আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৩-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

হিজরি সনের সূচনা যেভাবে

নাজমুল হুদা
| নবী জীবন

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানরা হিজরি নববর্ষ উদযাপন করে। এটি চান্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী প্রণয়নকৃত সেই বর্ষপঞ্জি, যা হজরত ওমর (রা.) তার খেলাফতকালে প্রবর্তন করেন। এ ব্যাপারে আল্লাহর কোরআনি নির্দেশনা হলো, ‘নিশ্চয়ই আসমানগুলো ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস ১২টি। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এসবের মাঝে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না। আর মুশরিকদের সঙ্গে তোমরা যুদ্ধ করো সমবেতভাবে, যেরূপ তারাও সমবেত হয়ে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আর মনে রেখ আল্লাহ মুত্তাকিদের সঙ্গে আছেন।’ (সূরা তাওবা : ৩৬)।

হিজরি বর্ষ মূলত বারটি চান্দ্র মাস নিয়ে গঠিত। হিজরি বছর ৩৫৪ দিনে পূর্ণ হয়। পূর্ণ নিরীক্ষণে তা মূলত ৩৫৪.৩৬৭০৫৬ দিনে এসে দাঁড়ায়। আর হিজরি দিন পঞ্জিকায় মাস হয়তো ২৯ বা ৩০ দিনে হবে; কারণ চন্দ্রের বাহ্যিক ঘূর্ণন ২৯.৫৩০৫৮৮ দিনের সমান। যেহেতু অন্যদিকে খ্রিষ্টীয় ও হিজরি তারিখের মাঝে প্রায় ১১.২ দিন পরিমাণ সময় বিস্তর ফারাক রয়েছে। আর দুই পঞ্জিকা একই সময় সংঘটিত হয় না। একসঙ্গে  দুটোতে পরিবর্তন সাধন করা অনেক কঠিন।
নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সূত্রে বর্ণিত যে, এ হিজরি সন হজরত ওমর (রা.) এর খেলাফতকালে হিজরতের ১৭তম বছর নির্ধারণ করা হয়।
খলিফা হজরত ওমর (রা.) এর শাসনামলে ১৬ হিজরি সনে প্রখ্যাত সাহাবি আবু মুসা আশআরি (রা.) ইরাক এবং কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একদা হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) খলিফা ওমর (রা.) এর কাছে এ মর্মে চিঠি  লিখলেন যে, ‘আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সংবলিত যেসব চিঠি আমাদের কাছে পৌঁছে, তাতে দিন, মাস, কাল, তারিখ ইত্যাদি না থাকায় কোন চিঠি কোন দিনের তা নিরূপণ করা আমাদের জন্য সম্ভব হয় না। আর যদিও দেওয়া থাকে, তাতে বুঝতে কষ্ট হয় এটি কি এ বছরের শাবানের না গেল বছরের। এর ফলে নির্দেশ কার্যকর করতে আমাদের খুব ঝামেলা পোহাতে হয়। অনেক সময় আমরা চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে বিব্রতবোধ করি। হাকেমের সূত্রে হজরত শাবি (রহ.) থেকে এমনটিই বর্ণিত।
হজরত আবু মুসা আশআরির চিঠি পেয়ে হজরত ওমর (রা.) এ মর্মে পরামর্শ সভার আহ্বান করলেন যে, এখন থেকে একটি ইসলামি তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। ওই পরামর্শ সভায় হজরত ওসমান (রা.) ও হজরত আলী (রা.)সহ বেশ সংখ্যক বিশিষ্ট সাহাবা ছিলেন। উপস্থিত সবার পরামর্শ ও মতামতের ওপর ভিত্তি করে ওই সভায় হজরত ওমর (রা.) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামী সন প্রবর্তনের। তবে কোন মাস থেকে বর্ষের সূচনা করা হবে তা নিয়ে পরস্পরের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়। কেউ মত পোষণ করেন, রাসুল (সা.) এর জন্মের মাস রবিউল আউয়াল থেকে বর্ষ শুরু। আবার কেউ কেউ মত পোষণ করেন, রাসুল (সা.) এর ইন্তেকালের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক।
অন্যান্যের মতে নবী (সা.) এর হিজরতের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক। এভাবে বিভিন্ন মতামত আলোচিত হওয়ার পর হজরত ওমর (রা.) বললেন, নবী (সা.) এর জন্মের মাস থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু করা যাবে না। কারণ খ্রিষ্টান সম্প্রদায় হজরত ঈসা (আ.) এর জন্মের মাস থেকেই খিষ্টাব্দের গণনা শুরু করেছিল। তাই রাসুলের জন্মের মাস থেকে সূচনা করা হলে খ্রিষ্টানদের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে যাবে। পরিশেষে ইসলামি রাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নববি হিজরি তারিখের ওপর সবাই একমত পোষণ করেন; কারণ এটিই ছিল ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনা পর্ব। এমনকি মহান এ হিজরত হক ও বাতিলের মাঝে বিভাজন তৈরি করে দিয়েছে।
