আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৩-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

শিক্ষার্থীদের দাবির অধিকাংশই বাস্তবায়িত

সংসদ প্রতিবেদক
| প্রথম পাতা

সরকার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। তিনি জানান, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ দাবি বাস্তবায়িত হয়েছে। বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ অধিবেশন শুরু হয়। এ সময় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মো. মনিরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুষ্ঠুভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনের চাহিদা অনুসারে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য জনবলের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। 

জাতীয় পার্টির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য বেগম নূর-ই-হাসনা লিলি চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ সড়ক সংক্রান্ত ৯ দফা দাবির অধিকাংশই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এরই মধ্যে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বিলটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে, যা সংসদের চলতি অধিবেশনে উপস্থাপিত ও বিবেচিত হবে। এ আইনে অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ঘাতক বাস দুটির চালক, হেলপার, মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনের আওতায় কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের প্রতি আমি অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কার্যক্রম নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। এতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিলক্ষিত। এছাড়া চার বছর মেয়াদি ন্যাশনাল রোড সেফটি অ্যাকশন প্লান ২০১৭-২০ প্রণয়ন করা হয়েছে, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দূরপাল্লার বাসে দুইজন চালক রাখার জন্য মালিকদের অনুরোধ করা হয়েছে।’  
প্রধানমন্ত্রী জানান, কোনো অবস্থাতেই স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত মোটরযান রেজিস্ট্রেশন না দেওয়া, ত্রুটিপূর্ণ মোটরযানের ফিটনেস নবায়ন না করা এবং স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত বাস ও ট্রাকের বডি নির্মাণের কারখানাগুলো পরিদর্শন করে এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মহাসড়কে চলন্ত গাড়ির স্পিড কন্ট্রোলের বিষয়ে দূরপাল্লার বিভিন্ন বাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার এবং ট্রাকের সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। 
এ প্রসঙ্গে একাধিক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ট্রাফিক আইন মেনে চলার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিরাপদ সড়কের জন্য যতই ব্যবস্থা নেই না কেন, দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে কিছুই হবে না। অনেকেই ফুটওভারব্রিজ কিংবা আন্ডারপাস ব্যবহার না করে ছোট শিশুকে নিয়ে চলন্ত গাড়ির মধ্য দিয়েই রাস্তা পারাপার হতে দেখা যায়। এ সময় দ্রুত যানবাহন কীভাবে হঠাৎ করে থামবে? বিষয়টিও দেখতে হবে। এ কারণেই দুর্ঘটনা হয়। এখানে ড্রাইভারের দোষ কতটুকু, আর ট্রাফিক আইন না মেনে যিনি ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হচ্ছেন তার দোষ কতটুকুÑ তাও বিবেচনায় আনা দরকার। তিনি বলেন, কোথাও দুর্ঘটনা হলে আইন নিজের হাতে না নিয়ে ড্রাইভারকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা উচিত। অনেক সময় ড্রাইভার গাড়ি না থামিয়ে প্রাণের ভয়ে দ্রুত গাড়ি টেনে চলে যান। এতে অনেকের প্রাণে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও এ ঘটনায় থাকে না। কারণ, ড্রাইভারকে অনেক সময় মারতে মারতে মেরেই ফেলা হয়। তাই আইন কারোর হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। আর অনেকেরই রাস্তা পারাপারে জনসচেতনার বড়ই অভাব দেখা যায়। তাই সবার প্রতি অনুরোধ ট্রাফিক আইন মেনে চলুন। 
দেশের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা অব্যাহত : সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে, দেশের জনগণের সার্বিক মুক্তি অর্জন এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণে আওয়ামী লীগ সরকার নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে বর্তমান সরকার রূপকল্প-২০২১, দিনবদলের সনদ, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে সুশাসন সুসংহতকরণ, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা এসব লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবো। ২০১৫ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায়। ১৭ মার্চ জাতির পিতার ৯৮তম জন্মদিনে বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার প্রাথমিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের জাল ছিন্ন করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।’  
বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্য পরিকল্পনাকারীদের শনাক্তে কমিশন : সংসদ সদস্য মো. আবদুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগ পরপর দুইবার সরকার গঠন করার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পূর্বে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে অনেক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এতে দেখা যায়, পরোক্ষভাবে দেশি ও বিদেশি কিছু লোক ও সংস্থা বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তাই জাতির পিতা হত্যার ব্যাপারে অন্য পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করার জন্য একটি কমিশন গঠনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, বঙ্গবন্ধুর যেসব খুনি বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছে এবং আশ্রয় গ্রহণ করেছে, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। এ সংক্রান্ত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, পলাতক আসামি নূর চৌধুরী কিভাবে কানাডায় বসবাস করছেন, সে সম্পর্কে তথ্য দিতে ফেডারেল কোর্ট অব জাস্টিসের আদালতে আবেদন করা হয়েছে। পলাতক আসামি রাশেদ চৌধুরীকে আমেরিকা থেকে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া অন্য পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে টাস্কফোর্স কাজ করছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড এলার্ট জারি করা হয়েছে। 
ঢাকার চারদিকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে : সরকারদলীয় সংসদ সদস্য একেএম রহমতুল্লাহর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগ সরকার রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন ও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকল্পে এলিভেটেড এক্সপ্রেস সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি প্রকল্প, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প এবং ঢাকা  ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ঢাকা শহরে রিং রোড করারও পরিকল্পনা আছে। এ রিং রোড এলিভেটেড করা হবে। বিভিন্ন স্থানে স্থানে পরিকল্পিতভাবে ল্যান্ডিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। স্থাপিত এলিভেটরগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনে সংযোগ দেওয়া হবে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ নদীতে নৌপথ এবং এরই পাড় ধরে ভবিষ্যতে রিং রোড করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। 
ঢাকার যানজট নিরসন সম্পর্কে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর বহু দেশের রাজধানীতেই যানজট হয়। দেশ দ্রুত উন্নত হচ্ছে, দেশের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছেন ও আর্থিক সচ্ছলতা বাড়ছে বলেই তারা গাড়ি কিনছেন। গাড়ি রাস্তায় বেশি ব্যবহার হচ্ছে বলেই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। তাই যানজট নিরসনে রাজধানীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকাকে ঘিরে রিং রোড নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছি।