এবং সিনেমা শিল্পকে উন্নত জায়গায় নিয়ে যেতে সরকারের এগিয়ে আসা জরুরি। দেশের বড় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপকে সরকার বাধ্য করতে পারে যে, প্রত্যেক গ্রুপকে অবশ্যই প্রতি বছর ন্যূনতম একটি সিনেমা তৈরির জন্য অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে এ সিদ্ধান্তটি ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ মনে হতে পারে। সেজন্য সরকারকে কম সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যখন কম সুদে ঋণ পাবে, তখন তারা আলাদা কোম্পানি খুলেও চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করার সুযোগ ও সাহস পাবে। অবশ্য কোম্পানিটি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যে, শুধু সিনেমা বানানোর জন্যই এটি বিনিয়োগ করবে। এতে ব্যবসায় বৈচিত্র্যও এলো আর সিনেমাও বাঁচল। এভাবে ঋণ দিয়ে যদি প্রযোজকদের উৎসাহিত করা যায়, তাহলে খুব কম সময়ের মধ্যেই চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরবে আশা করা যায়। পার্শ্ববর্তী দেশের দিকে যদি আমরা তাকাই, তাহলে এমন অনেক নজির পাব যে, বিভিন্ন ব্যবসায়িক গ্রুপ শুধু চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করার জন্য লিমিটেড কোম্পানি ওপেন করছে, যারা লাভ হোক ক্ষতি হোক বিনিয়োগ থেকে পিছপা হচ্ছে না। ফলশ্রুতিতে তাদের চলচ্চিত্র আজ বিশ্বজুড়ে সুনাম কুড়াচ্ছে। এ দেশের অনেক খাতই মুমূর্ষু অবস্থা থেকে আবার আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। শুধু প্রয়োজন আগ্রহ আর দূরদর্শিতা। সর্বশেষ যে কথাগুলো না বললেই নয়, তা হলো দেশের তরুণদের উচিত দেশীয় শিল্পকে সম্মানের চোখে দেখা। এ দেশের সংস্কৃতি এ মাটির সন্তানের মতো। সুতরাং আমাদের শিল্প নেতিবাচক বা মন্দাবস্থায় থাকলে সেটিকে সুন্দর পথে নিয়ে আসার দায়িত্ব আমাদের সবার। কিন্তু গঠনমূলক সমালোচনা না করে বিষয়টি এড়িয়ে গেলে অথবা নাক ছিটকালে সেটি সুনাগরিকের জন্য সমীচীন নয়। 

সাদিকুর সাত্তার আকন্দ
চলচ্চিত্র ও অর্থনীতি বিশ্লেষক