হজরত ওমর (রা.) এ ব্যাপারে তার আস্থার দুই প্রতীক হজরত ওসমান ও আলী (রা.) এর কাছে একান্তে পরামর্শ চাইলে তারাও এতে সম্মতি প্রদান করেন। হিজরি সনের প্রবর্তক হজরত ওমর (রা.), হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.), হজরত ওসমান (রা.) এবং হজরত আলী (রা.) এর যৌথ প্রচেষ্টায় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার থেকে হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয়। অতঃপর যখন সবাই ঐকমত্যে পৌঁছল, তখন কেউ বলতে লাগল তাহলে রমজান দিয়ে মাস শুরু হোক। কিন্তু হজরত ওমর (রা.) বললেন, ‘না বরং মহরম দিয়ে শুরু হবে; কারণ এটি মানুষের হজের আমল হতে ফেরার মাস।’
মদিনায় রাসুলের হিজরত মহরমে ছিল না, বরং এর দু-মাস পর ২২ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ২৪ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে ছিল।
হিজরি বর্ষের মাসগুলো
১. মহরম। এটি হিজরি সনের প্রথম মাস এবং মহিমান্বিত মাসের একটি। এ নামে নামকরণের কারণ হলো, ইসলাম-পূর্ব যুগে আরবরা এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহকে নিষিদ্ধ করেছিল।
২. সফর। সফর বলে নামকরণের কারণ হলো, কেননা আরবদের আবাস ভূমিগুলো যুদ্ধের কারণে শূন্য থাকত। কারও মতে, আরবরা এ মাসে গোত্রে গোত্রে যুদ্ধে লিপ্ত হতো, বিপক্ষের কাউকে পেলে তাকে রিক্তহস্ত করে ছাড়ত।
৩. রবিউল আউয়াল। যেহেতু এটি বসন্তকালে নামকরণ করা হয়েছে। আর আরবিতে ‘রবি’ অর্থ বসন্ত।
৪. রবিউস সানি। যেহেতু এটি রবিউল আউয়ালের পরপরই এসেছে।
৫. জুমাদাল উলা। ইসলাম-পূর্ব যুগে একে বলা হতো ‘জুমাদা খামসা’। জুমাদা অর্থ জমে যাওয়া। শীতকালে হওয়ায় একে এ নামে নামকরণ করা হয়েছে; যেহেতু শীতের সময় পানি বরফের মতো জমা হয়ে যায়।
৬. জুমাদাল উখরা। এটি আগের জুমাদাল উলার অনুগামী, সেহেতু এ মাসকে ওই নামে ভূষিত করা হয়েছে।
৭. রজব। এটি মহিমান্বিত মাসের একটি। এর নামকরণের কারণ হলো, রজব মানে কাঁটার বেড় দেওয়া। যেহেতু বর্শাকে ফলা থেকে আলাদা করে বের করে কাঁটার বেড় দেওয়া হয়। নইলে তা ফলা থেকে বের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং কোনো যুদ্ধ ইত্যাদি না হয়। কারও মতে, রজব মানেই যুদ্ধবিরতি। কেউ বলেন, কোনো জিনিসকে সম্মান করাকেই রজব বলে।
৮. শাবান। এ নামের কারণ হলো, এটি রজব ও শাবান এ মাসদ্বয়ের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে। কেউ বলেন, এ মাসে মানুষ পানির খোঁজে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে। কারও মতে, রজবে ঘরে বসে থাকার পর আরবরা যুদ্ধ ও হামলার সংকল্পে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত।
৯. রমজান। এটি মুসলিমের রোজার মাস। এ মাসে রোদের তীব্র উত্তাপ ও প্রখর দহনের দরুন একে রমজান বলে নামকরণ করা হয়েছে।
১০. শাওয়াল। এতে রয়েছে ঈদুল ফিতর। যেহেতু এ মাসে উট দুধকে শুকিয়ে ফেলে। তাই একে শাওয়াল বলে নামকরণ করা হয়েছে। শাওয়াল মানে উটের দুধ কমে যাওয়া।
১১. জিলকদ। এটি মহিমান্বিত মাসের একটি। এ নামে নামকরণের কারণ হলো, যেহেতু আরবরা এ মাসে যুদ্ধ ও দূরে কোথাও সফরে যাওয়া থেকে বিরত থাকে। হারাম মাসের সম্মানে এরা কারও কাছে তৃণ বা কোনো রসদ তালাশ করে না।
১২. জিলহজ। এটি পবিত্র হজ, ঈদুল আজহা এবং হারাম মাসের একটি। এ নামে অভিহিত হওয়ার কারণ হলো, ইসলাম-পূর্ব যুগে এ মাসে আরবরা হজের জন্য বের হতো।

লেখক : উচ্চশিক্ষার্থী, উম্মুল-কুরা বিশ্ববিদ্যালয়
মক্কা মুকাররমা